তোমায় খুঁজে ফিরি

আলতামাস পাশা লেখাটি পড়েছেন 379 জন পাঠক।
 অফিস থেকে ফিরে লিজা ওঁদের ফ্লাট বাড়ির বারান্দায় রোগা মতো একটা লোককে বসে থাকতে দেখে। লোকটার মুখ ভর্তি খোঁচা খোঁচা দাড়ি। রুক্ষ বিবর্ন চুলে কতকাল তেল পানি পড়ে নি কে জানে। লিজার পায়ের শব্দে লোকটা  মুখ তুলে তাকায়। লিজা লক্ষ করে লোকটার দু’চোখ ক্লান্তিতে ভরা। মৃদু কণ্ঠে লোকটা বলে আমাকে কিছ “আপা আমাকে কিছু খেতে দেবেন?”  

মানুষটার প্রশ্নে লিজা একটু থতমত থেয়ে যায়। আসণে মানুষটাকে তার খুব চেনা লাগছে। কোথায় যেন এই লোকটাকে সে আগেও দেখেছে। কবে তা ঠিক মনে করতে পারছে না।  
লোকটাকে বারান্দায় বসতে বলে,  লিজা ৩য়তলা তার নিজের ফ্লাটে আসে। কাজের মেয়ে চম্পা দরজা খুলে দেয়। রান্নাঘরে এসে একটা  প্লেটে ভাত বারতে বলে চম্পাকে। ভাতের পাশে একটু তরকাটি দিয়ে চম্পাকে বলে “যা তো নিচে একটা লোক বসে আছে, ওকে ভাতটা দিয়ে আয়।  ”চম্পা প্লেট আর গ্লাস নিয়ে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতেই লিজা হঠাৎ ওকে ডাকে, “ এই চম্পা শোন, তুই বরং লোকটাকে এখানেই নিয়ে আয়, রান্না ঘরেই  খেতে দে।” 
চম্পার সঙ্গে মানুষটা আস্তে আস্তে ওপরে এসে রান্না ঘরে ঢোকে। সঙ্কুচিত ভাবে চম্পার দিকে তাকায়। লিজা কিছু বলার আগে চম্পাই লোকটাকে একটা ঝাড়ি মারে, “ এই যে বয়েন এইখানে, তড়াতাড়ি খাইয়া লন, আমার ম্যালা কাম আছে।” 

লোকটা ঘরের মেঝেতে বসে। গ্লাস থেকে পানি ঢেলে পাশের কল-তলায় হাত ধুয়ে নেয়। তারপর আস্তে আস্তে ভাত খেতে শুরু করে। এক গ্রাস ভাত খেতেই মানুষটার অনেকক্ষণ সময় লাগে। 

লিজা স্পষ্ট বুঝতে পারে মানুষটা  অনেকদিন ধরে না-খাওয়া । খাওয়ার মতো  শক্তিও মানুষটা হারিয়ে ফেলেছে।  কিন্তু লোকটার মুখের আদলের সঙ্গে কার যেন খুব মিল আছে। অনেক ভেবেও লিজা তা মনে করতে পারে না। 

ঘরে এসে সে পার্স থেকে একটিা একশ টাকার নোট বের করে লোকটাকে দেবার  জন্য মিনিট বিশেক পরে রান্না ঘরে এসে দেখে লোকটার খাওয়া প্রায় শেষ।  একটু পরে লোকটা হাত ধুয়ে তৃপ্তির সঙ্গে পরপর দু’গ্লাস পানি খায়। তারপর লোকটা আরাম করে মেঝের উপরই বসে পড়ে।  

লিজা এবার প্রশ্ন করে, “আপনি থাকেন কোথায়?” উত্তর না দিয়ে লোকটা দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট দুটো কামড়ে ধরে। বিস্মৃত লিজার সামনে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে যায় মানুষটার পরিচয়। আরো ! এ তো শোভন । শোভন ছাড়া আর কেউ তো এভাবে কিছু জিজ্ঞেস করলেই ঠোঁট কামড়াত না। তবু আরও নিশ্চিত হতে লিজা জিজ্ঞেস করে, “আচ্ছা আপনার নাম কি শোভন। চমকে উঠে মানুষটা। যেন খানিকটা অবাক হয়ে লিজার দিকে তাকায়। লিজার দুটো স্বপ্লিল চোখের  সঙ্গে শোভনের মিলন ঘটে। মৃদু মাথা নেড়ে লিজার কথায় শোভন সম্মতি জানায়।  

“আমি –আমি লিজা, আমাকে চিনতে পারছেন না?” বড়ো বড়ো চোখে লিজার  দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে  শোভন। কোনো কথা বলতে পারে না । শোভনের  চোখের দিকে তাকিয়ে লিজা হারিয়ে যায় সাত বছর আগের একটি  দিনে….  

অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে দাঁড়িয়ে সেদিন এক তরুণ ছাত্র  তেজদীপ্ত কন্ঠে ভাষণ দিচ্ছিল । সেই তরুণের কণ্ঠস্বর এমন কিছু ছিল যা বহু শ্রোতাকেই আকর্ষণ করছিল। যে লিজা ভার্সিটির মিটিং-মিছিল সব সময় এড়িয়ে চলত সে লিজাও পায়ে পায়ে এসে দাঁড়িয়েছিল বাংলা বিভাগের সামনের বারান্দায় পরে লিজা জেনেছিল, ছেলেটির নাম শোভন। অর্থনীতি থার্ড ইয়ারের ছাত্র। তারপর…. তারপর ৮৩ ‘এর শিক্ষানীতি-বিরোধী ছাত্র-অন্দোলন। মিছিলে, স্লোগানে  উত্তাল রাজপথ। অন্যায়ের বিরুদ্ধে পাশাপাশি দু’ তরুণ-তরুণী।  শিক্ষাভবনের সামনে প্রচন্ড গুলি বর্ষণ শুরু হলে সবাই ছুটোছুটি আরম্ভ করল আর লিজা হারিয়ে ফেলল শোভনকে। এরপর লিজা আর  শোভনের কোনো খবর পায় নি। শোভনের বন্ধুরা বলেছিল যে, শোভনকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। তারপর ঢাকার বাইরে কোনো জেলে পাঠিয়ে   দেওয়া হয়।  


একে একে ছ’টি বছর পার হয়ে গেছে। লিজা ভার্সিটি থেকে পাশ করে বেরুল। চাকরি পেল। বাবা-মার মনোনীত পাত্রকে বিয়ে করল। শুধু শোভন আর ফিরল না। লিজা মাঝে মাঝে অবাক হয়ে দেখেছে শোভনের ঘনিষ্ট বন্ধুরাও তাকে কেমন সহজে ভুলে গেছে। লিজা কেন পারল না শোভনকে ভুলতে? তবে কি সে শোভনকে ভালোবাসতো? আসলে শোভনের জন্যে তাঁর খুব মায়া হয়। শোভনের আপন বলতে কেউ ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে ওর মুক্তিযোদ্ধা বাবা নিহত হন। মাও দেশ স্বাধীন হবার বছরের দু-তিন মাসের মধ্যে মাবা যান। শোভন দেশকে বড়ো ভালোবাসে। যে ক’দিন শোভনের পাশে থাকার সুযোগ হয়েছে লিজার, সে ক’দিন  আন্দোলনের কাজেই সময় চলে গেছে। শোভনের ব্যক্তিগত কোনো অনুভূতি জানার সুযোগ হয়নি লিজার।  

আজ দীর্ঘ আট ন’ বছর পর শোভনকে এ  ভাবে এ অবস্থায় দেখতে পাবে লিজা তা কল্পনাও করে নি। ‘আমি যাই?’ শোভন যেন লিজার অনুমতি প্রার্থনা করে। কিন্তু লিজা উত্তর দেয় না, সে যেন বাস্তব জগতে নেই। লিজার চোখের সামনে এখন শোভন নেই রয়েছে একটি দেশ, ‘বাংলাদেশ’ ‘একটা জাতি’ ’একটা ভাষা’ ’একটা মুক্তিযুদ্ধ।’কিন্তু শোভনরা কি পেল? নিজের সব প্রিয়জনকে হারিয়ে শোভনরা কি পেল? ‘ন্মৃতি সেীধ, সেনানিবাসের ’শিখা অনির্বান’  না কি অপরাজেয় বাংলা ভাস্কর্য মূর্তি? হঠাৎ লিজার প্রচন্ড ইচ্ছা হয় ছুটে গিয়ে  শোভনের মুখটা দু’ হাতের মধ্যে ধরে আদর করতে, আর বলতে ‘তোমাকে ভালবাসি’।  

তুমিই আমাকে ভালোবাসতে শিখিয়েছ এ দেশকে, এ মাটিকে। কিন্তু  তোমাকে আমি ভুলে গিয়েছি। যেমন ভুলে গিয়েছি এ দেশকে, এ দেশের মানুষের জন্যে মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগকে।  

আজ তুমি  তোমার নিজের দেশের পুলিশের হাতে মার খাও। অন্যায়ের প্রতিবাদ করায়  দীর্ঘদিন তোমাকে  জেল ঘাটতে হয়। শোভন কতদিন তুমি পেট ভরে খাও নি। মায়াভরা একটু আদর পাওনি বলতো। আমি তোমাকে শ্রদ্ধা দেব,  ভালবাসা আর আদর দিব। শান্তি আর আশ্রয় দেব। তুমি নেবে না? সারা দেশ  তোমাকে ভুলে যেতে পারে। আবহেলা করতে পারে কিন্তু আমি তোমাকে ভালোবাসি শোভন ।…  

কলিং বেল বেজে উঠে। লিজার কোনো কথাই আর বলা হয় না । সদর দরজার, লিজার স্বামী হাসানের গলা শোনা যায়, ‘চম্পা তোর বেগম সাহেব ফিরেছে?’   

-	শোভন, তুমি একটিু বস। আমি এক্ষুনি আসছি। বেড রুমে আসে লিজা । 
‘জানো, আজ এক অদ্ভুদ ব্যাপার হয়েছে। বাসার ফিরে  দেখি আমাদের ভার্সিটির সেই দুর্দান্ত ছাত্রনেতা শোভন ভাইয়া আমাদের ফ্লাটের বারান্দায় বসা। বেচারার চেহারা দেখে তো প্রথমে চিনতেই পারি নি।’ এক নিশ্বাসে হাসানকে এতগুলো কথা বলে লিজা খানিকটা দম নেয়। নির্লিপ্ত হাসান উত্তর দেয়- তা না হয় বুঝলাম, কিন্তু এতে এত উত্তেজিত হবার কি আছে? আবার বাসায় ঢোকাও নি তো? শেষে না আবার পুলিশি ঝামেলায় পড়তে হয়। 

হাসানের কথায় লিজার উৎসাহে এবার ভাঁটা পড়ে। সে বলে ‘কি যা-তা বলছো? । ভদ্রলোক কতদিন ভালো করে খান নি। আমি ভেতরে এনে ভাত খাইয়েছি। তারপরই না চিনতে পারলাম যে উনি শোভন ভাই।’ 

‘করেছ কি লিজা?’ চিৎকার করে ওঠে হাসান।  ‘শোভনের মতো লোকদের এ বাসায় এনেছ? হায়! হায়! একে তো জেলখাটা রাজবন্দি। তার উপর নিশ্চয় এখনও আন্দোলনে জড়িত। আমি সরকারি চাকুরে। জানাজানি হলে কী  অবস্থা হবে বল তো? এতই যদি দরদ ভদ্রলোকের জন্যে, কিছু টাকা দিয়ে বিদায় করলেই তো পারতে। আবার বাসায় এনে তোলা কেন? যাও, তাড়াতাড়ি শ’ দুয়েক টাকা দিয়ে আপদ বিদেয় কর গে।”  লিজা স্তম্ভিত হয়ে যায় হাসানের ব্যবহারে। কি করবে বা কি করা উচিত বুঝতে পারে না। হাসান আবারও ধমক দিয়ে চিৎকার করে, যাও লিজা, টাকাটা দিয়ে তোমার শোভন ভাইয়া না কি যেন নাম, তাকে বিদেয় কর তাড়াতাড়ি। তারপর টেবিলে  ভাত দাও । খুব খিদে পেয়েছে।   

টাকা হাতে নিয়ে লিজা রান্না ঘরে যায়। কিন্তু শোভনকে সেখানে দেখতে পায় না। শোভন ততক্ষণে সদর দরজা  খুলে রাস্তায় নেমেছে।  শেষ বারের মতো লিজাদের ফ্লাটটা শোভন দেখে  নেয় । তারপর ফুটপাত ধরে ক্লান্ত অবসন্ন দেহ নিয়ে হাঁটতে থাকে। গন্তব্য তার জানা নেই …

পাঠকের মন্তব্য


অন্যন্যা : অসাধারণ !

Tuhin Dhali : চমৎকার

একই ধরনের লেখা, আপনার পছন্দ হতে পারে

bdjogajog