বুরুণ্ডা কাহিনী

আলতামাস পাশা লেখাটি পড়েছেন 154 জন পাঠক।
 আমি তখন পার্বত্য চট্টগ্রামে বন বিভাগে কাজ করি। বন বিভাগের বিভিন্ন নার্সারী দেখাশোনা আমার কাজ। এছাড়া অবৈধভাবে যারা বনের গাছ কেটে নেয় তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্বও আমার উপর ন্যস্ত ছিল।  


ছেলেবেলা থেকেই আমি সেলিম চৌধুরী, খুব ডানপিঠে। তাছাড়া শিকার করা আমার নেশা। বাবা এবং ছোট মামার বন্দুক দিয়ে বহু পাখি শিকার করেছি কলেজ লাইফে। গ্রাজুয়েশনের পরপরই বন বিভাগের এই চাকরিটা পেয়ে যাই। চাকরিসূত্রে বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়িয়েছি বছর চারেক।  তখন বাঘ শিকারের দুর্লভ অভিজ্ঞতাও আমার হয়েছে। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি এলাকায় শিকার করতে গিয়ে এবার এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতা আমার হয়েছিলো। হয়তো অনেক পূণ্যের জোরে প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলাম, কিন্তু তারপর থেকে আমি প্রাণী শিকার ছেড়ে দিয়েছি। আগেই বলেছি শিকার করা আমার শখ। বলা যায় খুবই ভয়ংকর একটি নেশা। একবার মাথায় শিকারের নেশা চাপলে আমি শিকারে না গিয়ে একটুও শান্তি পেতাম না।  


পার্বত্য চট্টগ্রামে বছরখানেক থাকার পরে কাজে একঘেঁয়েমী এল। ঠিক এই সময়ই খবর এল ভারতীয় এলাকা থেকে একটি চিতা বাঘ মুংরি-টি এস্টেটের চা বাগানে হামলা করে এক কুলির বছর খানেকের মেয়েকে নিয়ে গেছে। স্থানীয় কুলি সর্দার মুজং এসে আমাকে ধরলো এই চিতাটিকে মেরে দেওয়ার জন্য। অনেকদিন শিকারে যাইনি। তাই মুজং এর আহবানে সাড়া না দিয়ে পারলাম না।  


গতকাল বিকেল বেলা মুজং এর সঙ্গে চিতা বাঘ শিকারে বের হয়েছি। তাঁবুর সরঞ্জাম ও অন্যান্য মালপত্রসহ দু’জন কুলিও আমাদের সঙ্গে রয়েছে। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে দু’রাত আমরা চিতার সন্ধানে থেকেও তার কোনো সন্ধান এখন পর্যন্ত পাইনি। এমনটি আগে কখনও হয়নি। আজ একটি পাহাড়ি ঝরণার কাছে আশ্চর্য সুন্দর একটি হরিণ দেখতে পেলাম। এত বড় এবং মনোহর শিংবিশিষ্ট হরিণ এর আগে কখনও দেখিনি। 


মুজংকে সঙ্গে নিয়ে আমি ঐ হরিণের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েছি। আমার সঙ্গে আছে আমার প্রিয় থ্রি-সিকস বোরের ম্যানলিকার রাইফেল। ইচ্ছে আছে হরিণটিকে আবার দেখা মাত্র গুলি করার। আশ্চর্য ব্যাপার এই যে, আজ পর্যন্ত আমার শিকারি জীবনে অনেক জানোয়ারকে ট্র্যাকিং করেছি, কিন্তু এমন করে ঘন্টার পর ঘন্টা দুর্গম জঙ্গলের ভেতর কোন প্রাণীই আমাকে টেনে নেয়নি। আরও আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে প্রখমবার দেখার পর থেকে সেই হরিণের চেহারা আর একবারও দেখতে পাচ্ছিলাম না। হঠাৎ বড় একটা ঢিবি পড়লো। মনে হল ঢিবির পাশেই হরিণটি দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু পরক্ষণেই দেখলাম ঢিবির পাশে কোনো জন্তুই নেই- হরিণ তো দূরের কথা। এদিকে বেলা যেতেও আর দেরি নেই। পশ্চিমের পাহাড়ের আড়ালে সূর্যটা তখন লাল রশ্নি ছড়িয়ে ডুবতে বসেছে। অর্থাৎ আর কয়েক মিনিট বাদেই এই পাহাড়ে জঙ্গলে ঝুপ  করে আঁধার নেমে আসবে। তাঁবু খাটাবার একটি যুৎসই জায়গা না পাওয়াতে আমি চিন্তিত হয়ে উঠলম। হঠাৎ মুজং বললো, ‘এখানেই থাকবো আমরা। আর যাব না। মুজং এর গলার দৃঢ়তায় আমি একটু অবাকই হলাম। অবশ্য তাঁবু খাটানোর জন্য জায়গাটি খুব একটি খারাপ নয়। একটু দূরে পাহাড়ি ঢাল বেয়ে ঝরণার পানি ঝরছে। ঘন জঙ্গলে আবৃত পাহাড়টি পশ্চিমে যেন পাহারাদারের মতোই দাঁড়িয়ে রয়েছে। নিচে একটি উপত্যকার মতো, আর তাতে রয়েছে নানান ধরনের গাছপালা। এই উপত্যকার মধ্য দিয়ে গভীরে বয়ে চলেছে একটি পাহাড়ি নদী, যার নাম মুজং ঠিক করে বলতে পারলো না। হঠাৎ আমার সঙ্গী কুলি দু’জন মালপত্র নামিয়ে রেখে নাক উচুঁ করে কিসের যেন গন্ধ শুঁকতে লাগলো বুনো কুকুরের মতো। আস্তে আস্তে দেখলাম, তাদের মুখ ভয়ে সাদা হয়ে গেল। চোখ দুটি ভীত-বিহবল। আমি দ্রুত আমার কাঁধে- ঝোলানো রাইফেলটি রেডি পজিশনে এনে  কুলিদের মুখের দিকে তাকালাম।  


মুজং বলে উঠলো, ‘বাবুসাব, এক্ষুনি চল এখান থেকে আমরা পালাই। এখানে আর এক মুহূর্তও নয়। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কিরে? কিসে এত ভয় পেলি? চিতাকে এত ভয়ের কি আছে? মুজং তার ফ্যাকাশে মুখে বললো, ‘চিতা বাঘ নয়, বাবু এ হচ্ছে বুরুন্ডা,’ বলেই বাকি দু’জন কলিসহ মুজং পিছনদিকে দৌড় লাগালো।  


 আমি দৌড়ে গিয়ে মুজং এর হাত চেপে ধরলাম, কিন্তু বাকি দুজন কুলি ভয়ে পালিয়ে গেল।
 এবার আমি মুজংকে  ধমক লাগালাম, ‘কিরে তোর হলটা কি? আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছিস? ‘বুরুন্ডা আবার কোন জন্তু? বুনো হাতির পাল? তা’হলে আগুন জ্বালা। 


ততক্ষণে দেখি কুলি সর্দার মুজং অজানা ভয়ে থরথর করে কাঁপতে শুরূ করে দিয়েছে। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতেই সে বলে চলে, ‘বাবু’, তাড়িতাড়ি পালিয়ে যাও। আমরা ভুল করে বুরুন্ডার এলাকায় চলে এসেছি। এখানে রাতে থাকলে প্রাণ নিয়ে আর ফিরে যেতে হবে না। ঐ যে হরিণ , ওটা আসলে হরিণ নয়, বুরুন্ডার দূত। ও আমাদের আলেয়ার আলোর মতো ওর পেছনে-পেছনে সারাদিন দৌড় করিয়ে ‘বুরুন্ডার রাজত্বে এনে ফেলেছে। এখন মরণ ছাড়া গতি নেই। আমি মুজংকে ধমক লাগাই কি যা- তা উদ্ভট কথা বলছিস? মুজং উত্তর দেয়, ‘বুরুন্ডা হচ্ছে বনের জন্তুদের দেবতা, পশু-পাখিদের রক্ষা করে বুরুন্ডা। কোনো শিকারী তাই বুরুন্ডার রাজ্যে ঢুকলে আর প্রাণ নিয়ে ফিরে যেতে পারে না। সারাদিন হরিণের পিছে ফিছে ঘূড়ে আমার প্রচণ্ড ক্ষিধে পেয়েছিলো। তার ওপর মুজং এর বুরুন্ডা সম্পর্কিত উদ্ভট আজগুবি কথায় মাথাটা আরও খারাপ হবার যোগার হল। আমি বিরক্ত হয়ে মুজংকে ধমক লাগাই, ছেলেমানুষী রেখে তাড়াতাড়ি তাঁবুটা খাটা, তারপর পানি এনে রান্নার যোগার কর, চায়ের পানি চড়া।’  


মুজং হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে ভোঁ দৌড় লাগালো পেছন দিকে। মুজংকে ভয় পাওয়াবার জন্যে আমি আকাশের দিকে রাইফেল তাক করে গুলি ছুঁড়লাম একটা। মুজং গুলির শব্দে থমকে দাঁড়ালো। আমি বললাম, ‘এক্ষুনি ফিরে আয়, নইলে বুরুন্ডা মারবার আগে আমিই তোকে মেরে ফেলবো।  


বাধ্য হয়েই মুজং তাঁবু খাটালো। চায়ের পানি চাপালো। ভাত রান্নার জন্য যোগাড়যন্ত্র করলো। ততক্ষণে রাত নেমে গেছে। প্রথম রাতেই চাঁদ ওঠার কথা ছিল, কিন্তু পাহাড়ের আড়ালে বোধ হয় চাঁদটা ঢাকা পড়েছে। 


একটু উচুঁ ঢিবিতে বসে চা পান করতে করতে যেই সিগারেট ধরাতে যাব, অমনি আমাকে অবাক করে দিয়ে পশ্চিমের পাহাড়ের গায়ের বনভূমিতে দাবানল জ্বলে উঠলো। আমি এত অবাক হলাম যে ভয় পেতেও ভুলে গেলাম। এভাবে এ অঞ্চলে কোনদিন দাবানল লাগে না। আজ তো নিজের চোখের সামনেই দেখছি সামনের পাহাড়ের বনভূমি জুড়ে প্রচণ্ড দাবানল লেগেছে। গাছের ডাল ভেঙে পড়ার শব্দও পাচ্ছি। কিন্তু কিভাবে তা সম্ভব? চারদিকে থেকে ছুটে আসছে গরম হাওয়া।  

 
মুজং এই দাবানল দেখে ভয়ে কাঁপতে লাগলো। তারপর আবার আমাকে অনুনয়-বিনয় করতে লাগলো, ‘বাবু, তোমার পায়ে পড়ি, চল আমরা পালিয়ে যাই।’ বাধ্য হয়ে আমি ওকে আমার রাইফেলটা দেখালাম। মুজং আর কি করে চুপচাপ রান্নার বন্দোবস্তÍ করতে থাকে। রান্না মানে চালে-ডালে খিচুরি আর টিনের মসলাদার মুরগির মাংস।  


রান্না চাপানোর পর মুজংকে কাছে ডাকলাম। এক প্যাকেট বিড়ি দিয়ে বললাম, ‘তোর কোনো ভয় নেই। আমি আছি আর আমার রাইফেল আছে।’ মুজং ভয়ে চমকে উঠে বলে, অমন করে বলতে নেই বাবু সাহেব। ঐ রাইফেলটাই সব নষ্টের মূল। আজ রাত কাটলে হয়।’ আমি মুজং এর অবান্তর কথায় কান দিলাম না। মৃুজংকে আগুন জোরদার করতে বললাম। কিন্তু ভয়ে সে তাঁবুর সামনে থেকে এক পা -ও নড়তে চায় না।  


বাধ্য হয়ে আমি এদিক-সেদিক থেকে শুকনো ডাল-পালা খড়কুটো কুড়িয়ে আনতে লাগলাম। এসব কুড়োচ্ছি হঠাৎ আমার মনে হল চারপাশে কারা যেন ছায়ার মতো হাঁটছে। কানের কাছে কারা যেন ফিসফিস করে কথা বলে উঠলো। একটা বেশ বড় ডাল কুড়িয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই দেখলাম অন্ধকারে একটি একটি বিশাল চিতাবাঘ দাঁড়িয়ে আছে।  স্তব্ধ হয়ে গেলাম মুহূর্তেও মধ্যে। কাঁধ থেকে রাইফেলটি নামাবার আগেই চিতাটা অন্ধকারের মধ্যে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। কিছু সময় হতবাক হয়ে খাকলাম। পরক্ষণেই্ মনে হল আসলে আমি মুজং এর কথায় ভয় পেয়েছি। তাই কি দেখতে অন্ধকারে কি দেখেছি। কিন্তু দাবানল? এখনও আগুন জ্বলছে। দাবানলের আগুন একটি অগ্নিমালার মতো পাহাড়টিকে ঘিরে ফেলেছে। আগুনে গাছের ডাল ফুটফাট করে উঠছে। ফ্লাস্ক থেকে এক কাপ চা ঢাললাম। ঠিক সেসময় হঠাৎ দেখলাম যেন মন্ত্রবলে পাহাড়ের দাবানল নিভে গেল। তারপর প্রচণ্ড একটি ঝড়ো হাওয়া এলো ঠিক পশ্চিম দিক থেকে। সে হাওয়ায় আগুন নিভে গেল। তাঁবুটাও ভেঙে পড়লো। সেই সঙ্গে অনেক মানুষের কান্নার মতো কণ্ঠ স্বর ভেসে আসতে লাগলো। মুজং হাউমাউ করে চিৎকার করে আমাকে বলতে লাগলো, ‘বাবু, চল এখনও সময় আছে- এখান থেকে পালিয়ে যাই। 


মুজংকে ধমক লাগালাম। বললাম একটু জোরে বাতাস দিয়েছে বলেই পালাতে হবে না’কি! এতো সামান্য ধুলোর ঝড়। আমার কথার সঙ্গে সঙ্গেই ঝড়টা আকস্মিকভাবে থেমে গেল। মুজং –এর সাহায্যে তাঁবুটা আবার খাটালাম। ডাল-পালা একত্র করে আবার আগুন জ্বালালাম। মুজংকে তাড়াতাড়ি রান্না শেষ করতে বলে আমি ঢিবির ওপর বসে একটি সিগারেট ধরালাম। একটু আগে পর্যন্ত ঘটে যাওয়া পুরো ব্যাপারটি ভাবতে ভাবতে আমার খেয়াল হল যে, আজ চারদিকের পাহাড় আর বনে একা একটি নাইজার পাখির একটানা খাপু-খাপু- খাপু আওয়াজ ছাড়া আর কোন আওয়াজ নেই। একটু দূরের পাহাড়ি ঝরণায় উপত্যকার পাশে যে নালার সৃষ্টি হয়েছে, তাতে এখন পর্যন্ত কোনো জানোয়ার পানি পান করতে আসেনি। কোনো প্রাণীরই কোনো সারা শব্দ নেই এখানটায়। সমগ্র প্রকৃতি যেন আজ কিসের প্রতীক্ষায় নিথর, নিস্তব্ধ। আশ্চর্যেও ব্যাপার একটি পেঁচার ডাক পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে না।  


ঢিবির ওপর বসে বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ মনে হল, আমার গা ঘেঁসে কে যেন এসে দাঁড়িয়েছে। তার গরম নিঃশ্বাস আমার পিঠের ওপর পড়ছে, সেকি মানুষ? নাকি কোনো জন্তুজানোয়ার? 

 
পেছন ফিরেই দেখি কেউ কোথাও নেই। ভাবলাম ক্ষিধে বেশি পেয়ে গেছে। তাই মুজংকে জিজ্ঞেস করলাম
‘কিরে তোর রান্না হল?’
মুজং মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।
আমি খেতে বসি। এই ভৌতিক পরিবেশে খিচুরি আর মুরগির মাংস আমাকে বেশ তৃপ্তি দিল। ভাবলাম, সারাদিনের হাঁটাহাটি আর মুজং এর অদ্ভূত কথাবার্তায় স্নায়ুর ওপর হয়তো প্রচণ্ড চাপ পড়েছে। এখন পেটে খাবার পড়লে সব ঠিক হয়ে যাবে। খাওয়া শেষ হবার পর আমি সিগারেট ধরিয়ে ঢিবির ওপর বসলাম গিয়ে।  


মুজং আগুনের ধারে বসে বিড় বিড় কওে কোনো মন্ত্রতন্ত্র পড়ছিলো। আর মাঝে মাঝে তার বাহুতে বাঁধা একটা মাদুলির মতো জিনিসে হাত বুলাচ্ছিলো।
আমি উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম , ‘ওটা কিরে মুজং?’
মুজং চমকে উঠলো তারপর সামনে নিয়ে বললো, ‘এটি আমার দিদিমা আমাকে ছোটবেলায় দিয়েছিলো, ভূতপ্রেত, অশুভ আত্মা থেকে এটি রক্ষা করে। আজ এটিই আমাকে হয়তো ‘বুরুন্ডার’ হাত থেকেও বাঁচাবে বাবু।’ আমি মুজংকে আর কিছু না বলে চুপ করে থাকলাম। ওর বিশ্বাসে কেনো জানি আঘাত করতে ইচ্ছা হলো না। 


চাঁদ উঠলো একটু পরে। ঠিক সেই মুহূর্তে নিচের উপত্যকা থেকে ক্ষেতে লাঙল দেবার সময় পাহাড়ি আদিবাসিরা বলদেও লেজ মুচড়ে যেরকম সব অদ্ভূত ভাষা বলে, তেমনি ভাষায় কারা যেন কথা বলতে লাগলো।  সত্যি বলতে কি এই মুহূর্তে আমারও কেমন ভয় ভয় লাগতে লাগলো।
মুজং বললো, ‘বাবু এসো শুয়ে পড়া যাক। আজ আর বাইরে বেশিক্ষণ না থাকাই ভালো। চলো শুয়ো পড়বে।’  


তারপর একটু ইতস্তত করে বললো, ‘বাবু, আজ আমি কিন্তু তাঁবুতে তোমার কাছেই থাকবো। আমি একটু বিরক্ত হলেও, বললাম, ‘বেশ! তাই-ই না হয় থাকিস।’ তাঁবুতে এসে শোবার পর আমি মুজংকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘হরিণটা কোন দিকে গেছে বলতো? আমার তো মনে হয় ব্যাটা ধারে কাছেই কোথাও আছে। কাল ভোরেই ওঁর সঙ্গে হয়তো আমাদের দেখা হবে।  


মুজং তাঁবুর মধ্যে হাঁটু হেড়ে বসে ওর বাহুর সেই মাদুলিটা ছূঁয়ে কি সব বিড় বিড় করে চললো। ও বললো, ‘বাবু আপনার বিশ্বাস হচ্ছে না যে ওটা হরিণ নয়? আমি আপনাকে বলছি যে, ‘ওটা আসলে ‘বুরুন্ডার চর’। এবার আমি যত না মুজংকে সাহস দেওয়ার জন্যে বললাম, তার চেয়ে বেশি নিজেকে সাহস দেওয়ার জন্যে আবারও বললাম, ‘ তোর বুরুন্ডার নিকুচি করেছি।’ 


রাইফেলের বোল্ট খুলে আরও দুটি গুলি ভরে নিয়ে ম্যাগাজিনে পাঁচটি ও ব্যারেলে একটি রেখে সেফটি ক্যাচটি দেখে নিয়ে শূয়ে পড়লাম। মুজংও আমার তাঁবুর ভেতরে আমার পাশ ঘেঁষে শুয়ে পড়লো।  

 
সারাদিন এতো চড়াই উৎরাইয়ে হাঁটাহটি, তার ওপর পেটে খাবার পড়েছে। ঘুমে আমার চোখ বুজে আসছিলো। কখন যে ঘুুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না। হঠাৎ প্রচণ্ড একটি ঝাঁকুনিতে আমার ঘুম ভেঙে গেল। ডান হাতটা আপনা-আপনি রাইফেলের দিকে বাড়ালাম। কিন্তু রাইফেরটি পেলাম না। লাফ দিয়ে উঠে দেখি রাইফেল লোপাট। মুজং নেই। কোথায় পালাল মুজং?  


 বাইরে তখন চাঁদ ডুবেছে পাহাড়ের আড়ালে। আর সেই অন্ধকারে আকাশের বুকে জ্বলছে নীল তারাগুলো। টর্চটা বের করে তাঁবুর বাইরে এসে দাঁড়ালাম। টর্চের আলো ফেলে এদিক-সেদিক দেখলাম। তারপর মুজং- এর নাম ধরে বার বার ডাকলাম। পাহাড়ে- পাহাড়ে যেন চর্তুদিক থেকে ডাক উঠলো নানান কণ্ঠে মুজং মুজং মুজং। কিন্তু মুজংকে কোখাও খুঁজে পাওয়া গেল না।  


তাঁবুর ভেতরে ফিরে এলাম। টর্চের আলোয় দেখলাম মুজং এর মাদুলিটা পড়ে রয়েছে।
‘কে যেন কানে কানে বলে দিল, মাদুলিটা পরে নাও। আমি তাড়াতাড়ি মাদুলিটা কুড়িয়ে নিয়ে বাহুতে পড়ে নিলাম। 


হঠাৎ প্রচণ্ড বাতাস বইতে শুরু করলো। এ অবস্থায় তাঁবুর মধ্যে থাকা নিরাপদ মনে হল না। যেকোনো মুহূর্তে তাঁবুর নিচে চাপা পড়তে হবে। 
বাইরে এসে ঢিবির উপর বসলাম। মন থেকে দুঃশ্চিন্তা দূর করতে একটা সিগারেট ধরাবার চেষ্টা করলাম, কিন্তু ঐ হাওয়াতে কিছুতেই দেশলাই জ্জললো না। কিছুক্ষণের ভেতরেই বাতাস তাঁবুটাকে উল্টে ফেললো। অ্যালুমিনিয়ামের হাড়ি হাওয়ার ধাক্কায় জোওে গড়িয়ে গিয়ে একটি পাথড়ে ধাক্কা খেল। টং করে শব্দ হল।  


 
এই ভূতুরে পরিবেশে ধাতব শব্দটি শুনে ভালো লাগলো। এটির মধ্যে অন্তত কোন অস্বাভাবিকতা নেই। হাওয়ার তেজ যতই বারতে লাগলো, আমার ততোই মনে হতে লাগলো নিচের উপত্যকা থেকে সব গাছগুলো মাটি ছেড়ে উঠে আমার দিকে ধীরে ধীরে হেঁটে আসছে। হাওয়াতে ডালপালাগুলো আন্দোলিত হচ্ছে আর হাজার হাজার কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে, ‘ধর, ধর, ওকে ধর’। ভয়ে আমার কপাল ঘেমে উঠলো। আর একবার মুজংকে ডাকার চেষ্টা করলাম। কিন্তু গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হল না।


জঙ্গলে কোনোদিনই রাইফেল ছাড়া আসিনি। কমপক্ষে একটি পিস্তল তো কোমরে থাকতোই। অবশ্য এখন অস্ত্র থাকলেই বা কি করতে পারতাম! হাঠাৎ দেখলাম আমার সামনে প্রকাণ্ড একটি হরিণ আর তার পিঠের ওপর ভীষণ লম্বা জটাজুটিধারী এক বৃদ্ধ। বৃদ্ধের মুখ থেকে গল গল করে রক্ত  পড়ছে। বৃদ্ধের হাতে একটি ত্রিশুল। আর তাতে একটি নরমুণ্ড গাঁথা। আমার মাথা ঝিম ঝিম করে উঠলো। সেই মুহূর্তে আমার চারদিকের গাছ-পালার সঙ্গে সঙ্গে নানা জানোয়ার আমাকে যেন ঘিরে ফেলতে লাগলো। ছোটবেলা থেকে যেসব পশুপাখি আমি শিকার করেছি তার সবাই আমাকে ঘিরে ফেললো।  


আমি উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলার চেষ্টা করলাম, আর শিকার করবো না । আমাকে ক্ষমা কর।’ কিন্তু ততক্ষণে চিতা, সুন্দরবনের বাঘ, হরিণ চারদিক থেকে আমাকে ঘিরে ফেলে হামলা করতে উদ্যত হল। 

আমি পেছন ফিরে দৌড়ে পালাতে গেলাম। কিন্তু আমার চারদিকে ঐ হরিণের পিঠে বসা বৃদ্ধটা খল খল হাসি হেসে ঘুরতে লাগলো। ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। আমি আরেকবার উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করলাম, কিন্তু পারলাম না, পড়ে গেলাম। তারপর আর কিছু মনে নেই। অজ্ঞান হবার আগে আমার চোখের সামনে সেই সুন্দর বনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারটিকে আমার ওপর লাফ দিতে দেখলাম। অনুভব করলাম প্রচণ্ড শক্তিতে সে তার থাবা বসালো আমার বুকের পাঁজরে। কে যেনো আমার নাম ধরে ডাকছিলো। আস্তে আস্তে আমি চোখ খুললাম। এখনও ঘোরের মধ্যে। চোখ খূলতে আমার খুব কষ্ট হল। অনেক কষ্টে চোখ খুলতেই রোদে আমার চোখ ঝলসে গেল। আবার আমি তাকানোর চেষ্টা করলাম, আমার মাথাটি কোলে নিয়ে কুলি সর্দার মুজং আমার মুখের ওপর ঝুঁকে আছে। ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম, মুংরী টি এস্টেটের ম্যানেজার হাসান সাহেব, জুনিয়র রেঞ্জার সিদ্দিক সাহেব আমার দু’পাশে বসা। রেঞ্জার সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, ‘এখন তেমন বোধ করছেন সেলিম সাহেব?’ আমি উঠে বসলাম। সিদ্দিক সাহেব ফ্লাস্ক থেকে গরম কফি ঢেলে দিলেন। কফি খেয়ে সিগারেট ধরালাম। সিদ্দিক সাহেব এবং হাসান সাহেব একসঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন, ‘গতরাতে কি হয়েছিলো আপনার?’ ‘ মুজং বলছিলো কিসব অশুভ আত্না আর বুরুন্ডার কথা। রাতে কি দেখেছেন আপনি? আপনার তাঁবুর অবস্থা এমন হল কিভাবে? মনে হয় পাগলা হাতির পাল এসেছিলো রাতে? আমি কোন উত্তর দেবার আগে সিদ্দিক সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, ভালো কথা আপনার রাইফেলটি কোথায় গেল?’ এবার আমি উত্তর দিলাম, ওটা তো রাত থেকেই পাচ্ছি না।! ‘পাচ্ছেন না?’ হাসান সাহেব বেশ অবাক হয়েই প্রশ্ন করলেন। তারপর চা বাগানের ম্যানেজার এবং রেঞ্জার সাহেব এক সঙ্গে প্রশ্ন করলেন ভূতে কি আপনার রাইফেল নিয়ে গেল সাহেব? আমি উত্তর দিলাম না। কারণ আমার এই সব সভ্য শিক্ষিত শহুওে বন্ধুদের কেউই যে আমার কথা বিশ্বাস করবেন না, তা আমি জানি। তাই আমি কফি খেয়ে আস্তে আস্তে উঠে পড়লাম। মাথাটা এখনও বেশ ভার ভার লাগছে। মুজং মালপত্র কাঁধে তুলে নিয়ে রওয়ানা হবার জন্য প্রস্তুুত হল। ম্যনেজার ও রেঞ্জার সাহেব বন্দুক নিয়ে আগে আগে হাঁটতে লাগলেন। এসময় মুজং আমার কানের কাছে ফিস ফিস করে বললো, ‘বাবু সাহেব আমাকে মাফ করো, আমি না পালিয়ে পারিনি। আমার তো কিছু হত না, কারণ মাদুলি ছিল আমার কাছেই। তুমি তো আমার কথা শুনলে না- তাই তোমাকে মাদুলিটি দিয়ে আমি পালিয়ে যাই।’ আমিও মৃদু গলায় মুজংকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ আচ্ছা, রাইফেলটার কি হলো রে?’ মৃজং ওর চোখ বড় বড় করে উত্তর দেয়, সে বড় ভয়ংকর ব্যাপার বাবু, বুরুন্ডা ঐ রাইফেল হাওয়ায় মিলিয়ে দিয়েছে। তোমার কাছে মাদুলি না থাকলে তুমিও ধূলা হয়ে যেতে। অন্য সময় হলে এ কথায় আমি মুজংকে প্রচন্ড ধমক লাগাতাম। কিন্তু গত রাতের বিস্ময়কর অভিজ্ঞতার পর আমার স্নুায়ু এখনও দুর্বল থাকায় আমি চুপ করেই থাকলাম। পেছন ফিরে রেঞ্জার সিদ্দিক সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি সেলিম ভাই, ‘ভূত-প্রেত নিয়ে আলাপ হচ্ছে বুঝি?’ আমি আমার বন্ধুদের কথার কোনো উত্তর দিলাম না। কারণ জবাব দিয়ে কোনোই লাভ হত না। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, আমার থ্রি সিকসটি সিকস বোরের ম্যানলিকার রাইফেলটি কিভাবে তাঁবু থেকে অদৃশ্য হয়েছিলো তা আজ এতদিন পরেও ভেবে বের করতে পারিনি। আমার মনে অন্য একধরনের সন্দেহ কাজ করে। আমার জীবনে ঘটে যাওয়া ‘বুরুন্ডার’ ঘটনা অলৌকিক কোন কাহিনী নয়। ভৌতিক কোন বিষয়তো হতেই পারে না। স্বপ্ন দেখেছি! তা কি করে সম্ভব। তবে কি পুরো ঘটনা ভিন গ্রহের প্রাণীদের দ্বারা ঘটেছে? যেমনটি ঘটেছিল বিজ্ঞান সাংবাদিক সোহেল আদনানের ক্ষেত্রে। ভিনগ্রহের প্রাণীরা তার সঙ্গে দেখা করেছে। তাকে বিভিন্ন কাজে সহায়তা করতে অনুরোধ করেছে। এমন ভিনগ্রহের প্রাণীরাই কি সুপার ন্যাচারাল ঘটনা ঘটিয়ে আমার সাথে যোগাযোগের আগ্রহ দেখাচ্ছে? কিন্তু কবে তারা সত্যি সত্যিই আমার সাথে যোগাযোগ করবে? আদৌও কি করবে?

পাঠকের মন্তব্য


আলো : Very Good !

একই ধরনের লেখা, আপনার পছন্দ হতে পারে

bdjogajog