দ্বি-খণ্ডিত পুরুষ

Shashwoto Dad লেখাটি পড়েছেন 18 জন পাঠক।
 পরিচয়- আমি নিতু; একপাক্ষিক প্রেমিকা.  ও সেতু; আমার ভালবাসার ভালবাসা. আর ও ? ও তো ও ই; আমার নীলকন্ঠ ৤

আমার নিত্য দিন বেঁচে থাকার সুর সঙ্গের তাল৤  আমার আর নীলকন্ঠের পরিচয়টা অনেক আগে থেকেই. আমরা খুব ভালো ঠিক বন্ধু বলব না, তবে একে অপরকে বুঝতে পারি.৤আমি খুব রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে৤  প্রেম সেখানে বড় লজ্জা আর বিধি নিষেধের নাম৤ তবুও আজকাল কেন জানি না নীলকন্ঠকে অনেক বেশি উপলব্ধি করছি৤ সবসময় ওকে প্রায়োরিটি দিয়ে চলেছি৤ আমি বুঝতে পারছি আমি ভাঙছি,আমি নষ্ট হতে চলেছি-পরিবার আর আমার নিজস্ব সত্তা ও চিন্তা ধারার বাইরে চলে এসেছি৤  প্রচণ্ড যুদ্ধ করছি, কিন্তু পারছি না সত্যি বিশ্বাস কুরুন-আমি জানি এ সর্বনাশা খেলা আমি খেলতে চাই না৤ কিন্তু কি করব! আমি তো আমারই; মনতো আর আমার নয়-সে তার মতো৤ তাই বিপত্তিও ঘটল৤ 

সেদিন সন্ধ্যায় নীলকন্ঠ আমাদের বাড়িতে এলো৤ আমি সুযোগ বুঝে তাকে বুঝিয়ে দিলাম.আমি তোমার প্রণয় বিষে জলছি প্রতিনিয়ত৤ তুমি কি কিছু করতে পার? ও কিচ্ছু বলল না৤  চুপচাপ ঘর থেকে বেরিয়ে এলো, একটু হাসলো,তাতে আনন্দের এক রং পেলাম.কিন্তু এ রং যে আমার নয় তা অন্য কেউ সেটা বুঝতে দেরি হয়েছিল৤ তারপর নীলকন্ঠ আমায় ডেকে পাঠালো, দেখা করবে৤ আমি আর দেখা করি নি৤ সামনে যাওয়ার সাহস হয়নি৤  সেতুর ব্যাপারটা ততদিনে আমি জেনে যাই৤ কিন্তু নীল ক্ষমা পাবার যোগ্য নয়.আমি তাকে প্রপোজ করার আগে অনেকবার জানতে চেয়েছি-তুমি কি কাউকে ভালোবাসো? মানে তুমি কি তুমিই আছ নাকি অন্য কারো প্রপার্টি হয়ে গেছ? কিন্তু ও প্রতিবার বলেছে-নাহ,আমি একাই আছি.আর ও খুব ভালোভাবে বুঝত আমি ওকে ভালোবেসে ফেলেছি.এমন একটা ভাণ করত এখনও৤  অপেক্ষা করছে কখন আমি কনফেস করি,তারপর আর কোনো বাধা থাকবে না.আর যখন প্রপোজ করলাম.এই সর্বপ্রথম কোনো মানুষের কাছে নিজেকে অর্পণ করলাম;  যে মানুষটি আমার ব্যক্তিত্ব,আমার সততা সম্পর্কে খুব ভালোভাবেই জানে৤ তবুও সে বাধ্য করলো আমায় এমন একটা রিজেক্ট প্রপোজালে!!!আর দেখা করিনি তার সাথে৤ 

প্রায় দু বছর পরে একদিন হঠাৎ সেতুর সাথে দেখা.তার কাছে জানতে পারলাম সে হাসপাতালে,মৃত্যুর মুখোমুখি৤ দুটো কিডনিই গেছে তার৤ কোনো ডোনার পাচ্ছে না. নীলকণ্ঠ অবশ্য আগে কয়েকবার ওর এই কিডনি প্রোবলেমের কথা বলেছিল। তবে সেটা খুবই নরমাল ছিল। একটু আধটু মেনে চললেই ঠিক হয়ে যাবে। মনে মনে স্থির সিদ্ধান্ত নিলাম,আমারটা কি মিলবে? যদি তাই হয়,তবে আমি এখনো দুটো কিডনি নিয়ে দিব্যি বেঁচে,তুমি কেন মরবে গো! ভাগ্যের মিলন হয়নি তাতে কি, কিডনি মিলন হলো৤ অপারেশন হয়ে গেল,চুরি করে দু দুবার দেখেও নিয়েছি৤

কয়েকদিন পর সকালবেলা সেতু এসে বলল-নীল্ তোমার সাথে দেখা করতে চাচ্ছে.সে খুব আপসেট হয়ে আছে.তুমি আমার এই উপকারটা কর প্লিজ.অনেক কিছু করেছ৤ আমি কিছু বললাম না.তাই তো পালিয়ে কেন বেড়াব? ঠিক আছে যাব৤  গেলাম, রুম থেকে সবাই বেরিয়ে গেল, আমি আর নীলকন্ঠ৤ আমি কিছুটা হতবাক৤ কি বলতে পারে! নীলকন্ঠ যা বলল তা কোন অর্থে বলল আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না৤ফাইনালি সে আমাকে সঙ্গী করতে চাইল.বলল-সত্যিই তুমি আমাকে বড্ড ভালোবাসো৤ আমি তোমার হাতে হাত রাখতে চাই৤ আমার জন্য যে জীবন বলি দিলে এই অর্ধ জীবনটাকে আমি পূর্ণ করতে চাই.৤ শুধু বললাম-এত কৃতজ্ঞতা তোমার আছে জেনে অস্বস্ত্বি বোধ করছি.তুমি ভালো থেকো. আমার বোনের রামকে নিয়ে কি লীলা খেলবো,বলতো? তুমি তো বাজিকর! আমি খুবই সাধারণ৤ চলে আসি৤ ও অনেকবার পিছন থেকে ডাক দিল,তুমি ভুল করছ. প্রথম ভুল আমি করেছি, এবার তুমি করছ. দোহাই তোমার- আমার পুরো কথাটা শোনো.কয়েক বছর পর. আর দেখা সাক্ষাত নেই. শুনেছি ওরা বিয়ে করেছে. বাহিরে কোন এক কান্ট্রিতে আছে. আজকাল খুব ক্লান্ত লাগে. আমি নেপালে এসেছি একটা অফিসিয়াল কাজে. এখানে কয়েকদিন থাকব. শীতকাল শরীরটা কেমন যেন অলস হয়ে থাকে. সকালের ওই এক কাপ হট কফিতে কাজ হয় না৤ তাই ঠিক করলাম কাল সকালে কাছের একটা পার্কে হাঁটতে যাব৤ সকালে উঠেই দেখলাম, আজ খুব কুয়াশা. পথঘাট ভালো দেখা যাচ্ছে না. কি করব? তবুও গেলাম. আচমকা হাঁটতে হাঁটতে লক্ষ্য করলাম,আরে এ কি! কুয়াশা ভেদ করে আমি কাকে দেখছি,সামনে দাঁড়িযে! সেতু. প্রচণ্ড ঠান্ডা বাতাস, গায়ে একটা শাল জড়ানো৤ সেতু!!! কেমন আছ? তোমরা কি এদেশে আছ? জানতাম না৤  সেতু প্রচন্ড অভিমানে বলল- জানলে বুঝি আসতে না? কেন পালিয়ে বেড়াও? পেরেছ মনকে মুক্তি দিতে? না পেরেছ নীলকে বাদ দিতে. সেতু আমি কি পারিনি সে ব্যর্থতা শুধুই আমার, তুমি কেন বিচলিত? আমি তো যাইনি তোমাদের মাঝে! কে বলেছে তুমি আমার সুখ পাখিটা আমায় উপহার দিয়েছ? নীল আর আমার নেই. সেদিন তোমার কিডনিই শুধু সে গ্রহণ করেনি,বরং তোমায় তার অন্দর মহলের খাঁচায় বন্দি করেছে সন্ধি হওয়ার আশায়. জানি না হয়ত কৃতজ্ঞতা নয়তো কোনো নিদারুন অক্ষমতা. আমি আর তাতে বাস করি না৤ আমার মত করে,সেখানে তুমি বিচরণ কর. জানো, সেও আজ ক্লান্ত; মাঝে মধ্যে বলে সেতু তুমি অন্য কাউকে বিয়ে কর৤  এ লাইফ তোমার জন্য নয়. আমার অতীত গ্লানি, আমি বহন করে তোমায় সুখ দিতে পারছি না, পারি নি তোমাকে অস্বীকার করতে, পারি না আবার নিতুর সত্যিকার ভালোবাসাকে অবহেলা করতে, যে আমার জন্য সব সুখ থেকে বঞ্চিত. আমি কি করে সুখী হই বল? এ যে আমার বিবেককে শেষ করে দিচ্ছে তিলে তিলে! কি করার ছিল আমার, কি করতে পারতাম? এসব ভেবে সে প্রায় অসুস্থ আর অন্য মনস্ক থাকে. কয়েকবার সাইকিয়াট্রিস্ট এর সাথে দেখা করেছি. কিন্তু উনারা বলছেন- মনের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়া অসীম চিন্তার ব্যাপার. চিকিৎসা চলছে. আশা নেই! এমন দ্বি-খন্ডিত পুরুষের ঘর করে কেউ সুখী হতে পেরেছে, নিতু? তার অর্ধেক জুড়ে তুমি বাকি অর্ধেক জুড়ে আমি. সে ভাবছে সেতু আমাকে প্রচণ্ড ভালবাসে. তাই এত কিছু জানার পরেও এমন একটা নিথর পাথরের সাথে নিজেকে বিসর্জন দিয়ে চলেছে দিনের পর দিন, প্রতিদিন. আর নিতু? ও তো! আমি কি করব? কি করব আমি? কেন এত কঠিন সাজা? যা থেকে মুক্তির কোন পথই খোলা নেই! সেতু সব শুনে থ হয়ে দাড়িয়ে রইলো. কি বলবে, কিচ্ছু বলার নেই. কেন এমন হয় বল তো? তিনটি জীবন নষ্ট হলো. অথচ কেউ দায়ী নই আমরা. যে যার পজিশনেই একজন সত্য মানুষ. যেখানে তিনজনের ভালবাসাই খাটি৤ এত ডেসটিনি, কারো হাতে কিছুই নেই, নিখাদ জিনিসেও নিখাদ সুখ পাওয়া যায় না. আবার দেখুন শত শত ভেজাল মেশানো জীবনেই কতজন যে আছে দিব্যি সুখে. এর মানে আপনি কি বলবেন? কি বলে স্বান্ত্বনা নিয়ে বাকি জীবন পার করবে এই তিন তরুণ-তরুণী? এভাবে ধুকে ধুকেই কি? আমি জানি না. হয়ত এমন দ্বি-খন্ডিত নারীও আছে. ইদানিং বেশির ভাগ প্রণয় করে পাওয়া পরিণয়ে সুখ কেন ক্ষণস্থায়ী হয় জান, সেতু? কারণ আমরা সঠিক লাভারকে চিনে নিতে পারি না। যে আমার ট্রু লাভার বা আমি যার সেটা বুঝতে পারি না। আর বুঝলেও বড্ড দেরি হয়ে যায়! আর শুধু প্রেম পরিণয়ই বা কেন? ভালবাসার যেকোন মিলনও তো হতে পারে, তাই না? এটা আনসলভড একটি ইস্যু। তাই তো এদের  লাইফও সমান্তরাল সমীকরণে সমাধান খুঁজে পায় না। যেমনটা পাইনি আমি নিজেই, তুমি আর নীলকণ্ঠ! তবুও বেঁচে থাকতে হবে; জানি না কেন এমন আধমরা লাইফ নিয়ে বেঁচে আছি, থাকতে হবে? কেন? এই কেন প্রশ্নের উত্তর নেই কেন, বলত? মাঝে মধ্যে মনে হয়-
“জন্ম আমার মিথ্যেই হল
যাই তবে বনবাসে চল!
আর কি পিছুটান, কোন মায়া
নেই যে রৌদ্র গগণে একটুও ছায়া- 
সেদিন এসে কেঁদেছিলাম, মায়ের বক্ষে দুলে হেসেছিলাম
কী সে যে নির্মল আনন্দ,
বোধ হই কেবল অমৃত স্বাদটাই নিলাম! 
হু, তা বড় নশ্বর, মেঘে ঢাকা ধূসর মজা
বহমানতায় পড়ে আছে নিষ্ঠুর সাজা।”

যাই হোক,সত্যিই জীবন বড় নিষ্ঠুর সুন্দর বিচিত্রময় এক অকস্মাৎ ছন্দের তাল. কখনো সে ধ্বংসের নৃত্যে কারো সুখ স্বপ্নের সুনামি তো কখনো বা আবার সুখের জোয়ারে ভাসিয়ে চলেছে কাউকে; যেন এক মদ্যপ দক্ষ সুখ জোয়ারি, দক্ষ   কারিগর৤

পাঠকের মন্তব্য


একই ধরনের লেখা, আপনার পছন্দ হতে পারে

bdjogajog