সাম্প্রতিক প্রকাশনা

দুই নগরের উপাখ্যান (অষ্টম পর্ব)

আলতামাস পাশা লেখাটি পড়েছেন 181 জন পাঠক।
 অষ্টম পরিচ্ছেদ

"My friend come to me,
Sad in his eyes
Told me that he wants help
Before his country dies.”

১.
স্বদেশ রায় ছুটে চলেছেন কলকাতার পথে। উদ্দেশ্য দ্রুত সেখানে পৌঁছে দেখা করবেন কলকাতার প্রবীণ সাংবাদিক কৃত্তিবাস ওঝার সঙ্গে। এই কৃক্তিবাস ওঝার আসল নাম রণেন মুখার্জী। স্বদেশ রায় কলকাতায় পৌঁছে দেখা করলেন ফরোয়ার্ড ব্লকের নেতাদের সঙ্গে। ঢাকা থেকে দীর্ঘ হাঁটা পথে, বাসে, ট্রেনে চড়ে কলকাতায় পৌঁছে স্বদেশ তখন খুবই বিধ্বস্ত, হতভম্ব  আর প্রতিবাদী। গণহত্যার ভয়াল স্মৃতি তখন তার সমস্ত অবয়বে। বাক্যে, কথায়, বুলেট, রক্ত এবং লাশের কথা। 

কলকাতার রাজনৈতিক আবহাওয়া তখন গরম। একদিকে ভারতে কংগ্রেস বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। অন্যদিকে পশ্চিম বাংলায় নক্শাল আন্দোলন তখন তুঙ্গে। খোদ পশ্চিম বাংলায় কংগ্রেসের বিজয় নিরঙ্কুশ না হলেও মুসলিম লীগ ও ঝাড়খ- পার্টির সমর্থন নিয়ে রাজ্যে কংগ্রেস মন্ত্রিসভা গঠন করেছে।

নক্শালীদের শ্রেণীশক্র খতমের অপারেশনও তখন তুঙ্গে। চেয়ারম্যান মাও’র মন্ত্রে দীক্ষিত কমরেড চারু মজুমদার তখন কংগ্রেসী, মৌলবাদী, সংসদীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাসী বামপন্থী, লুটেরা ব্যবসায়ী ও  মহাজনদের পাখি শিকারের মধ্যে দিয়ে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের পথ প্রশস্ত করে চলেছেন।  ভয় তখন সব জায়গায়। ব্যবসায়ীরা সন্ধ্যা না হতেই দোকানের ঝাঁপ ফেলে দেন। রাজ্য পুলিশের চোখে নেই ঘুম। কাঁচা পয়সার মালিকরা অজানা ভয়ে যখন তখন শিউরে উঠেন। এমন একটি সময় স্বদেশ রায় কলকাতায় পৌঁছালেন নতুন এক যুদ্ধের সংবাদ নিয়ে। সে খবরে কলকাতা মহানগরী বদলে গেল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন ব্ল্যাক আউটের মহড়া। ইংরেজ, মার্কিন সৈন্যদের উপস্থিতি। ’৪৬ এর হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা,’৫০ এর মন্বন্তর কতকিছুই না দেখেছে মহানগরী কলকাতা। দেখেছে ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান হতে। দেখেছে, জেনেছে পূর্ববাংলার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের আত্মার সম্পর্কের কথা। এই সম্পর্কের কারণেই কি স্বাদেশ রায়, কৃত্তিবাস ওঝার কাছে ছুটে এসেছেন? কে বলবে সেকথা? কলকাতার দৈনিক বসুমতির তুখোড় সাংবাদিক কৃত্তিবাস, ওঝা স্বদেশ রায়কে কি বলবেন? বলবেন কি বাংলাদেশ স্বাধীন হলে আমি কি ফিরে যেতে পারবো আমার পূর্ব পুরুষের ভিটে মাটিতে? স্বপ্নগুলো তার বাস্তবতা পাবে। বার্তাবাহক স্বদেশ রায় পার্ক সার্কাসে পাকিস্তান ডেপুটি হাইকমিশনের তথ্য কর্মকর্তা আলীমুজ্জামানের কাছে ঢাকার সরেজমিন রিপোর্ট দিলেন। 

ওদিকে সীমান্তের ওপারে কুষ্টিয়ায় এসেছেন তাজউদ্দিন আহমেদ। কৃত্তিবাস ওঝা পৌঁছে যান চুয়াডাঙায়। চুয়াডাঙায় মাঠে মানুষ তখন গাইছে, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’। রণেনের সঙ্গে মানে কৃত্তিবাস ওঝার সঙ্গে সেসময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিনের কি কথা হয়েছিল? ইতিহাস কি তা জানে? ইতিহাস বলে ২৫ মার্চ গ্রেফতারের আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও তাজউদ্দিনের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হয় কলকাতায় গিয়ে কি করা হবে সে প্রসঙ্গে। ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের শেষ দিকেই সম্ভাব্য পাকিস্তানী ক্রেক ডাউনের পর কি করতে হবে তা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্থির করেন। তিনি চার যুবনেতা সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মনি, আব্দুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহম্মদকে ভারতে চলে যাবার নির্দেশ দিয়ে তাজউদ্দিনকেও সঙ্গে নিতে বলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আরও বলেন যে, তিনি সেখানে সব ব্যবস্থা করে রেখেছেন। এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্বাধীনতার জন্যে সংগ্রাম করতে বলছেন এবং তা হবে সশস্ত্র সংগ্রাম। যুবনেতাদের বলা হয় ভারতে গিয়ে কলকাতায় চিত্তরঞ্জন ছুতারের ২১ রাজেন্দ্র রোডস্থ বাসায় উঠতে। পূর্ববাংলায় অসহযোগ আন্দোলন শুরু হবার  সঙ্গে সঙ্গেই চিত্তরঞ্জন ছুঁতার কলকাতায় চলে যান এবং ২১ রাজেন্দ্র রোডে অবস্থান করতে থাকেন। 

একদিকে পাকিস্থানী সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া-মুজিব আলোচনার অন্তরালে নিজেদের ‘অপারেশন সার্চলাইট’ কার্যকর করার দিকে এগিয়ে চলে, অন্যদিকে চিত্তরঞ্জন ছুঁতার আর কৃত্তিবাস ওঝাদের কার্যক্রমেও পরিকল্পনা মাফিক চলতে থাকে। 

কৃত্তিবাস ওঝা বেসরকারি দূত হিসাবে তাজউদ্দিন আর নয়াদিল্লি­র মধ্যে সংযোগ ঘটিয়ে দেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখার্জীর দিল্লি সফরের পরপরই কুষ্টিয়ায় ওঝার বার্তা পৌঁছায়, ‘ ওপারে যেতে ভয় নেই। সব ধরনের সহযোগিতা দেয়া হবে।’ এরপর কৃষ্ণনগরে পৌঁছান তাজউদ্দিন। অবশ্য তখনও তিনি প্রধানমন্ত্রী হননি। এরপর আসেন কলকাতায়।  সঙ্গে ব্যারিস্টার আমির-উল-ইসলাম। 

মালবাহী একটি বিমানে করে এ দু’জন ’৭১ এর এপ্রিলের প্রথমে নয়া দিল্লি পৌঁছালেন। ফিরে এসে আবার চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে। মুক্তিযুদ্ধের  প্রধান সেনাপতি ওসমানীও সেখানে। 

আরও একজন মানুষ ’৭১ এর মার্চ মাসেই কলকাতায় পৌঁছালেন। তিনি হলেন চাষী মাহবুব আলম। বাংলাদেশের ইতিহাসে বিতর্কিত একটি নাম। এ নামের ব্যক্তিটির জন্য ইতিহাসের গতি একদিন পাল্টে গিয়েছিল। চাষীর কলকাতা যাবার উদ্দেশ্য ছিল সেখানকার বিভিন্ন বিদেশী মিশনের মাধ্যমে বাংলাদেশের পরিস্থিতি বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা। চাষী কলকাতায় পৌঁছানোর পরপরই হোসেন আলী পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতি একাতœতা ঘোষণা করলেন। পরবর্তীতে মুজিবনগর সরকারের পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে বিতর্কিত একটি কাজে তাকে বরখাস্ত করা হয়।

’৭১ এর ১৬ এপ্রিল । আমিনুল হক বাদশা পৌঁছালেন কলকাতা প্রেসক্লাবে। পরদিন ভোরে সবাইকে এক জায়গায় নেবার কথা জানালেন। নিজের পরিচয় দিলেন তাজউদ্দিন আহমদের প্রতিনিধি বলে। কলকাতার সাংবাদিক মহল গরম হয়ে উঠলো। দেশী- বিদেশী সাংবাদিকের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেল। 

 পর দিন ১৭ এপ্রিল। সকালবেলা। আমিনুল হক বাদশাসহ সাংবাদিকদের গাড়ির বহর এগিয়ে চলে যশোর রোড ধরে। কলকাতার দমদম থেকে বনগাঁ সীমান্ত পর্যন্ত সড়কের নাম যশোর রোড। গাড়ি ছুটে চলে মেহেরপুর সীমান্তের দিকে। তারপর বৈদ্যেরনাথতলা আম্রকানন - বর্তমানের মুজিবনগর। এখানে ১০ এপ্রিল গঠিত প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ নিল। এবার সবাই বুঝতে পারলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব নেই তাদের সঙ্গে। হয় তিনি বন্দি হয়েছেন অথবা তাকে হত্যা করা হয়েছে। মুজিবনগর সরকারের শপথ নেবার তিন দিন পরে ২০ এপ্রিল পাকিস্তান সরকার করাচি বিমানবন্দরে বন্দি অবস্থায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের একটি ফটো সংবাদপত্রে প্রকাশ করলো। মূলত তাদের উদ্দেশ্য ছিল প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার এবং বাঙালিদের মনোবল ভেঙে দেয়া। তবে এর ফলে সারা বিশ্ববাসী জেনে গেল যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এখনও জীবিত আছেন। আর এ ফটো ছাপা হবার পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে আর গোপনে হত্যা করা সম্ভবপর হল না।....... আর তাই ১৭ এপ্রিল মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথ তলার আম্রকুঞ্জে প্রথম জনসমক্ষে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণ পাকিস্তানী সামরিক জান্তার সব হিসেব-নিকেশ নিমেষে পাল্টে দিল। 

ইতিহাস বলে ২৫ মার্চ রাতেই যশোর সেনানিবাস থেকে ২৭ বেলুচ রেজিমেন্টের প্রায় ২০০ সৈন্য পূর্ণ সামরিক সম্ভার নিয়ে কুষ্টিয়ার বিভিন্ন স্থানে অবস্থান গ্রহণ করে। ৩০ মার্চ ভোরে পাকিস্তানীদের বিভিন্ন অবস্থানের ওপর ইপিআর, পুলিশ, আনসার, ছাত্র-জনতার এক বিরাট বাহিনী প্রবল আক্রমণ চালায়। এ আক্রমণের মূল নেতৃত্বে ছিলেন ইপিআর ৪ নং উইং কমান্ডার। ১ এপ্রিল মুক্ত হল কুষ্টিয়া। সংঘর্ষে অধিকাংশ পাকিস্তানী সেনার মৃত্যু হয়। বন্দি হন পাকিস্তানী অফিসার লেঃ আতাউল্লাহ।

কুষ্টিয়া বিজয় ছিল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায়। পাকিস্তানীরা সত্যিই কুষ্টিয়া নিয়ে চিন্তিত ছিল। পাকিস্তানীদের ওয়্যারলেস ইন্টারসেপ্ট করে রায়হানরা শুনতে পেয়েছিল যশোর ব্রিগেড মেজরের কাছে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে কর্ণেল সাদুল্লার রাগত এবং উদ্বেগপূর্ণ কণ্ঠস্বর- ‘ You have been routed by rag-tag. You people have no shame. How could you be routed by unarmed people? You need kick. However, tell your commander if they need any help we will send air sorties. We are in anyway sending two air sorties to Kustia circuit house. We have been able to tackle Dacca which did not bother us much. We are really concernd about Kustia now.’

পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে পূর্ব পাকিস্তান যখন উত্তাল ঠিক সেসময় পশ্চিমবঙ্গে চারু মজুমদার ঘোষণা দিলেন, ‘৭০ এর দশককে মুক্তির দশকে পরিণত কর।’ পার্টি কর্মীদের কাছে চারুর নির্দেশ ছিল গেরিলাদলগুলোর সংগঠন সম্পর্কে চরম গোপনীয়তা বজায় রাখতে হবে। অ্যাকশমন সম্বন্ধেও অনুরূপ গোপনীয়তা বজায় রাখতে হবে। তবে একটি শ্রেণী শক্র খতম হলে, বাইরের লোক হিসেবে খোঁজ নিতে হবে গ্রামবাসীদের প্রতিক্রিয়া কি? কারণ জমিদার, মহাজন গ্রাম থেকে পালাতে থাকলেই গ্রামে কর্তৃত্বের ফাঁকা অবস্থার সৃষ্টি হবে। এ সময় একদিকে যেমন ফসল কেটে নেয়া, জমি দখলের আওয়াজ দিতে হবে তেমনি গ্রাম জীবনসুষ্ঠুভাবে নিয়ন্ত্রণের জন্য বিপ্লবী গ্রাম কমিটি গঠন করতে হবে। চারুর ধারণা ছিল যত ব্যাপকভাবে গেরিলা অ্যাকশনকে ছড়িয়ে দেয়া যাবে শক্রর ঘেরাও থেকে বাইরে বেরুবার সুযোগও তত বাড়বে। চারু মজুমদারের নির্দেশনার কিছু বাস্তব প্রতিফলন ঘটলো ডেবরা, গোপীবল্লবপুর, মুশাহারী, চম্বারণ, আসাম, ত্রিপুরা, অন্ধ্রপ্রদেশ, কেরালা ও পাঞ্জাবে।

প্রবল ক্ষমতার অধিকারী তরুণ-তরুণীকে বিভ্রান্ত করা হল শ্রেণী শক্র বিনাশের বিপ্লবে। পশ্চিম বাংলায় তখন অস্থির একটা অবস্থা। মধ্যবিত্তের বাসস্থান সমস্যা, নদীয়ার উদ্বাস্তু সমস্যা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অভাব ইত্যাদি সব  বড় বড় সমস্যা বালিগঞ্জের ধনী পরিবারের ছেলে-মেয়ে এবং বস্তিবাসী তরুণকে রাস্তায় নামিয়ে আনলো।  এদের আক্রমণের লক্ষ্যস্থল হল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাড়ি, গাড়ি এবং মণীষীদের মর্মর মূর্তি - সব তারা ভাঙলো আর আগুনে পুড়ালো। দেয়ালে দেয়ালে লাল-নীল চিকা পড়লো-‘গ্রামে গ্রামে জোতদার জমিদার খতম চলছে, চলবে। চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান। চীনের পথ আমাদের পথ।’

চারু মজুমদারের বিপ্লবে ঘর ছেড়ে বের হয়ে আসলো বড় ডাক্তারের ছেলে, ধনী ঘরের দুলালী কন্যা, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রেসিডেন্সি আর মেডিক্যাল কলেজের মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা। সব কিছু  কিছু ভেঙে ফেলেছিল ওরা? শোষক শ্রেণীর প্রতিষ্ঠিত তথাকথিত ন্যায় নীতিবোধ, ধর্মীয় কুসংস্কার, জাত-পাতের বাঁদরামী সব-ই?

মাওয়ের রেড বুক হাতে নিয়ে বিয়ে করেছে, মতে এবং মনে মিলেনি তো আবারও পরস্পরকে ছেড়ে গেছে, কেউ কেউ আবার এক ধাপ এগিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মত লিভিং-টু গেদার করেছে। গরিব কৃষকের সঙ্গে বসে মদ, হাঁড়িয়া খেয়েছে। আবার মাঠের কাজে কৃষককে সাহায্য করেছে। কোন কোন শহুরে ধনীর ছেলে রাজবংশী বা ওঁরাও আদিবাসী মেয়েকে বিয়েও করেছে। কিন্তু সবই কি ছিল সময়ের মোহ? তথাকথিত বিপ্লবের ভাবাবেগ মাত্র? আসলে কি সবই একটি রাজনৈতিক খেলা? যে খেলা শেষে দেখা যায় সবই হারিয়েছে ঐ সাধারণ মানুষ? শেষ খেলায় কিছুই পায়নি তারা। 

তবে চারুবাবুরা এ বিপ্লবকেই অ্যাখ্যায়িত করেছেন ‘ ফেষ্টিভ্যাল অব দ্য মাসেস বলে’। এখন চারুবাবুরা কোথায়? তাদের ফেষ্টিভ্যালই বা কোথায়?

৮ মে ১৯৬৭ সাল, সকাল থেকেই শুরু হল ঘড়িবাড়ি, নকশালবাড়ি থানা, ফাঁসী দেওয়া ও শিলিগুড়ী থানার কিছু অংশ জুড়ে নকশালবাড়ির কৃষক অভ্যুত্থান। জমি দখল, ফসল কেটে নেয়া শুরু হল একধার থেকে, মাঝারি গোছের জোতদাররা পালিয়ে গেল অনেকে। খবরের কাগজের বদান্যতায় চারু মজুমদারের নাম ও তার সাথে কানু সান্যাল ও জঙ্গল সাঁওতালের নাম সারা ভারতেই ছড়িয়ে পড়লো এবং সব জায়গারই কমিউনিস্ট মহলে পরিচিত হয়ে উঠলেন এরা। রবীন্দ্রনাথের ‘মৃত্যুঞ্জয়’ কবিতাটি চারু বাবুর প্রিয় ছিল। যখন ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির পুলিশ তাকে নির্যাতন করে হত্যা করে তখনও হয়তো তিনি অনুচ্চস্বরে আবৃত্তি করেছেন, 

”যখন উদ্যত ছিল তোমার অশনি
তোমারে আমার চেয়ে বড় বলে নিয়েছিনু গণি।
তোমার আঘাত সাথে সাথে নেমে এলে তুমি 
যেথা মোর আপনার ভূমি।
ছোট হয়ে গেছ আজ।
আমার টুটিল সব লাজ।
যত বড় হও
তুমি তো মৃত্যুর চেয়ে বড়ো নও।
আমি মৃত্যুর চেয়ে বড়’ এই শেষ কথা বলে যাব আমি চলে।” কিন্তু সে হল অনেক পরের কথা।

অসুস্থ চারু বাবুর মনে বোধ করি চীনা কমিউনিজমের নস্টালজিয়া কাজ করছিল। তাতে আরও মাত্রা যোগ করলো পিকিং রেডিও ও চীনা সংবাদপত্র। ৫ জুলাই, ১৯৬৭ সাল। পিকিং এর পিপলস ডেইলির সম্পাদকীয়তে ছাপা হলো- “ভারতের মাটিতে বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ 'Spring Thunder Over India’  প্রকাশিত হল। পিকিং রেডিও বললো- “প্রতিক্রিয়াশিল ও সংশোধনবাদীদের সশস্ত্র ফৌজ নকশালবাড়িকে ঘেরাও ও নিশ্চিহৃ encirclement and annihilation  করার অভিযান চালিয়ে গেলেও কমিউনিস্টদের বিপ্লবী অংশ জলের মধ্যে মাছের মত নিজ নিজ এলাকার জনগণের মধ্যে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে।” পিকিং বেতারের বার্তাকে তিনি তাদের প্রতি চীনা পার্টির নির্দেশ বলেই ভাবতেন। ১৮ থেকে ২৪ বছরের যুবক-যুবতীদের ঘর ছাড়ার যে আহবান চারু বাবুরা দিয়েছিলেন তা যে কতখানি ভুল ছিল তা বাংলাদেশের মুক্তিয্দ্ধু এবং পরবর্তীতে আজকের ভারতের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে। আজকের পশ্চিমবঙ্গে যে অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটেছে তা’কি চারু বাবু অথবা সিরাজ শিকদারের পথে গেলে আসতো? মায়ের কোল খালি করা যত সহজ সে বুক ভরে দেয়া কি ততই সহজ?

সহজ নয় বলেই রাজনীতি ঠিক মতই চললো। ১৯৭০ সালের মার্চ মাস থেকে পিকিং বেতার থেকে চারুবাবুর রচনা ও নকশাল আন্দোলনের খবরাখবর প্রচার একেবারেই বন্ধ হয়ে গেল। আসলে পুরোটাই ছিল একটি চীনা গোলক ধাঁধা। শেষ পর্যন্ত শ্রেণী শক্র বিনাশ করলেই বিপ্লব সফল হয় এ স্বপ্ন বিলাসই চারু বাবুর পতন ঘটালো। কৃষক-শ্রমিকের পাশে থেকে কাজ করার চাইতে তাদের দিয়ে জোতদার হত্যা করলে বিপ্লব হয় না এই সামান্য ব্যাপারটিই তিনি কোন দিন বোঝেননি। এমন কি চীন যখন তার রেডিও স্টেশন দেবার আবদার প্রত্যাখ্যান করে তখনও তিনি তা বোঝেননি। বোঝেননি বলেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধও চারু বাবুর জন্য গঠনমূলক কিছু বয়ে আনতে পারেনি। তবে তিনি নিজে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেই ছিলেন। অবশ্য পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনাবলী সিপিআই ( এমএল ) এর মধ্যে আর এক প্রস্থ মতবিরোধ তৈরি করেছিল।





২.
চালর্স ডিকেন্সের  A Tale of Two Cities  এর মতো ঢাকা ও কলকাতার বাঙালির মধ্যে এক অদেখা, অজানা বন্ধন ১৯৪৭ এর দেশ বিভাগের পরেও রয়ে গিয়েছিল। কেউ কেউ বাঙালিপনা ভুলে গিয়ে ধর্মকে আকঁড়ে ধরে খাঁটি পাকিস্তানী হতে চেয়েছিলেন। তবু অনেকেই ছিলেন যাঁরা নিজের বাঙালিত্ব বিসর্জন দিতে পারেননি। পারেননি হতাশার কাছে আত্মসমর্পণ করতে। মার্কিন মুলুুকের কবি হুইটম্যানের মত তারাও মনে করতেন- ‘Liberty, let other dispair of you – Is never dispair of you. Is the house shut? Is the master away? Nevertheless, be ready, be not weary of watching, he will soon return, his messengers come anon.’

তবে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরে যখন বাংলাদেশে প্রতিবিপ্লব হল তখন কবি হুইটম্যানের ভাষায় আবারও এসব ব্যক্তিদের বলতে হল-‘Not a grace of the murdered for freedom, but grows seed for freedom in its turn to bear seed, which the winds carry a far and resow....... and snow nourish.’

‘৭১ সালের মহানগরী কলকাতা প্রত্যক্ষ করে খোলা জীপে, বাংলাদেশের পতাকাবাহী ক্যাস্ট্রো টুপি মাথায় বাঙালি তরুণদের। নকশাল দেখা কলকাতা ‘মুক্তি’ দেখে যেন আরও পুলকিত হয়। তাদের কারোবা কাঁধে চাইনিজ স্টেন গান, কারো কাঁধে মার্কিন স্টেন, কারো আবার রাশিয়ায় তৈরি কলাশনিকভ রাইফেল। গ্রামের পথে পশ্চিম বাংলার মেয়েরা কাঁসার থালা এবং গ্লাসে  সন্দেশ, নাড়ু নিয়ে এসেছে মুক্তিসেনাদের জন্য। সন্দেশ ও নাড়– খেতে খেতে মেয়েগুলোর আন্তরিকতা, শ্র্দ্ধা আর ভালবাসা অনুভব করতো বাংলাদেশের তরুণ মুক্তিযোদ্ধারা। এসব ছেলেদের গড় বয়স ছিল ২০-২৫। তাদের কাছে সবাই যুদ্ধের খবর জানতে চাইতো। মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতো বিদ্রোহের গল্প গাঁথা। 

বাংলাদেশে থেকে  আসা তরুণদের রিক্রুটিং ক্ষেত্রে কিছু নীতিমালা মেনে চলা হতো। ভারত সরকারের ভয় ছিল বুঝিবা বামদের হাতে অস্ত্র চলে যাচ্ছে। তাই বামপন্থী প্রতিরোধে রিক্রুটিং শিবিরে বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব ব্যবস্থাপনা ছাড়াও ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন পদমর্যাদার এক অফিসারকে সার্বক্ষণিক নিয়োগ দেয়া হয়। তবে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিনের হস্তক্ষেপে সেটাও পরবর্তী পর্যায়ে অপসারিত হয়ে যায়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিনের ভূমিকা ছিলো চাণক্যের মত। সকল ঝড়-ঝাপটা থেকে তিনি জাতিকে রক্ষা করে চলেছিলেন।   

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা দানে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সিদ্ধান্তে ‘৭১ এর জুলাই মাসে গঠিত হয় ‘ বাংলাদেশ মুক্তিসংগ্রাম সহায়ক কমিটি’। মুখ্যমন্ত্রী অজিত মুখার্জী হলেন কমিটি চেয়ারম্যান এবং সব রাজনৈতিকদলের রাজ্য কমিটির সাধারণ সম্পাদকরা পদাধিকার বলে সদস্য হলেন। কাজ শুরু করার সময় রাজ্য সরকার ‘মুক্তি সংগ্রাম সহায়ক কমিটি’কে ২০ লাখ টাকা অনুদান দেয়। এদিকে মুসলিম লীগ আর ঝাড়খন্ড পার্টি কংগ্রেসের উপর সমর্থন প্রত্যাহার করায় পশ্চিমবঙ্গে শাসনতান্ত্রিক সংকট দেখা দেয়। জারি হয় রাষ্ট্রপতির শাসন। এ সময় বিএসএফ এর আইজি গোলক মজুমদার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে থাকেন। টাঙ্গাইলের কাদের সিদ্দিকির কাছে বেশ বড় রকমের রশদ সামগ্রী পাঠানো হয়। 

৮ সেপ্টেম্বর, ‘৭১ দেরাদুন থেকে কলকাতা আসেন মওলানা ভাসানী, কমরেড মনি সিং, ন্যাপের অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, বাংলাদেশ কংগ্রেসের মনোরঞ্জন ধর। গঠিত হয় জাতীয় উপদেষ্টা কমিটি। তবু কলকাতার মুক্তিযোদ্ধা শিবিরে শিবিরে একটি অন্য রকম হতাশা বিরাজ করছিল। এরা আরও উন্নত প্রশিক্ষণ ও অস্ত্রসহ যুদ্ধে যেতে চাচ্ছিল। এ অবস্থায় দিল্লী থেকে বলিরাম ভগত এলেন শিবিরে শিবিরে বক্তৃতা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে।

অন্ধকার আকাশের নিচে লক্ষ শিশু তখন যশোর রোডে ক্ষুধা আর বন্যার পানির মুখোমুখি। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত জুড়ে তখন থৈ থৈ বানের জল। এমনই সময় মার্কিন কবি অ্যালেন গিনসবার্গ লিখলেন, ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতাটি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চরম ক্রান্তিকাল তখন। আগস্ট মাস থেকেই একধরনের স্থবিরতা পেয়ে বসে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার ভয় পেতে থাকে নেতৃত্ব হাত ছাড়া হবার। আসলে জুলাই পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের চিন্তা ও কাজে সুষ্ঠু সমন্বয় সর্বক্ষেত্রে ছিল না। জুলাই মাসে কলকাতায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ফোর্সেস হেড কোয়ার্টারের সম্মেলনে বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করা হয়। তবে সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে যুদ্ধের সমন্বিত কার্যক্রম শুরু হতে একটু সময় লেগে যায়। পাকিস্তানী সামরিকজান্তা এসময়টায় রাজধানী ঢাকায় স্বাভাবিক অবস্থা দেখাতে সচেষ্ট হয়। খুলে দেয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ শহরের কিছু কিছু স্কুল- কলেজ। অন্যদিকে দেশব্যাপী মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা যুদ্ধের ‘বেস’ ও ‘নেটওয়ার্ক’ গড়ে তোলার কাজ চলতে থাকে। তবে সময় বয়ে যেতে থাকে খুব মন্থর গতিতে। 

ওদিকে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ছুটে চলে বড় শহরে থেকে ছোট শহর, সেখান থেকে গ্রামে গ্রামে। রায়হান এমন পরিস্থিতিতে নিজেও খানিকটা বিচলিত হয়। গেরিলাযুদ্ধের সে অমোষ বাণী তাকে উদ্দীপিত করে। সুন জি বলে গেছেন, ‘যে নিজেকে জানে.... এবং শক্রকে জানে তার বিজয় হবে পরিপূর্ণ’। রায়হান ভাবে সে কি নিজেকে জানে? প্রতিটি মানুষ কি নিজেকে জানে? আর শক্রকে? পাকিস্তানের হানাদার সৈন্যদের সেকি জানে? সেকি জানে শান্তিবাহিনীর শক্রদের? যদি জানে তবে বিজয় আসবে। আর গেরিলাযুদ্ধ চালাতে জনগণই হল আসল শক্তি। এ সময় গেরিলাদের যে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছিল তা মাত্র তিন সপ্তাহের ছিল। ফলে সেখানে যুদ্ধের মৌলিক কৌশলগুলোও সঠিকভাবে সেখানোর সময় হত না। অন্যদিকে গেরিলা যুদ্ধে যে রাজনৈতিক চিন্তা ও চেতনার বিকাশ একজন গেরিলার মনে বিকশিত হওয়া উচিত তাও সঠিকভাবে হয়ে উঠেনি। চীনে না হয় মাওয়ের ছবক নিয়ে বিপ্লবীরা যুদ্ধে গেছে। কিন্তু এখানে তো মাও নেই। তাছাড়া বাংলাদেশের গেরিলা যোদ্ধাদের হতে হবে এদেশের মাটির গন্ধে মিলে-মিশে স্বতন্ত্র এক সত্তা। ধার করা ইজমে এখানে কোন কাজ হবে না।

রায়হান বুঝতে পারে বাংলাদেশের জনযুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ অন্যরকম। এখানে বিপ্লবী কোন দল মুক্তিযু্েদ্ধর নেতৃত্বে নেই। গনতান্ত্রিক একটি দল মুক্তিযু্েদ্ধর নেতৃতে রয়েছে। ঁঅস্ত্র হাতে যুদ্ধের ময়দানে যারা সক্রিয় তাদের একাংশ হচ্ছে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহী সেনা অফিসার ও সেপাই, ইপিআর এর সেনা সদস্য এবং পুলিশ ও আনসার বাহিনী। তারপর আছে স্বল্প প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গেরিলাদলগুলো। এদের রাজনৈতিক আর্দশে আশ্চর্যজনকভাবে এসেছে নেতা হিসাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও বিপ্লবী মন্ত্র হিসাবে ‘জয়বাংলা’। বঙ্গবন্ধু শেখ ও জয়বাংলা শেষ পর্যন্ত আর আওয়ামী লীগের থাকলো না, হয়ে গেল সব গেরিলা মুক্তিযোদ্ধার নিজস্ব অনুভূতি। 

রায়হান বুঝতে পারে যেকোন মূল্যে মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল অটুট রাখতেই হবে। দেশ স্বাধীন হলে তখন ঠিক করা যাবে জনযুদ্ধের সহযোদ্ধাদের অবস্থান কোথায় হবে। রাষ্ট্রের কাঠামো কেমন হবে। বিভিন্ন মতের মিলন ঘটবে কোথায় গিয়ে। 

মধ্য আগস্ট থেকে গেরিলা আক্রমণ তীব্রতর করে রায়হানরা। গ্রামে গ্রামে হানাদার বাহিনীর অত্যাচারও প্রবল হয়ে উঠে। দীর্ঘতর হয় যশোর রোডে শরণার্থীদের দেশত্যাগের লাইন। অ্যালেন গিনসবার্গের কবিতা তখন বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থার বর্ণনা দেয়। ......... 

লক্ষ শিশু দেখছে আকাশ অন্ধকার 
উদর স্ফীত,
বিস্ফোরিত চোখের ধার 
যশোর রোড, বিষণœ সব বাঁশের ঘর 
ধুঁকছে শুধু - কঠিন মাটি নিরুত্তর।

সীমান্তে আজ বানের পানি তা- থৈ -থৈ
সব ডুবেছে, খাদ্য দেবে পথটা কৈ?

মার্কিনী সব দেবতারা কোথায় আজ?
বিমান থেকে শিশুর গায়ে ছুঁড়ছে বাজ!
রাষ্ট্রপতি, কোথায় তোমার সৈন্য দল?
বিমানবহর, নৌবাহিনী অর্থবল?
তারা কি আজ খাদ্য ওষুধ আনতে চায়?
ফেলছে বোমা ভিয়েতনামে নিঃসহায়।....
 
আগস্ট মাসের শেষ তখন। রায়হান জানতে পারলো সেপ্টেম্বর মাস থেকে সারা দেশব্যাপী প্রতিমাসে ২০ হাজার গেরিলাকে ট্রেনিং দিয়ে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। ব্যাপারটির তাৎপর্য রায়হানের উপলব্ধি করতে সময় লাগলো না। এভাবে এগুলে সেপ্টেম্বরের আগে পাঠানো মুক্তিযোদ্ধাসহ ডিসেম্বর ’৭১ পর্যন্ত সারা বাংলাদেশে য্্ুদ্ধরত গেরিলার সংখ্যা হবে এক লক্ষাধিক। রায়হান বুঝতে পারে এদের মধ্যে যদি ৩০ শতাংশ গেরিলাও‘ রেইড’ ও ‘অ্যামবুশ’ চালাতে থাকে তাহলে সামরিক ভারসাম্য সম্পূর্ণ পাল্টে চলে আসবে মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে। আশার আলো দেখতে পায় কোথায় যেন সে। 

কূটনৈতিক দিক থেকেও স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার এগিয়ে গেল। ২৭ আগস্ট লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশন নাম দিয়ে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে এর হাইকমিশনার নিয়োগ করা হয়। এ বিষয়ক ‘লেটার অব ক্রেডেন্সিয়াল ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও পাঠানো হয়। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরু হয়। বিচারপতি সাঈদ সেখানে ১৬ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন। এ প্রতিনিধিদল নিউইয়র্কে গিয়ে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের কাছে বাংলাদেশের নিপীড়িত মানুষের কথা জানানোর একটি সুযোগ পায়।

কিন্তু অন্য সমস্যা আরও প্রকট হল। পাকিস্তানীরা যখন দেখলো গেরিলাযুদ্ধের গতি ও মাত্রা তীব্রতর হচ্ছে  এবং গেরিলাবাহিনীর সিংহভাগই হচ্ছে তরুণ সমাজ তখন তারা তরুণ সমাজের উপর ঝাপিয়ে পড়লো। তাদের হত্যাকান্ডে মানুষ এতই ভয় পেল যে সেপ্টেম্বর মাস নাগাদ ১৫-২৫ বছরের সব তরুণ পালাতে শুরু করলো। এদের একটি বিরাট অংশ চলে আসলো ভারতে। এদের মধ্যে যারা সরাসরি ট্রেনিং ক্যাম্পে যোগ দিল তাদের নিয়েও রায়হানদের নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হল। অতিরিক্ত লোকের খাবার বন্দোবস্ত করতে হলো। অবশ্য ক্যাম্প থেকে দূরের যুব শিবিরের ক্ষেত্রে তাও করা সম্ভবপর হল না। খাবার,পানি, পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থা এবং ওষুধপত্রের অভাবে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়তে থাকে রক্ত আমাশা, ম্যালেরিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা ও পেটের পীড়া। সমস্যা এখানেই থেমে থাকেলো না । রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, হিংসা ও সহানুভূতির অভাবে ক্যাম্পগুলোর জীবনযাত্রা ক্রমশই দূর্বিসহ হয়ে উঠে। শহুরে জীবনযাত্রা থেকে আসা কিছু সংখ্যক ছাত্র সপ্তাহ  দু’য়েকের ট্রেনিং এর পরেই নিজেদের অস্ত্র হাতে চেগুয়েভারা, মাও সে তুং ভাবতে শুরু করলো। ফলে গেরিলা গ্রুপগুলোর নেতৃত্ব নিয়ে সমস্যার সৃষ্টি হতে থাকলো। অবশ্য কৃষক যুবাদের নিয়ে তেমন অসুবিধা হচ্ছিল না। একজোড়া জাংগল বুট, লুঙ্গি, কম্বল বা খাবার, এসব কোনটার প্রতিই তাদের লোভ ছিল না। বরং স্বাধীনতার জন্যই এরা ছিল বেশি নিবেদিত প্রাণ মুক্তিসেনা। 

’৬৯ এর গণ অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক সংগ্রামে সরাসরি জড়িত হয়ে পড়ে পূর্ববাংলার শ্রমজীবী মানুষ, নি¤œমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত। কোন কোন এলাকায় কৃষকরাও বেশ বড় ভূমিকা নেয় এ আন্দোলনে। পরবর্তী সময়ে কৃষকদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ ছিল অনেক বেশি আন্তরিক। গ্রাম-বাংলায় মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি স্তরে কৃষক ও কৃষক পরিবার প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অভূপূর্ব সহায়তা করতে থাকে। অথচ দেশ স্বাধীন হবার পরে কৃষকদের সে অবদান সবাই ভুলে গেল। সিরাজ সিকদারসহ স্বঘোষিত কমিউনিষ্ট বিপ্লবীরা মুক্তিযুদ্ধ শেষ হবার পরপরই যখন অস্ত্র হাতে গ্রামে গ্রামে শ্রেণী শক্র বিনাশ করে চলেছিলেন তখন তারা একটিবারও কৃষকের কথা ভাবতে পারেন নি। কৃষককে সংগঠিত না করে জোতদারদের বংশ ধ্বংস করলেই কৃষক বিপ্লব হয় না এটি তারা সেদিন বুঝতে চাননি।

রামগড় থেকে কিছুদিন হল রায়হান গিয়েছে অপর পারে ভারতের সাবরুমে। কিছু দরকারী কাজ সেরে একটি চা’র দোকানে গিয়ে বসে সে। দোকানদার বলে দাদা চা দেবো? ভালো বিস্কুটও আছে। চা- বিস্কুট খেতে থাকে রায়হান। চেহারা আর পোষাক-আসাক দেখেই দোকানদার পরমেশ সমাদ্দার বুঝে যায় রায়হান একজন মুক্তি। জিজ্ঞাসা করে, ‘দাদা, পূর্ব বাংলায় ঘি- মাংসের দাম কেমন?’ রায়হান উত্তর দেয়, ‘ খাঁটি গাওয়া ঘি আমাদের এখানে ছ’টাকা আর খাসির দাম আট টাকা। দোকানদার গালে হাত রেখে বললো, মশায়, আপনারা তো স্বর্গে আছেন। আমাদের এখানে ঘি বিশ টাকা আর মাটন হচ্ছে বার টাকা। তা’হলে আপনারা যুদ্ধ করছেন কেন’? চা- দোকানদার পরমেশ সমাদ্দারের কথায় রায়হান খানিকটা স্মম্ভিত হয়। বলে কি লোকটা! সোজা-সাপ্টা বিচারে কথাটি অবশ্য সঠিক। ভালো খেতে পড়তে পারলে মানুষ সংগ্রাম করবে কোন দুঃখে। কিন্তু পূর্ববাংলার কাঁচা মাল নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তান যে অর্থনীতি গড়ে ছিল তাতে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষের দাম কম থাকলেও মোটাদাগে শোষিত হচ্ছিল পূর্ববাংলার কৃষক এবং শ্রমজীবী মানুষ। একদিন পাকিস্তান সৃষ্টিতে এরাই বিপুল সংখ্যায় ভোট দিয়েছিল। কিন্তু উর্দূভাষী শাসকরা তাদের জন্য কিছুই করেনি। অন্যদিকে পূর্ববাংলায় ৬০’র দশকে কোন শিল্পপতি ছিল না। বাঙালিরা মূলত ছিল ঠিকাদার। জহুরুল ইসলামের মত কিছু সংখ্যক বাঙালি বেসামরিক বির্নিমাণের বড় বড় ঠিকাদারী কাজ পেতে শুরু করে। ব্যাংকিং খাতে বাঙালিরা ইস্টার্ণ মার্কেন্টাইল ব্যাংক ও দ্য ইস্টার্ণ ব্যাংকিং কর্পোরেশন নামে দুটি ব্যাংক স্থাপন করেছিল। অর্থনৈতিক শোষণ ছাড়াও যে ব্যাপারটি মূখ্য ছিল তা হল, পাকিস্তানীরা এক জাতি ছিল না।  সেখানে ছিল বাঙালি, পাঞ্জাবি, সিন্ধি, পাঠান, বেলুচ প্রভৃতি এক একটি জাতির বাস। এরা প্রত্যেকেই ছিল আলাদা জাতি। তাছাড়া পাকিস্তানের উভয় অংশেই রয়েছে পার্বত্য ও সমতলভূমির নানা আদিবাসি, যাদের রয়েছে সাংস্কৃতিক- সামাজিক-নৃতাত্বিক ও ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য। ফলে বাঙালির উপর শোষণ ও নির্যাতন নেমে এসেছে অন্য ধারায়।

রায়হান তখন অর্নাস ফাইলার ইয়ারের ছাত্র। ‘৬৯ এর গণ অভ্যুৎত্থান তখন তুঙ্গে উঠতে শুরু করেছে। অতীতে পূর্ববাংলার রাজনৈতিক আন্দোলনে প্রধান অংশগ্রহণকারী ছিল শহুরে মধ্যবিত্ত। যাদের ছিল প্রগতিশীল চিন্তাধারা। যারা মাক্স- লেনিন পড়ে প্রলেতারিয়েত বিপ্লবের স্বপ্ন দেখতো- এসব মধ্যবিত্ত ছিল আন্দোলনের কেন্দ্র ভূমিকায়। কিন্তু ‘৬৯ এ মওলানা ভাসানী আশ্চর্য দক্ষতায় শহুরে আন্দোলনকে গ্রামের নিম্ন ও মধ্যশ্রেণির সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক সংগ্রামে পরিণত করেন। আসলে আয়ুম আমল থেকেই গ্রামের টাউট-বাটপার, মহাজন ও জোতদারদের অত্যাচার ও শোষণ সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়। এ পর্যায়ে সারা পূর্ববাংলায় জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব ছড়িয়ে পড়ে।  ভারতের পরমেশ সমাদ্দাররা তো এসব খবর জানে না। তাদের জানবার প্রয়োজনও নেই। সহজ-সরল হিসেবে তারা বোঝে নিত্য- প্রয়োজনীয় জিনিষের দাম কম থাকলেই সব কিছু ঠিকঠাক থাকে। রায়হান মনে মনে হাসে। তারপর বলে, ‘দাদা, ঘি- মাখনের দাম হয়তো কম,’ কিন্তু মানুষকে যারা মানুষ ভাবতে পারে না। তাদের সঙ্গে কি বসবাস করা যায়’?

-	আপনার কথা দাদা একেবারে ঠিক। তবে কি জানেন, পাকিস্তানীরা চলে গেলেও নিজ দেশের দাদারা কিন্তু আরও ভয়ংকর হবে। আমাদের দেখুন না, ব্রিটিশ তো গেল এখন ভারতবাসী একে অন্যকে কেমন চাপ মেড়ে ধরছে। আসলে দাদা, আমরা হলেম গিয়ে হরিণ, একবার ডাঙার বাঘে খায় তো অন্যবার জলের কুমিড় খায়। ব্যাপার সে-ই একই। 

রায়হান আবার চলেছে কলকাতার পথে। মন জুড়ে তার অনেক চিন্তা। সামনে অনেক কাজ। জীবনে ধার করা কোন ইজমে বিশ্বাস করেনি রায়হান। ভার্সিটি লাইফেও মার্কসবাদ-লেনিনবাদ বা মাওয়ের লাল বই রায়হানকে আকর্ষণ করেনি। বলা যায় করতে পারেনি। সবসময় সে বিশ্বাস করতো নতুন কিছুতে, কিন্তু তা দেশের মাটি, মানুষ ও সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। রায়হান ভাবে দেশ যদি কোন দিন স্বাধীন হয় তা’হলে দেশের মুক্তিযোদ্ধা তরুণদের নিয়ে সে গ্রামে গ্রামে সমবায় আন্দোলন গড়ে তুলবে। রায়হানের মাথায় অনেক দিন থেকেই ঘুরপাক খাচ্ছে Compulsory Co-operative Economy & Workers Participation Management  এর ধারণা। সে জানে এসব কার্যকর করতে যে ধরণের প্রশাসনিক কাঠামো ও ক্যাডার প্রয়োজন তা ব্রিটিশ ভাব ধারায় করলে কোন লাভ হবে না। কারণ তা‘হলে সমাজের উচ্চাভিলাষী, ভূমিমালিক, জোতদার আর বাম রাজনীতির শ্রেণিশক্র বিনাশকারী উগ্রধারা উল্টো রায়হানদের উৎখাতে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। কেননা রায়হানের পরিকল্পিত সমবায় কার্যকক্রম একবার চালু হলে জমির মালিকের জমি চলে যাবে সমবায়ের কাছে, ভূমি যাবে ভূমিহীনদের হাতে। অতত্রব জোতদাররা স্বেচ্ছায় তা কোন ভাবেই মেনে নেবে না। (চলবে)

[ধারাবাহিক উপন্যাস ‘দুই নগরের উপাখ্যান ’ রচিত হয়েছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে। উপন্যাসের চরিত্রসমূহ কাল্পনিক।  কোন জীবিত বা মৃত মানুষের জীবনের সাথে এর কোন সাদৃস্য পাওয়া যাবে না। পটভূমি ঐতিহাসিক হওয়াতে ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনা এখানে স্থান পেয়েছে। এক্ষেত্রেও ক্ষেত্র বিশেষে ইতিহাসের সঙ্গে হুবহু মিল নাও পাওয়া যেতে পারে।]

পাঠকের মন্তব্য


একই ধরনের লেখা, আপনার পছন্দ হতে পারে

bdjogajog