অস্থির পৃথিবীর কথকতা

আলতামাস পাশা লেখাটি পড়েছেন 211 জন পাঠক।
 ‘চারিদিকে তর্ক উঠে সাঙ্গ নাহি হয়;
কথায় কথায় বাড়ে কথা,
সংশয়ের উপরেতে চাপিছে সংশয়
কেবলি বাড়িছে ব্যাকুলতা।’

আজকের বিশ্বের মানুষ তর্কে তর্কে আবিল। কথারও শেষ হল না। তর্কের শেষ হল কই? যা চলছে এই বিশ্বে, তাই চলছে বৃহৎ সংসারেও, পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও। সর্বত্র এক সুর, এক রা। ব্যাকুল ব্যগ্র মন তর্কেতর্কে আবর্তিত, দিশেহারা। এমন হবেই, কবি তাই লিখেছেন, 

‘অন্ধকার নাহি যায় বিবাদ করিলে,
মানে না বহুর আক্রমণ, একটি আলোক শিখা সুমুখে ধরিলে
নীরবে সে করে পলায়ন।’ 

তবু নিরর্থক, তবু ব্যর্থ সব- দীর্ণ-দীর্ণ হয়ে ছিন্নভিন্ন হচ্ছে দৈনন্দিন সংসার, মনুষ্যবোধ, স্বপ্নসাধ কিছু নেই- নেই কিছূ কোথাও। পরশ পাথরও আজ বিমর্দিত, কলংকিত, কলূষিত এবং স্বার্থ স্বপ্নে কুটিল। এ এক নগ্নতার উচ্ছৃংখল স্রোত তীরভূমি প্লাবিত করে মানুষের যা কিছু সৌম্য শান্ত সুন্দর-দিয়েছে উপড়ে।

কবির আর্তনাদ শুনি-

‘চারিদিকে নৃশংসতা করে হানাহানি,
মানবের পাষাণ পরাণ,
শাণিত ছুরির মতো বিঁধাইয়া বাণী হৃদয়ের রক্ত করে পান।’

আপাত মধুর যা, তাই বিষ। নিতান্ত সহজে করায়ত্ত যা, তাই স্বার্থ সম্পদ। মুহূর্তে জাগতিক সত্য অগ্রাহ্য হলেও যা সত্য- বাস্তব যা- রূঢ় বাস্তব সে আবর্র্তিত, ফিরে আসেই। এ ফিরে আসা তার ধর্ম। ইতিহাসই তাকে পালাক্রমে এনে দাঁড় করায়। স্বার্থপূর্ণ বুদ্ধি অন্ধ, চক্ষুহীন। কিন্তু কাল মহাপরাক্রমশালী। তার গতি অপ্রতিরোধ্য। তাই সত্যের পরম পবিত্র আর্বিভাব কল্যাণ শ্রীবিভূষিত-

‘সমুদয় মানবের সৌন্দর্যে ডুবিয়া,
হও তুমি অক্ষয় সুন্দর।
ক্ষুদ্ররূপ কোথা যায় বাতাসে উড়িয়া
দুইচারি পলকের পর।’

বিশ্বেও মানুষ অনেক জ্বলেছে সবাই- ছোট, বড় ছেলেমেয়ে, মা-বোন, এখনো কি জ্বলার শেষ হয়েছে? হয়নি, আমরা জানি। কালবৈশাখীর ঝড়ে ভেঙ্গে পড়ছে সব, শেষ হতে বসেছে দৈনন্দিন বিচিত্র ইতিহাস, জীবন, স্বপ্ন, সংসার। আজ প্রয়োজন মানুষের সেবা, মানুষের প্রেম, মানুষের করুণা, মানুষের সামগ্রিক সুস্থ আলিঙ্গন।

কিন্তু আছে কি তা মানুষের স্বভাবে?

সেন্ট ফ্রান্সিস সম্পর্কে লিখেছিলেন কবি চেস্টারটন:
‘He treated the whole mob of man as a mob of King’-  আহা! প্রতিটি মানুষকে তিনি রাজসম্মান দিতেন।

আমাদের নবী করিমও বলেছেন, ‘ভালবাসার শ্রেষ্ঠ জিনিষ মানুষ। আল্লার ইচ্ছায় মানুষ মাত্রেরই সেবা করবে তোমরা। মানুষের জীবন সংকট দূর করে কল্যাণশ্রীতে পূর্ণ করে তোলো সকল মানুষের জীবন ও সংসার। তোমাদের মধ্যে যিনি আল্লাতে ও আমাতে নিবেদিত প্রাণ, তার উচিত এই পৃথিবীকে সুরুচিসম্পন্নদের উপযুক্ত করে গড়ে তোলা।’

ডব্ল্উি এইচ অডেনও বলেছেন:
There is no such thing as the state
 And no one exists alone
 Hunger allows no choice
To the citizen or the police
 We must love one another or die.’

একবার রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধী উভয়ে বলেছিলেন (১৯২১)- 

‘কোন ক্ষেত্রেই এবং কোন কারণেই কাহারও ব্যক্তিত্বের কাছে আমাদের বিচারবুদ্ধিকে সমর্পণ করা উচিত নয়। 
‘প্রেম বশে যে বিচারবুদ্ধি ত্যাগ, তাহা জোরজবরদস্তির বিচারবুদ্ধি অপেক্ষা অনিষ্টকর।

অর্থাৎ দোষ ও দুর্বলতা জ্ঞানী ও মুর্খ সকলেরই কিছু না কিছু থাকে, পার্থক্য এই যে, মুর্খের দোষদুর্বলতা দুনিয়ার সবাই দেখতে পায়, দেখতে পায় না কেবল সে নিজে। আর জ্ঞানীর যত কিছু দোষ ও দুর্বলতা, তা কেবল তিনি নিজেই সব দেখতে পান অপরে তা দেখতে পায় না।

দূরদর্শী এক সমাজবিদ বলেছেন এক আশ্চর্য সত্য কথা। তিনি বলেছেন- ‘ মানুষের নিজস্ব যে কান্না থাকতে পারে, পৃথিবীর কোনো রাজনীতিবিদই তা শোনেন নি কখনো।’ 

কথাটি কি সত্য নয়?

রবীন্দ্রনাথ তাই বলেছেন- ‘ আমি এসেছি এই ধরণীর মহাতীর্থে- এখানে সর্বদেশ, সর্বজাতি ও সর্বকালের ইতিহাসের মহাকেন্দ্রে আছেন নরদেবতা- তারি বেদীমূলে নিভৃতে বসে আমার অহংকার, আমার ভেদবুদ্ধি স্খলন করবার দুঃসাধ্য চেষ্টায় প্রবৃত্ত আছি।

বুদ্ধি যদি রাজনীতি নির্ভর হয়, তা কলূষ কালিমায় লিপ্ত। বুদ্ধি যদি দলগত হয়, সত্য তার নিজস্ব আলো নিয়েই অন্তর্হিত হয়। এসব ক্ষেত্রে প্রকৃত আলো আর জীবনে, সত্যে, বুদ্ধিতে প্রতিভাত হয় না। হৃদয়ের জীবন্ত অনুভূতি কর্মে আর রূপায়িত হবার সুযোগ গ্রহণে তৎপরতা দেখায় না। 

অর্থাৎ সেক্ষেত্রে উদ্ধারের একমাত্র মন্ত্র  উচ্চারিত দেখি ‘নৈবেদ্যে’
‘ভাবের ললিত ক্রোড়ে না রাখি বিলীন
কর্মক্ষেত্র করি দাও সক্ষম স্বাধীন।’
‘ফালগুনীতে কবিশেখর যে প্রাণের বন্দনা গেয়েছেন মহারাজকে উদ্দেশ্য করে আজ আমরাও নতুন করে আরেকবার তা স্মরণ করি:

‘মহারাজ, আপনার দরজার বাইরে ঐ যে কান্না উঠেছে সে কান্নআ থামায় কারা? ঐারা বৈরাগ্য বারিধির তলায় ডুব মেরেছে তারা নয়, যারা কাজের কৌশলে হাত পাকিয়েছে তারাও নয়, যারা কর্তব্যের শুষ্ক রুদ্রাক্ষের মালা জপছে তারাও নয়, যারা অপর্যাপ্ত প্রাণকে বুকের মধ্যে পেয়েছে বলেই জগতের কিছুতে যাদের উপেক্ষা নেই, জয় কওে তারা, ত্যাগ করেও তারাই, বাঁচতে জানে তারা, মরতেও জানে তারা, তারা জোরের সঙ্গে দুঃখ পায়, তারা জোরের সঙ্গে দূর করে- সৃষ্টি করে তারাই, কেননা তাদের মন্ত্র আনন্দের মন্ত্র, সবচেয়ে বড়ো বৈরাগ্যের মন্ত্র কেমন?

আজ বিশ্বব্যাপী নদী তীরে ‘চখাচখীর কাকলি কল্লোল ছাপিয়ে উঠেছে মানুষের কান্না। আজ বিশ্ব জুড়ে প্রতিটি ঘরের চারদিকে জ্বলছে দাবাগ্নি। তথাকথিত সোশ্যাল মিডিয়া- করপোরেট আগ্রাসন ইন্টারনেট মোবাইল গেমস এর যথেচ্ছ ব্যবহার তরুণ প্রজন্মেও মধ্যে তৈরি করছে একধরনের অস্থিরতা। অথচ সমাজবিদরা বাজিয়ে চলেছেন নিরোর বাঁশি।

তাই রবীন্দ্রনাথের কবিশেখর বলতে ছাড়েন নি সত্য কথা-

‘মহারাজ ওরা কর্তব্য ভালোবাসে
বলে কাজ করে, আমরা কাজকে ভালোবাসি বলে কাজ করি- 
এজন্যে ওরা আমাদের গাল দেয় বলে নিষ্কর্মা,
আমরা ওদের গাল দিই বলি নির্জীব।’

আজ নরদেবতার অসম্মান ঘরে ঘরে। এরাই শ্রেষ্ঠ, এই শ্রেষ্ঠ আসুক আমাদের মধ্যে। এদের অসম্মান যেন না হয় আমাদের মধ্যে। এদের অসম্মান যেন না হয় আমাদের হাতে, এই হোক আমাদের ধ্রুব উদ্দেশ্য। এদের পাশে গিয়ে যেন দাঁড়াতে পারি। দাঁড়াতে যেন কুণ্ঠাবোধ না করি। নিজস্ব সংস্কৃতিতে বিশ্বাস যেন থাকে অটুট। গোপন যা, সকলের ধ্যানের -বোধের বাইরে যা, অন্ধকারে বন্ধ তা যেন বাইরে ফেলে রাখি- প্রকাশমান জীবন দেবতার যেন অবমাননা না ঘটে।

-তাই আজ দেখতে পাই, দেশে দেশে ঘরে ঘরে, ওরা যারা সবার ওপরে,তাদের সৌভাগ্যের শেষ নেই; যারা রাজ্যশাসনে, শিক্ষায়তনে নৃত্যশিল্পীর ভূমিকায় তাদেরও নেই দায়দায়িত্ব।

তাই?

‘পাখি আসিল। সঙ্গে কোতোয়াল আসিল, পাইক আসিল, ঘোড়সওয়ার আসিল। রাজা পাখিটিকে টিপিলেন। সে হ্যাঁ করিল না, হুঁ করিল না। কেবল তার পেটের মধ্যে শুকনো পাতা খস্খস গজগজ করিতে লাগিল'।

আজকের পৃথিবীও বাহ্যত; প্রাণহীন, বাইরে অচঞ্চল ও সম্মুখে নির্বিরোধী পেটগুলোতে টেপা মাত্র খসখস গজগজ আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। এমন দুঃসহ অবস্থার পরিবর্তে কবে স্বাধীন, মুক্ত, ঐশ্বর্যময় মানব সমাজ উদ্বুদ্ধ, বিমুগ্ধ, রক্তধারা আত্মায়, চেতনায় ও গতিরূপে সৃজনশীল হতে কবে দেখবো আমরা? 

পাঠকের মন্তব্য


একই ধরনের লেখা, আপনার পছন্দ হতে পারে

bdjogajog