ক্লাসিক সাহিত্যিক কথাশিল্পী কাজি আফসার উদ্দিন আহমদ

আলতামাস পাশা লেখাটি পড়েছেন 231 জন পাঠক।
 কাজি আফসার উদ্দিন আহমদ: সাহিত্যিক-সাংবাদিক 

- গ্রন্থনা করেছেন বিশিষ্ট প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও সাংবাদিক প্রয়াত সাযযাদ কাদির
 
[কাজি আফসার উদ্দিন আহমদ: ২৪.০৯.১৯২১ - ২৬.০৩.১৯৭৫]

শিশুতোষ বইপত্র পড়ে-পড়েই আমরা অনেকে ‘বইয়ের পোকা’ হয়েছি সেই ছোটবেলায়। আর আমাদের এই পোকা বানিয়ে দেয়ার জন্য যে সব বই দায়ী সেগুলোকে ভুলি নি কখনও। সেই সঙ্গে ভুলি নি ওই সব বইয়ের লেখকদেরও। তাঁরা জীবনভর প্রিয় হয়ে রয়েছেন আমাদের। এজন্যই এখনও  খুঁজে বেড়াই হারানো দিনের বইপত্র। কখনও হঠাৎ খুঁজে পেয়ে গেলে পড়তে-পড়তে পাতা ওলটাতে-ওলটাতে ফিরে যাই সেই হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোতে। সে সব দিনের এমন অনেক প্রিয় লেখকের একজন কাজি আফসার উদ্দিন আহমদ। শিশুতোষ মাসিক ‘খেলাঘর’ (১৯৫৪-?)-এর মাধ্যমে তাঁর লেখার সঙ্গে পরিচয় আমার। তাঁকে মনে রাখার আরও বিশেষ কারণ - নানা বিচিত্র বিষয়ে লিখতেন তিনি। এছাড়া বিদেশী সাহিত্যের প্রতি আমার মতে অনেকের কৌতূহল ও আকর্ষণ যাঁরা উসকে দিয়েছেন তিনি তাঁদেরই একজন। এদেশের কথাসাহিত্যে বিশেষ অবদান ছাড়াও সাংবাদিকতা ও প্রকাশনার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে কাজি আফসার উদ্দিন আহমদের - কিন্তু সে সবের যথাযথ মূল্যায়ন এখনও বাকি। অনেক বই লিখেছেন তিনি, কিন্তু সেগুলোর মুদ্রণ নেই দীর্ঘ দিন ধরে। তাঁর রচনাবলি প্রকাশের কোনও উদ্যোগ আছে বলেও জানা যায় না।

কাজি আফসার উদ্দিন আহমদের জন্ম পাবনা’র চাটমোহর-এ, ১৯২১ সালের ২৫শে সেপটেম্বর। পৈতৃক নিবাস মানিকগঞ্জের কলতা গ্রামে। পিতা কাজী আফাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন কৃতী পুলিশ কর্মকর্তা (দারোগা)। বৃটিশ সরকার ‘খানসাহেব’ উপাধি দিয়ে সম্মানিত করেছিল তাঁকে। দর্শন, সাহিত্য, বিজ্ঞান প্রভৃতি নানা বিষয়ে গভীর অনুরাগ ছিল তাঁর। অবসর-জীবনে লিখেছিলেন ‘বৈদ্যুতিক দর্শনে কোর-আন শরীফ’ (১৯৪৯) গ্রন্থটি। 

কাজি আফসার উদ্দিন আহমদের শিক্ষাজীবনের শুরু মানিকগঞ্জের ভিকটোরিয়া হাই স্কুলে। এরপর পড়েছেন রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে (১৯৩৪)। মাঝে আরও কয়েকটি স্কুলে পড়ার পর ১৯৩৭ সালে ভর্তি হন চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে। সেখানে অষ্টম থেকে নবম শ্রেণীতে ওঠার পর-পরই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় ইতি ঘটে তাঁর। এরপর কলকাতায় গিয়ে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন তিনি। পাশাপাশি আত্মনিয়োগ করেন গল্প-উপন্যাস রচনায়। পরে সাংবাদিকতাকে ছাড়িয়ে কথাসাহিত্যিক পরিচয়টিই প্রধান হয়ে ওঠে তাঁর।

কলকাতায় ১৯৪১-৪৬ সালে কাজি আফসার উদ্দিন আহমদ সম্পাদক-প্রকাশক ছিলেন দ্বিমাসিক সাহিত্যপত্রিকা ‘মৃত্তিকা’র। মাঝখানে কয়েক বছর সম্পাদনার সূত্রে জড়িত ছিলেন মাসিক ‘সওগাত’, ‘শিশু সওগাত’, সাপ্তাহিক ও দৈনিক ‘কৃষক’ ও সাপ্তাহিক ‘দেশের কথা’-র সঙ্গে (১৯৪৩-১৯৪৪)। ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন মাসিক ও সাপ্তাহিক মোহাম্মদী’র (১৯৪৫-১৯৪৭)। ভারত-বিভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানের সর্বপ্রথম দৈনিক সংবাদপত্র “জিন্দেগী”র প্রকাশক ও সম্পাদক ছিলেন তিনি। পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৪৭ সালের ৪ঠা সেপটেম্বর। দৈনিক ‘ইনসাফ’-এরও ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন তিনি। কাজি আফসার উদ্দিন আহমদ পরে যোগ দেন সরকারের তথ্য বিভাগে সিনিয়র সাব-এডিটর পদে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর সম্পাদনা করেন শিশু-কিশোর সাময়িকী “নবারুণ”। এ ছাড়া স্ত্রী জেবু আহমদের সম্পাদনায় প্রকাশিত দেশের বিখ্যাত ও প্রাচীন শিশু-কিশোর মাসিক “খেলাঘর”-এর নেপথ্যে সক্রিয় ভূমিকা ছিল তাঁর। 

১৯৩৭-৪৭ সালে পিতার কর্মস্থল কলকাতায় অবস্থানকালে কাজি আফসার উদ্দিন আহমদ লেখালেখি করতেন ‘আলোক দূত’, ‘কুমার নিখিলেশ রুদ্রনারায়ণ সিং’, ‘কুমারী প্রীতিসুধা সিং’, ‘অরূপ আহমদ’ প্রভৃতি ছদ্মনামে। ‘আলোক দূত’ নামে প্রকাশিত হয় তাঁর কিশোর উপন্যাস “মুক্তোর সন্ধানে আফ্রিকায়”। প্রকাশ করে কলকাতার বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা দেব সাহিত্য কুটীর। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৫-১৬ বছর, তিনি চট্টগ্রাম সরকারি কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র। কলকাতা-জীবনে কাজি আফসার উদ্দিন আহমদ বেশি পরিচিতি পেয়েছিলেন কুমার নিখিলেশ রুদ্রনারায়ণ সিং নামে। পরে সাংবাদিক-সাহিত্যিক আবুল কালাম শামসুদ্দীন (১৮৯৭-১৯৭৮)-এর পরামর্শে তিনি লিখতে শুরু করেন স্বনামে। 
“মুক্তোর সন্ধানে আফ্রিকা” ছাড়া গ্রন্থাকারে প্রকাশিত কাজি আফসার উদ্দিন আহমদের উপন্যাসের সংখ্যা ৮ - ‘চর ভাঙা চর’ (১৯৫১), ‘কলাবতী কন্যা’ (১৯৫২), ‘কবীর লস্কর’ (১৯৫৪), ‘বাতাসী’ (১৯৫৬), ‘নোনা পানির ঢেউ’ (১৯৫৮), ‘অমর যৌবনা’ (দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৯৫৮), ‘সুরের আগুন’ (১৯৬০), ‘নীড় ভাঙা ঝড়’ (১৯৬১)। পত্রিকায় প্রকাশিত কিন্তু গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত উপন্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে - ‘হাসিনার প্রার্থনা’, ‘গদ্য কবিতা’ ও  ‘মরণ ছবির বিভীষিকা’। তাঁর গল্পগ্রন্থ - ‘কোলাহল’ (১৯৪৭), ‘কালনাগিনী’ (১৯৫২), ‘জ্বালাও আলো’ (১৯৫৪), ‘নূতন প্রেম’ (১৯৫৫), ‘নদী ধলেশ্বরী’ (১৯৭০); প্রবন্ধ-গবেষণা - ‘সাহিত্যের পরিধি’ (১৯৬০), ‘সাহিত্য ও জীবন’ (১৯৭০), ‘আঙুর’ (১৯৭০), নাটক - ‘মোগল কুমারী’ (১৯৪৭)। 

কাজি আফসার উদ্দিন আহমদের বেশির ভাগ উপন্যাসেরই একাধিক সংস্করণ হয়েছে সেকালে। ষাটের দশকে পাঠকপ্রিয়তার তালিকায় ছিল ‘চর ভাঙা চর’, ‘বাতাসী’, ‘নোনা পানির ঢেউ’, ‘অমর যৌবনা’, ‘নীড় ভাঙা ঝড়’। তবে তাঁর প্রথম উপন্যাস “চর ভাঙা চর”ই (১৯৫১) সর্বাধিক আলোচিত উপন্যাস । মাহবুব-উল-আলম লিখেছেন, “... লেখার সুরে কাজি আফসার উদ্দিন আহমদ বহুকাল হইতে আমার আত্মীয়। তাঁহার ‘চর ভাঙা চর’-এও রহিয়াছে শক্তির প্রকাশ।... ‘চর ভাঙা চর’ পড়িতে পড়িতে আমার বহুবার মনে হইয়াছে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কালিন্দী’ ও ‘পঞ্চগ্রাম’কে। ধলেশ্বরী ও সপ্তগ্রামের অপরূপ রূপ কাজি সাহেব দেখিতে পাইয়াছেন।...” অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত (১৯০৩-১৯৭৬) লিখেছেন, “... ‘চর ভাঙা চর’ পড়ে খুব তৃপ্তি পেলাম। পূর্ববঙ্গের প্রাণবতী নদী আর উদার উদ্ধত মানুষ চিরকাল আমার মন ভুলিয়েছে। - তারই সৌন্দর্য আর সৌরভ পেলাম আপনার বইয়ে। পূর্ববঙ্গে নিয়ে লেখা বই পূর্ববঙ্গের মতোই মধুর।...” সাপ্তাহিক দেশ লিখেছে, “... ‘চর ভাঙা চর’ এক বলিষ্ঠ নতুনতম পদক্ষেপ। আমাদের জীবনে কাহিনী নেই, অথবা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের বাইরে গল্পের উপকরণ নেই বলে অক্ষম লেখকেরা পালিয়ে থাকতে চান, তাঁদের সামনে এক নতুন দিগন্তের ইশারা এই ‘চর ভাঙা চর’...।” মোহাম্মদ মাহ্ফুজউল্লাহ্ লিখেছেন, “কাজি আফসার উদ্দিন আহমদের রচনায়ও ভিন্নতর পটভূমিতে নদী-নালা পরিবেষ্টিত গ্রাম-বাংলার জীবনের রূপায়ণ লক্ষ্য করা গেছে। শামসুদ্দীন আবুল কালাম যেখানে নদী-কেন্দ্রিক গণজীবনের গতিময় রোমান্স-রূপ অঙ্কন করেছেন, সেখানে কাজি আফসার উদ্দিন অঙ্কন করেছেন নদীর ভাঙনধারার পটভূমিতে জীবন-সমস্যার বাস্তবচিত্র। অবশ্য তাঁর ‘চর ভাঙা চর’ উপন্যাসে ভাবাবেগ অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবতাবোধকে বিনষ্ট করে দিয়েছে, ফলে সেখানে নদীর ধ্বংসলীলা এবং গতিময় বন্যাবেগই কবিত্বময়তার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে, নদী কেন্দ্রিক জনজীবন অনেকখানি চাপা পড়ে গিয়েছে। এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তাঁর ‘চর ভাঙা চর’ একটি স্বাতন্ত্র্যধর্মী রচনা।...”

ষাটের দশকে বহুল পঠিত লেখক ছিলেন কাজি আফসার উদ্দিন আহমদ। উপন্যাসের মতো তাঁর ছোটগল্প ও শিশুতোষ রচনাও ছিল যথেষ্ট পাঠকপ্রিয়। অনেক বিখ্যাত বিদেশী গ্রন্থের অনুবাদ / ভাবানুবাদ করেছিলেন তিনি কিশোরদের উপযোগী করে। সেগুলো পড়েই দেশের বহু শিশু-কিশোর পরিচয় ও স্বাদ-গন্ধ পেয়েছে বিশ্বসাহিত্যের। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে - ‘খাইবারের ভয়ঙ্কর’ (১৯৫৪), ‘গ্রেট এঙপেকটেশন’, ‘কিডন্যাপড্’, ‘সাইলাস মারনার’, ‘জীবনশিল্পী শেখভ’ (১৯৫৫), ‘রহস্যময় বন্দী’, ‘মৃত্যুর অভিশাপ’, ‘টম ব্রাউনের ছেলেবেলা’ (১৯৫৬), ‘টেলিফোন’ (১৯৫৭), ‘গ্রীন ম্যান্সন্স’, ‘বিশ্বত্রাস চেঙ্গীস খান’ (১৯৫৯), ‘শাশ্বত মনীষা’, ‘মিডশিপম্যান ইজি’ (১৯৬০), ‘দ্য হারিকেন’, ‘মবি ডিক’, ‘মিউটিনি অভ দ্য বাউন্টি’, ‘দুই নগরীর উপাখ্যান’, ‘ম্যাকবেথ’, ‘ব্ল্ল্যাক বিউটি’, ‘দ্য প্রিন্স অ্যান্ড দ্য পপার’, ‘জীবন যেখানে জাগলো’ (১৯৭০) প্রভৃতি। তাঁর অপ্রকাশিত রচনার সংখ্যাও বিপুল বলে জানা যায়। 
বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক হিসেবে কাজি আফসার উদ্দিন আহমদ সেকালে যথেষ্ট সমাদৃত ছিলেন, কিন্তু একালে তিনি অবহেলিত, অনালোচিত, উপেক্ষিত। তাঁর সাহিত্যকৃতির সেভাবে কোনও মূল্যায়ন হয় নি এখনও। তাই বলে তাঁর সাধনা একেবারে বৃথা গেছে বলে আমি মনে করি না। আমাদের কথাসাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর যথাযোগ্য স্থান নির্ধারিত আছে অবশ্যই। সেই স্থানের সীমাচিহ্ন ছাড়া যে আমাদের সাহিত্যের কথকতা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে তা অস্বীকার করতে পারেন না কেউ।

কাজি আফসার উদ্দিন আহমদ লিখেছেন অন্তরঙ্গ ভঙ্গিতে। ছোট-ছোট বাক্যে তরতরিয়ে এগিয়ে নিয়ে গেছেন কাহিনী, সংলাপ, বিবরণ। পাঠকও তাই তাঁর সঙ্গে এগিয়ে যায় সমান গতিতে। তাঁর এই রচনারীতিতে প্রভাব লক্ষ্য করা যায় সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায় (১৮৮৪-১৯৬৬) ও নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় (১৯০৫-১৯৬৪)-এর। জহির রায়হান (১৯৩৫-১৯৭২)-ও অনুপ্রাণিত ছিলেন এ রীতিতে। একালের ‘নন্দিত’ লেখকদের অনেকেই লিখতে চেষ্টা করেন এরকমই।
১৯৬৬ সালে উপন্যাসে বাংলা একাডেমী পুরস্কার পান কাজি আফসার উদ্দিন আহমদ। ১৯৭৫ সালের ২৬শে মার্চ ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। (সংকলিত)

কথাশিল্পী কাজি আফসার উদ্দিন আহমদ এর ক্লাসিক সাহিত্য কর্মের বিভিন্ন লেখা এখন থেকে নিয়মিত প্রকাশিত হবে সাহিত্য আসর ডটকমে। লেখকের রচিত গল্প সমগ্র “নদী ধলেশ্বরী” থেকে গল্প ‘রাঙা আপা’ শীঘ্রই প্রকাশিত হবে সাহিত্য আসর ডটকমে। পাঠক অপেক্ষায় থাকুন।

পাঠকের মন্তব্য


একই ধরনের লেখা, আপনার পছন্দ হতে পারে

bdjogajog