ভালকানের স্বপ্ন

আলতামাস পাশা লেখাটি পড়েছেন 134 জন পাঠক।
 প্রথম পরিচ্ছেদ

এক সপ্তাহের জন্য জার্মানির হ্যাননোভ্যাওে এসেছি সিভিট প্রযুক্তি মেলায় যোগ দিতে। হাতে সময় থাকলে হামবুর্গ ঘুরে যাবার ইচ্ছে রয়েছে। সিবিট মেলায় আলাপ হলো জনাথন নাসে এক কম্পিউটার বিজ্ঞানীর সঙ্গে। আলাপের শুরু থেকেই সে কোন দেশের নাগরিক তা নিয়ে মনে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হল। নিজেকে জনাথন লুথিনিয়ার নাগরিক বলে পরিচয় দিলেও কোথায় যেন একটি অমিল খুঁজে পাচ্ছিলাম। ইউরোপের কোন অংশের মানুষের চোখই এতো গভীর কালো হয় না। অথচ জনাথনের চোখদুটি অদ্ভুত গভীরতায় ভরা আর চোখের মনি কালো রঙে।

এখানে বলে রাখি যে, সিবিট মেলা সেই ১৯৮৬ সাল থেকে আইটি পণ্য ও সার্ভিসের এক অনবদ্য উপস্থাপনার মিলনমেলা হিসেবে সারা পৃথিবীব্যাপী অভিজ্ঞতা, নতুন চিন্তা ও ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে আসছে। আর এই হ্যাননোভার মেলাটি কম্পিউটার শিল্পের প্রাণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে বিশ্বেও বৃহতম বাণিজ্যিক মেলা বা ট্রেডশো হিসেবে এটি অর্জন করেছে এক অনন্য সাধারণ বৈশিষ্ট্য। মেলার তৃতীয় দিনে একটি সেমিনার শেষে কফি খেতে খেতে জনাথন আমার সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ করছিল। জনাথন বলছিল প্রাকৃতিক সম্পদ বল, প্রকৃতি বল, আবহাওয়া বল কোনো দিক থেকেই  তোমাদের দেশটির কোন অভাব নেই। যেটুকু অভাব তা’হচ্ছে তোমাদের মন-মানসিকতার আর নের্তৃত্বের অভাব। আমি তোমাদের পৃথিবীর বহু দেশ দেখেছি, কিন্তু বাংলাদেশের মতো এতো  অফুরন্ত, অবারিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যওে দেশ আর একটিও দেখিনি। কী নেই তোমাদের দেশে! পাহাড় আছে, নদী আছে, হাওর-বাওর আছে, সুন্দরবনের মতো অরণ্য সম্পদ আছে। শুধু কি তাই, সুন্দনবন ছাড়াও তোমাদের বনজ সম্পদ আছে বেশ কয়েকটি, কিন্তু তোমরা সেই বিপুল জীববৈচিত্র্য নিজেরাই ধ্বংস করে ফেলছো।

আমার কাছে জনাথনের একটি কথায় কেন  জানি খটকা লাগে ‘তোমাদের পৃথিবী এই শব্দ দুটি কেন সে ব্যবহার করলো? শুধু ‘পৃথিবী’ বললেও আমি অবাক হতাম না। কিন্তু ‘তোমাদের পৃথিবী’ বলার অর্থ কী? এই পৃথিবী কি জনাথনের নয়? না‘কি সে কোন রূপক অর্থে শব্দটি ব্যবহার করেছে। আমার মনটা চিরকালই একটু খুঁতখুতে স্বভাবের। হঠাৎ মনে হল এটা হয়তোবা বাঙালির মজ্জাগত একটি স্বভাব। অকারণে সবকিছুকেই বাড়িয়ে দেখার ভাব বিলাস। তবু মনে খটকা রয়েই গেল।

জনাথনের কথায় আমার চিন্তায় ছেদ পড়ে। জনাথন বলে চলে তোমর দেশে নেতৃত্বের পরিবর্তনে তৃতীয় কাউকে এগিয়ে আসতে হবে।
-আপনি কি তৃতীয় কোন শক্তির কথা বলছেন?
- রাইট ইউ আর। তবে তোমরা যে তৃতীয় শক্তির কথা ভাবছো, সেরকম কোন শক্তির কথা আমি ভাবছি না। তবে এই শক্তি হতে পারে.... বলতে বলতে জনাথন চুপ করে গেল। আমার কাহিনী এখানেই শেষ হলে হয়তো ভালোই হতো। কিন্তু তা আর হলো না।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

আজ হামবুর্গ চলেছি বন্ধু রাইনারের সঙ্গে দেখা করতে। রাইনার বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাস্ট্রোফিক্সিসের সহকারী অধ্যাপক। এ পর্যায়ে আমার নিজের সম্পর্কে কিছু বলে নেওয়া  যেতে পারে। আমি সোহেল আদনান। পেশায় বিজ্ঞান সাংবাদিক। সাংবাদিকতার বিষয় হিসেবে বৈচিত্র্যপূর্ণ জগতে আমার বিচরণ। এছাড়া ভিনগ্রহের সভ্যতা নিয়ে আমার অনেকে লেখালেখি রয়েছে। অধ্যাপক রাইনারের এসব বিষয়ে বিস্তর লেখালেখি থাকায় তার সঙ্গে আমার বন্ধুত্বও গভীর হয়েছে। রাইরারের পাঠানো গাড়িতেই হামবুর্গ যাচ্ছি। হাইওয়ে দিয়ে মাঝারি গতিতে গাড়ি ছুটে চলেছে। রাস্তার দু’পাশের প্রকৃতি খুব সুন্দর। এখানে প্রকৃতিকেও মনে হয় জার্মানরা নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। গাছপালাগুলোকে ছেঁটে ছুটে একটা নির্দিষ্ট সাইজের মধ্যে রাখা হয়। গাড়ির চালক রক মিউজিকের সিডি চালু করেছে। প্রাকৃতিক দৃশ্য আমাকে আনমনা করে ফেলেছিল। হঠাৎ সিডির মিউজিক থেমে গেল। আমি অপেক্ষা করছিলাম অন্য কোন জার্মান গানের জন্য। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে সিডিতে বাংলা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।

 কেমন আছো সোহেল? জার্মানীতে নিশ্চয় ভালো কাটছে। গলার স্বরে চিনতে অসুবিধা হচ্ছে না’তো? আমি মার্সিয়াস বলছি। আমি রয়েছি কলোনের পাশে একটি ছোট গ্রামে। হামবুর্গের কাজ শেষ করে আমার এখানে চলে আসবে। একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে। তোমাদের দেশের জন্য ভয়ংকর বিপদ ঘনিয়ে আসছে। তোমর গাড়ির চালক আমার লোক। অধ্যাপক রাইনারের চালকের পরিবর্তে আমাদের লোক গাড়ি চালাচ্ছে। ওই তোমাকে নিয়ে আসবে। রাইনারের ড্রাইভার বর্তমানে ছুটিতে আছে। 

আমার গাড়ির চালক কিন্তু নির্লিপ্তভাবেই গাড়ি চালিয়ে চলেছে। নির্দেশনা শেষ হতেই আবার গান বেজে উঠলো। বিখ্যাত জার্মান রক সংগীতের মূর্চ্ছণায় আমি হারিয়ে গেলাম অন্য এক জগতে।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ

কলোনের পাশে ছোট গ্রামে এসেছি আজ সকালে। ধূমায়িত কফির কাপ হাতে মার্সিয়াসের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম।
-মার্সিয়াস বললো, ধীরে বন্ধু ধীরে, অনেক কথা তোমাকে বলার আছে। তুমি তো জানো পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশ নিয়ে আমরা দীর্ঘদিন ধরে পর্যবেক্ষণ চালাচ্ছি। তোমার দেশটা অনেকদিন ধরেই আমাদের আগ্রহের কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হয়। অদ্ভূত একটা দেশ। বিপুল সম্ভাবনা, অনেক প্রাকৃতিক সম্পদ। বৈচিত্র্যের অপার সমাবেশ। যা নেই তা হলো সঠিক নেতৃত্ব। নেতৃত্বের অভাবে তোমাদের দেশে ভয়াবহ পরিস্থিতি এগিয়ে আসছে। তোমাদের দেশটাকে নিয়ে আমরা অনেকদিন থেকেই গবেষণা করে আসছি। সম্ভবত তোমরাই পৃথিবীর একমাত্র জাতি যারা  একে ওপরের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাও মূহুর্তেও মধ্যে। তোমরা নিজেরাই তোমাদের বড় শত্রুতে পরিণত হয়ে যাও। তোমাদের সম্পর্কে আগে থেকে কোন কিছু বলা আদৌ সম্ভবপর নয়। অন্যদিকে তোমাদের তরুণদের কাছে তোমাদের মুক্তিযুদ্ধ কেবল  একটি ইতিহাস নয়, বরং তা আত্নপরিচয়ের সূত্র, বিশ্বায়িত দুনিয়ায় বলার মতো গর্ব। তোমরা কি’তা বুঝতে পারো? উপলদ্ধি করতে পারো? আমাদের তা মনে হয় না। চমৎকার কিছু তোমরা দেশকে দিতে পারতে। কিন্তু তা পারছো কই আর? নিজেরাই এখন হাজারো সমস্যা তৈরি করছো। তোমরা কি এটা বুঝতে পারছো যে ক্রমেই তোমরা নেতৃত্বহীন হয়ে পড়ছো? তোমাদের বর্তমান প্রজন্ম থেকে নতুন নেতৃত্ব আসার সম্ভাবনা ক্রমেই ফিকে হয়ে আসছে। তাদের পরবর্তী প্রজন্মও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব গড়ে তুলতে পারেন নাই।

মার্সিয়াসের কথায় আমি অবাক না হয়ে পারলাম না। ভালকান গ্রহের মার্সিয়াস পৃথিবীতে তার গ্রহের অন্যান্য অনেকের সঙ্গে পৃথিবীর মানুষের অবয়বে বেশ চলে ফিরে বেড়ালেও বাংলাদেশ নিয়ে তারা এতো ভাবে, আামাদের কার্যকলাম গভীরভাবে পর্যেবক্ষণ করে তা আমার আসলেই জানা ছিল না। ওর সঙ্গে আমার পরিচয় কানাডার ভ্যানকুভারের এক বই মেলায়। সেখানে একটি ছোট ঘটনার মাধ্যমে মার্সিয়াসের আসল পরিচয় পাই আমি। বই মেলায় মার্সিয়াসের সঙ্গে মেলা শুরুর প্রথমদিন থেকেই আমি একসাথে ঘুরে বেড়িয়ে সময় কাটাই। কথা প্রসঙ্গে মার্সিয়াস জানায় যে সে কানাডার লোক। থাকে টরেন্টোতে। তারিখটা ছিল  ২৩ শে অক্টোবর, ২০০৭ সাল। আমি আর মার্সিয়াস সেদিন মেলার কফিশপে কফিপান শেষ করে ৩২ তলা থেকে নীচে নামছিলাম। ষোল তলায় এসে লিফট হঠাৎ থেমে গেল। অনেক চেষ্টা করেও আমরা লিফট কন্ট্রোলের সহায়তা পেতে ব্যর্থ হলাম। ক্রমে অকিজেন কমে আসতে থাকায় আমি সমস্যায় পড়লাম। আমার শ্বাস কষ্ট হতে লাগলো। কিন্তু সে অবস্থাতেও দেখলাম মার্সিয়াস দিব্বি রয়েছে। আমার অবস্থা খারাপ হতে থাকায় চোখে ঝাপসা দেখছিলাম। সে অবস্থাতেও অবাক হয়ে দেখলাম মার্সিয়াস তার কোর্টের পকেট থেকে লাইটারের আকৃতির কি যেন বের করে তার মাধ্যমে কথা বলছে। আমার শরীরে একটা শূন্যে ভেসে  চলার ভাব অনুভব করলাম। একসময় নিজেকে অনুভব করলাম ঐ ভবনের বারান্দায় শোয়া অবস্থায়। মার্সিয়াস আমার সার্টের কয়েকটি বোতাম খুলে আমাকে আরাম দিতে চেষ্টা করছিল। আমার মাথায় তখনও ঘুরছিল কিভাবে মার্সিয়াস আমাকে লিফট থেকে বের করে আনলো।

পরেরদিন আমার অনেক পিড়াপিড়িতে মার্সিয়াস জানায় যে সে মানুষ অবয়বে ভালকান গ্রহের বাসিন্দা। আমার শরীরকে সে ঐদিন লিফট থেকে বিশেষ ট্রান্সপোজার পদ্ধতির মাধ্যমে বাইরে বের করে আনে। এভাবেই তারা পৃথিবীর যেকোন প্রান্তে বিম আপ বা ডাউন করতে সক্ষম নিজেদেরকে। পৃথিবীর সভ্যতাকে অভ্যন্তরীণ এবং আন্তঃগ্যালেকসীয় বিপদ থেকে নানাভাবে রক্ষায় কাজ করছে ভানকানরা। পৃথিবীর সভ্যতা হুমকির সম্মুখীন হলে ভালকানদের জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্থ হবে। কারণ পৃথিবী থেকে কিছু বিশেষ প্রজাতির গাছপালা ভালকানে সবুজের স্বংস্থান করে থাকে। পৃথিবীর উদ্ভিদ আর মৎস্য সম্পদ ভালকানরা তাদের গ্রহে রি- জেনেরেট বা পুনঃউৎপাদন করেছে বিশেষ বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায়। আমাজনের গভীর জংগল যাতে ধ্বংস না হয়, হিমালয়ের হিমবাহগুলো যাতে তাড়াতাড়ি গলে না যায়, অ্যান্টার্কটিকার বরফ যাতে দ্রুত গলে না যায়, অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডে অবস্থিত গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ যাতে ধ্বংস না হয় তার জন্য ভালকানরা বহুদিন থেকে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
মার্সিয়াস কথা বলতে শুরু করায় আমি অতীত থেকে বর্তমানে ফিরে আসি। প্রশ্ন করি কি ধরনের বিপদের কথা বলছো তুমি? একটার পর একটা ভুল সিদ্ধান্তের কারণে তোমাদের দেশেই শুধু নয় গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় বিপদ ঘনিয়ে আসছে।
তাই আমরা ভালকানরা অনেকদিন থেকেই নতুন একটি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। আমরা তোমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার যুদ্ধশিশুদের ব্রেনের নিউরন স্ক্যান করেছি। আশ্চর্যজনক হলেও একথা সত্যি যে, তোমাদের নতুন প্রজন্মের চেয়ে এরা তোমাদের দেশকে বেশি ভালোবাসে। বিশেষত মেয়ে শিশুরা। বিচিত্র এসব মেয়েদের চিন্তাধারা, আবেগ ও অনুভূতির স্তর। এদের নীতিজ্ঞান বাস্তবাদিতা যেমন তীব্র, তেমনি রয়েছে সহজাত রুখে দাঁড়াবার প্রবণতাও। এমনি একজন যুদ্ধ শিশুর মেয়েকে আমরা তোমাদের দেশের নেতৃত্বে আনার জন্যে তৈরি করছিলাম। কিন্তু সমস্যা হয়েছে একটা। তাই তোমার সাহায্য দরকার ভীষণভাবে। 
আমি বললাম, ‘ আমাদের ইউনির্ভাসের বাইরে সবচেয়ে উন্নত সভ্যতার দাবিদার তোমরা ভালকানরা। তোমাদের কি এমন সমস্যা হয়েছে যা নিজেরা সমাধান করতে পারছো না? আবার আমার সাহায্যের দরকার হচ্ছে। 
মার্সিয়াস জবাব দেয় আসলে বিষয়টি তা নয়। আমরা ইচ্ছা করলেই তো পৃথিবীর যেকোন প্রান্ত থেকে মানুষকে নিয়ে এসে তাকে হিপনোটাইজ  করে তার ব্রেন থেকে প্রয়োজনীয় সংখ্যক নিউরণ সংগ্রহ করতেই পারি। এতে ঐ মানুষের কোন ক্ষতি হবে না। কয়েক ঘন্টার মধ্যেই সে নিউরনগুলো রি-জেনেরেট করবে। কিন্তু আমাদের প্রয়োজন নির্দিষ্ট চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মানুষের নিউরন। যা আমাদের  বর্তমান বিশ্লেষণ অনুসারে একমাত্র তোমারই রয়েছে।
‘আমার ব্রেন তোমরা কবে স্ক্যান করলে? আমি প্রশ্ন করি মার্সিয়াসকে।

‘কেন! আমাদের অ্যান্টাকটিকার বেসে যখন তুমি গিয়েছিলে তখনই তোমার সবরকমের মেনটাল ও ফিজিক্যাল আ্যনালিসিস করা হয়েছিল। আমি গম্ভীর গলায় বললাম, এ রকম কিছু করা হবে জানলে তোমার সাথে কোথাও যেতাম না। মার্র্সিয়াস একগাল হেসে বললো, তোমাকে সত্যিই ভাগ্যবান বলতে হবে। তুমি আবার আমাদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লে। আগের বার অ্যান্টার্কটিকার বেসে নিয়ে গিয়েছিলাম তোমাকে, এবার নিয়ে যাব জার্মানীর আলপাইন এলাকার পাহাড়ের গোপন এলাকায় আমাদের দ্বিতীয় বেসে। সেখান থেকে মাটির দুইশ মাইল গভীরে পৃথিবীতে আমাদের স্থায়ী বেসে।
-আমি অবাক হয়ে বললাম, মাটির দুশো মাইল নীচে? বল কী?
হ্যাঁ মাটির এত গভীরেই। আসলে অন্নপূর্ণা- মানে যে মেয়েটিকে আমরা তোমার দেশের নের্তৃত্বের জন্য পছন্দ করেছি, সে আলপাইন অঞ্চলে তুষারাবৃত পাহাড়ে অভিযানে গিয়ে প্রচন্ড তুষার ঝড়ে পড়েছিলো। আমরা সবই মনিটরিং করছিলাম। হঠাৎ দেখা গেল সে পা হড়কে পড়ে যাচ্ছে। অনেক চেষ্টা করেও ব্যালান্স রাখতে পারলো না। একটা খাদের মধ্যে পড়ে গেল। আমাদের বেস কমান্ডার তখন একটা উদ্ধারকারী দল পাঠিয়ে তাকে বেসে নিয়ে আসে। সে জ্ঞান হারিয়ে ছিল। পরীক্ষা করে দেখা গেল মাথায় আঘাত পেয়েছে। তাই ওর নিবিড় পরিচর্যার জন্য বেস ক্যাম্পে না রেখে আমাদের স্থায়ী বেসে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
-কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে পৃথিবীর এত গভীরে কেন তোমরা স্থায়ী বেস তৈরি করতে গেলে? ম্যার্সিয়াস বলে, তুমি সম্ভবত জানো তোমাদের পৃথিবীর অভ্যন্তর ভাগকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা যায়। ক্রাস্ট, ম্যান্টেল ও কোর। তোমরা বাস কর এবং মাটি খুঁড়ে খনিজ সম্পদ সংগ্রহ কর এই ক্রাস্ট থেকেই। এর বিস্তৃতি হলো ১৫ মাইলের মতো। তারপরই শুরু হয়েছে ম্যান্টেল। পরবর্তী প্রায় ১০০ মাইল পর্যন্ত অংশটা কঠিন ধাতব পদার্থ দিয়ে বানানো। কিন্তু এরপর থেকে বেশ কয়েক‘শ মাইল পর্যন্ত গভীর প্রচন্ড তাপে সেখানকার ধাতব পদার্থগুলো গলিত অবস্থায় আছে। হঠাৎ কোনো ছিদ্র পেলে ভূপৃষ্টে বেরিয়ে এসে অগ্নুৎপাত ঘটায়। এই তরল পদার্থের স্তরেই আমাদের স্থায়ী বেস বানানো হয়েছে।
‘আমাদের পৃথিবীতে এত জায়গা থাকতে এই গরম লাভার মধ্যে তোমরা বেস বানাতে গেলে কেন? সেটা কি গোপনীয়তা রক্ষার জন্য?

‘কিছুটা তাই। তাছাড়া আমরা সেখান থেকে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে রাখছি। ভবিষ্যতে সেগুলোর উপর ভিত্তি করে ভূমিকম্পের পূর্বাভাস অনেক আগেই জেনে নিয়ে তা নিয়ন্ত্রণে আমরা সক্ষম হবো।
‘তবুও আমার কাছে ভাবতে অবাক লাগছে তোমরা কিভাবে একটি ভয়ংকর জায়গায় ওরকম স্থায়ী বেস তৈরিতে সক্ষম হলে।
‘তোমার ভাবতে অবাক লাগলেও সেটা আমাদের জন্য একটি সাধারণ ব্যাপার। মহাকাশে এমন অনেক গ্রহ আছে যেগুলোর উপরিভাগেই লাভারস্রোত বয়ে যাচ্ছে। সেরকম গ্রহের আমরা শহর –উপশহর গড়ে তুলেছি। সেখানে তাপ ও শক্তির যে ছড়াছড়ি রয়েছে সেটাাকে কাজে লাগালে রাজার হালেই থাকা যায়।
‘কিন্তু আমরা সেখানে যাব কিভাবে?
‘কাল খুব ভোরে আমরা জীপ নিয়ে আলপাইন অঞ্চলে যাত্রা করবো। সেখানে পৌঁছে কোন নির্জন জায়গা দেখে সেলফ ট্রান্সপোজার দিয়ে আমাদের দু‘জনকেই জীপসহ ট্রান্সপোজ করে আলপাইন পাহাড়ের বেসে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখান থেকে আমরা অন্য একটি বিশেষ যানে করে স্থায়ী বেসে যাবো। এই যানে ঢোকার পরে আমাদের সহ যানটা ছোট হয়ে মাত্র ছয় ইঞ্চি উচ্চতায় দাঁড়াবে। এই যানটা তার চারপাশে লেজার রশ্নি বিকিরণ করে তার চারপাশের অল্প পরিসর মাটি প্রতি মুহূর্তে ভ্যাপোরাইজ করতে থাকবে এবং এই অবসরে আমরা প্রচন্ড শক্তিতে নিচের দিকে যেতে থাকবো। আমাদের স্থায়ী বেস স্টেশনে পৌঁছালেই যানটা আমাদেরসহ আবার পূর্বেও আকৃতিতে ফিরে আসবে।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ

আমাদের পূর্ব পরিকল্পনা অনুয়ায়ী আলপাইন অঞ্চলের একটি নির্জন স্থানে গাড়ি থামালাম। মার্সিয়াসের রিস্টওয়াচে একটু চাড় দিতেই ট্রান্সপোজারের কাজ শুরু হয়ে গেল। একটা সবুজ আলো আমাদেরসহ জীপটাকে ঢেকে ফেললো। তারপর কয়েক সেকেন্ডের জন্য আলোটা বেগুনী হয়েই মিলিয়ে গেল। পর মুহুর্তেই দেখি আমাদের নিয়ে জীপটা একটি আলো ঝলমল প্ল্যাটফর্মে চলে এসেছে। লক্ষ্য করলাম এই বেসে সব কাজকর্ম করছে রোবটরাই।

আমরা একটা ঘরের দিকে এগিয়ে গেলাম। ঘরের দরজাটা খুলে যেতেই দেখলাম একটি ফুট তিনেক উচুঁ রোবট এগিয়ে আসছে। মার্সিয়াসের সামনে এসে সে থেমে গেল। মার্সিয়াস রোবটাকে একটি নম্বরও বললো। মুহূর্তের মধ্যে যন্ত্রমানব আবার সচল হয়ে উঠলো। এরপর রোবটটা আমাদের জন্য নির্দিষ্ট করে রাখা ভূগর্ভ যানের কাছে নিয়ে গেল। মার্সিয়াস জানালো যে, এই রোবটই আমাদের যানটাকে ছোট করার কাজ করবে এবং লেজার সিস্টেমটা চালু করবে। আমাদের জন্য নির্দিষ্ট করে রাখা ভূগর্ভযানের কন্ট্রোল প্যানেলের বোতাম টিপতেই যানটার দরজাটা গাইড করে খূলে গেল। মার্সিয়াসকে নিয়ে আমি ভেতর ঢুকতেই দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। যানটার চারদিকের দেয়াল ট্রান্সপ্যারেন্ট  হওয়াতে বাইরের সবকিছু সহজেই দেখা যাচ্ছে। রোবটটা  আরেকটা সুইচ টিপতেই একধরনের নীল আলো আমাদের ভূগর্ভযানের উপর এসে পড়ল। একটু পরেই বুঝতে পারলাম চরপাশের জিনিসগুলো একটু একটু করে বড় হয়ে আসছে। তিন ফুটের রোবটটাকে এখন একটি বিশাল দৈত্যের মতো মনে হচ্ছে। ভয়ে মার্সিয়াসের দিকে তাকালাম। দেখি সে মুচকি মুচকি হাসছে। আমার মনের ভাব সে বুঝতে পেরেছে। মার্সিয়াস হাসতে হাসতেই বলল, আমরা ছোট হয়ে গিয়েছি। সাড়ে পাঁচ ফুট মানুষটা এখন চার ইঞ্চি হয়ে গিয়েছো।

কার্লের কথা শুনে আমার শরীরটা কেন জানি শিউরে উঠে। যদি এদের যন্ত্রপাতিতে কোনো অঘটন ঘটে যায়, আমি আবার আগের অবস্থায় ফিরে যেতে না পারি তখন কি হবে? নীল আলোটা নিভে গিয়েছে। ভূগর্ভযানের ভেতরটা এবার ভাল করে দেখতে লাগলাম। একপাশে একটা কন্ট্রোল প্যানেল। মার্সিয়াস ওটার সামনের আসনে বসে পড়ল।
মার্সিয়াস বললো, আমাদের ভূগর্ভ যান এবার স্টার্ট দেব। আমরা ঘন্টায় প্রায় হাজার মাইল বেগে নামবো। আরম্ভের সময় প্রচন্ড ঝাঁকুনি লাগবে। তাই সিট বেল্টটা বেঁধে নাও।

আমাদের যাত্রা শুরু হল। প্লাটফর্মটা দ্রুত মিলিয়ে গেল। মনে হলো আমরা যেন একটি অন্ধকার টানেলের মধ্য দিয়ে চলেছি। কিন্তু মিনিটখানেকের মধ্যেই এক অদ্ভূত দৃশ্য শুরু হল। অবাক হয়ে দেখি আমাদের যানটার চারপাশে শুধু লাল আলোর বিচ্ছুরণ ঘটছে।
‘লাল আলোটা হলো রেড রুবি লেজারের। ওটার মাধ্যমে আমরা চারপাশের মাটি ফুটো করে এগিয়ে চলেছি। ঐ আলোটা না থাকলে এখন চারপাশে শুধু কালো অন্ধকার দেখতে পেতে। চারপাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে আমি তন্ময় হয়ে পড়েছিলাম। মার্সিয়াসের ডাকে আবার সজাগ হলাম। বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখি কিছুক্ষণ আগের লাল আলোর বিচ্ছুরণ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আমাদের যানটা তখন চলছে গরম লাভা স্রোতের মধ্য দিয়ে। টগবগ করে ফুটতে ফুটতে লাভা এদিকে- ওদিকে ছিটকে পড়ছে।
গরম বাষ্প যা ধোঁয়া মাঝে মাঝে ভূগর্ভযানের স্বচ্ছ দেয়াল ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। আস্তে আস্তে ভূগর্ভযানের গতি কমিয়ে আনছে মার্সিয়াস। আমরা ধীরে ধীরে লাভা ও ধোঁয়ার মধ্যে দিয়ে নামছিলাম। হঠাৎ যানের ট্রান্সপারেন্ট দেয়ালের ভেতর দিয়ে আমার চোখে সামনে আস্তে আস্তে বড় হয়ে উঠতে লাগলো একটা ডোম আকৃতির কাঠামো। গাঢ় ধোঁয়ায় দৃষ্টিপথে কিছুক্ষণ কিছুই দেখা গেল না। যখন ধোঁয়াটা কেটে গেল তখন দেখি আমরা বেসের একদম কাছে এসে পড়েছি। বেসের ট্রান্সপ্যারেন্ট ডোমের ভেতর বিল্ডিং, হাইওয়ে, পার্ক এসব দেখা যাচ্ছিল। ভূগর্ভযানের সামনের দিকটা ডোমের গা টাচ করতেই একটা চাকতির মতো ঢাকনি সরে গিয়ে একটা সুড়ঙ্গপথ বের হয়ে আসলো। যানটা ঐ পথে প্রবেশ করতেই ঢাকনিতা আবার বন্ধ হয়ে গেল। হঠাৎ উপর থেকে একটা হলুদ আলো এসে আমাদের উপর পড়লো। আলোটা চলে যেতেই মার্সিয়াস বললো, আমরা বড় হয়ে আবার আগের সাইজে চলে এসেছি। তার এ কথায় আমি যেন প্রাণ ফিরে পেলাম। যানটি দরজাটা নিজে থেকেই খুলে গেল। আমি ও মার্সিয়াস যানের বাইরে এসে দাঁড়ালাম। প্ল্যাটফর্মের চারদিকে একবার দৃষ্টি বুলিয়ে মার্সিয়াসের দিকে ঘুরে তাকাতেই দেখি ওখানে আর পৃথিবীর মানুষরূপী মার্সিয়াস নেই। তার পরিবর্তে অ্যান্টটিকার বেসে তাকে যেমন দেখেছিলাম মার্সিয়াস তখন সেই মূর্তি ধারন করে মিটি মিটি হাসছে। সামনের দিকে পায়ের শব্দে তাকালাম। অনেকটা মার্সিয়াসের মতেই ফুটচারেক লম্বা। মাথার চুল হালকা হলুদ রঙের। এরা সবাই স্বমূর্তি ধারণ করায় বুঝতে পারলাম যে ঐ ডোমের মধ্যেকার আবহাওয়া ও মাধ্যাকর্ষণ শক্তি তাদের ভালকান গ্রহের মতোই করা হয়েছে। সেই সঙ্গে আমার চারপাশে একটা স্বচ্ছ প্রোটেকটিভ ক্যাপসুল দেওয়াল ফলে আমিও স্বাভাবিক অবস্থায় আছি। এই ক্যাপসুলটার ভেতরে পৃথিবীর মতো আবহাওয়াই বিরাজ করছে। আমার ক্যাপসুলের ভেতরে নিশ্চয়ই বিশেষ ব্যবস্থা ছিল। তাই ওদের ভাষায় কথা বললেও আমি তাদের সব কথাই বুঝতে পারছিলাম। মার্সিয়াসকে ওরা জানাচ্ছিল যে অন্নপূর্ণার ব্রেনে দ্রুত অপারেশন করতে হবে। কারণ ব্রেনে আঘাত পাওয়া অংশের চিকিৎসার সঙ্গে সঙ্গে নিউরন ট্রান্সপ্লান্টের কাজও একই সঙ্গে করতে হবে। অ্যাকসিডেন্টের পরে অন্নপূর্ণার ব্রেনে বাধ্য হয়ে আমরা একজন ভালকানের নিউরন দিয়েছি, কিন্তু এতে করে অন্নপূর্ণা খুব বেশি ইমোশনাল হয়ে যাবে। এই অবস্থায় তার ভবিষ্যৎ নেতৃত্বে আসার ক্ষেত্রে ভীষণ সমস্যার সৃষ্টি করবে। তাই আমরা কোন ঝুঁকি নিতে আগ্রহী নই। তোমার লেস ইমোশনাল নিউরন অন্নপূর্ণার ব্রেনে দিলে একটা ভারসাম্যের সৃষ্টি হবে। কারণ মেয়েটির ব্রেনের ডান অংশে ভালকানের নিউরন রয়েছে আর ব্রেনের বাম অংশে দেওয়া হবে পৃথিবীর নিউরন, মানে তোমার মতো লেস ইমোশনালের নিউরন। 

‘পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে কত সময় লাগবে? আমি জিজ্ঞাসা করি। 
মার্সিয়াস উত্তর দেয় পনেরো- থেকে বিশ মিনিট। লেজার রশ্নি ব্যবহার করে কাজটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করা হবে। আমাকে নিয়ে যাওয়া হল ডা. ভেলবের ঘরে। সেখানে ডেন্টিস্টের চেয়ারের মতো চেয়ারের পাশে ডা. ভেলব তার কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে আমার অপেক্ষায় ছিলেন। আমি চেয়ারে বসতেই কাজ শুরু হল। ক্যামেরার লেন্সের মতো একটি জিনিস আমার কপাল লক্ষ্য করে ফোকাস করা হলো। মিনিটখানেকের মধ্যেই তাদের কাজ শেষ হয়ে গেল। আমি কিছুই টের পেলাম না। 
মার্সিয়াস বললো, তোমার নিউরোন নেওয়ার কাজ শেষ হয়েছে। এবার অন্নপূর্ণার অপারেশন শুরু হবে। তাতে বেশ কিছুটা সময় লাগবে। সেই ফাঁকে চল আমরা একটু রেস্ট নিয়ে নেই। বারান্দায় ঢোকার দরজায় ডা. ভেলবকে দেখা গেল। ধীরপায়ে এগিয়ে এলেন তিনি আমাদের দিকে। মার্সিয়াস সাগ্রহে জিজ্ঞেস করলো, অপারেশন সাকসেসফুল তো ডা. ভেলব? হ্যাঁ, সাকসেসফুলই বলা চলে। মেয়েটা এখন ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘন্টা দুয়েক পরে ঘুম থেকে জাগলে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাবে। ডা. ভালবো জানালেন ৪/৫ ঘন্টার মধ্যেই অন্নপূর্ণার জ্ঞান ফিরে আসবে। তখন আপনি তার সঙ্গে আলাপ করতে পারবেন। এসময়টুকু আমি মার্সিয়াসের সঙ্গে ভালকানের স্থায়ী বেসের বিভিন্ন অংশ ঘুরে ঘুরে দেখলাম। ভালকানদের প্রকৌশল গত ও বৈজ্ঞানিক বিদ্যাবুদ্ধি যেকোন পর্যায়ে রয়েছে তা ভাবতে গিয়ে আমি বিস্মিত না হয়ে পারলাম না। এই স্রোতের লাভার রাজ্যেই তারা গড়ে তুলেছে নিজস্ব পাওয়ার হাউস, খাদ্য উৎপদনের জন্য গ্রীন হাউস, বিনোদন কেন্দ্র, অপেরা হাউস ইত্যাদি।

সময় বয়ে যায় এভাবে। অন্নপূর্ণার মুখোমুখি এখন আমরা তিনজন।  স্নিদ্ধ শান্ত সমাহিত ভাব মেয়েটির চোখে মুখে। ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকায় অন্নপূর্ণা। ডা. ভালবো স্মিত হাসি নিয়ে অন্নপূর্ণার দিকে তাকালেন। ‘কেমন আছো মা তিনি জিজ্ঞেস করলেন। ভালকানদের মধ্যেও আবেগ কাজ করে তা এই প্রথম দেখলাম। ধীরে ধীরে অন্নপূর্ণা পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। মার্সিয়াসের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময়ের সময় মৃদু হাসলো মেয়েটি।

‘মার্সিয়াস এবার আমার সঙ্গে অন্নপূর্ণার পরিচয় করিয়ে দেয়।
‘ইনি বাংলাদেশ থেকে এসেছেন। পেশায় সাংবাদিক। অন্নপূর্ণা আবারও মৃদু হাসলো। তারপর বললো- ‘হ্যাঁ আমি ওনাকে চিনি। স্বপ্নের মধ্যে ওনাকেও দেখতে পেয়েছি। তারপর আমার দিকে পূর্ণ দৃষ্টি নিয়ে তাকালো মেয়েটি।
-জিজ্ঞাসা করলো কেমন আছেন আপনি?
‘ভালো, আপনি? আমি পাল্টা প্রশ্ন রাখি।
-আগের চেয়ে অনেক সুস্থবোধ করছি। আর একটু সুস্থ হলেই আমি বাংলাদেশে বেড়াতে যেতে পারবো। কিন্তু তার আগে আপনাকে আমার হয়ে একটি কাজ করতে হবে। মার্সিয়াস ভাইয়া কাজটির বিস্তারিত আপনাকে জানাবেন। প্লিজ কাজটি করতেই হবে আপনাকে।

‘আমি বললাম আমার দেশের ভালোর জন্য আমি সব কিছুই করতে প্রস্তুত। আপনি তা নিশ্চিত থাকতে পারেন। মার্সিয়াসের দিকে অন্নপূর্ণা অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। মার্সিয়াস মৃদু হেসে আমাকে বললো, চল বন্ধু আমার সঙ্গে, তোমাকে স্বপ্ন রাজ্যে নিয়ে যাই এবার। পাশের ঘরটি মৃদু আলোতে আলোকিত। একটি টেবিলের উপর কিছু চর্তুষ্কোণ আকৃতির চকলেটের মতো জিনিস রাখা। মার্সিয়াস তার মধ্য থেকে দু‘টি চর্তুষ্কোণ আকৃতি জিনিস আমার কপালের দু‘পাশে লাগিয়ে দিতেই আমি চোখের সামনে এক স্বপ্ন রাজ্যের মতো বাংলাদেশের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য দেখতে লাগলাম। হঠাৎ ধান ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে অন্নপূর্ণাকে দেখা গেল। গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা তার সঙ্গে এগিয়ে আসছে। কারো হাতে ফুল, কারো হাতে বই। আমার দু‘চোখে কেমন যেন ঘুম ঘূম ভাব চলে আসে। রবীন্দ্রসংগীতের সুরের মূর্ছনা আমাকে আপ্লুত করে দেয়- 

একসময় স্বপ্নের মধ্যে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে দেখতে পেলাম। নদীগুলো দূষণমুক্ত। অরণ্য বন গাছপালা, পশুপাখিতে ভরপুর,  নদীনালা ভরা মাছ, রাস্তায় নেই যানজট। অন্নপূর্ণা বলছে আমার মায়ের দেশে এসো সবাই স্বচ্ছ চিন্তা করতে শিখি। আমরা আমাদের পরিবেশ, আমাদের জীবন নতুন করে গড়ে তুলি। প্রকৃতিতে পাখি বেঁচে থাকতে পারলে মানুষের কী উপকার, মৌমাছির অস্তিত্ব আমাদের জীবনের জন্য, বাস্তুতন্ত্রের জন্য কত প্রয়োজনীয় তা আমাদের বুঝতে হবে। রাজনীতির মূল চিন্তাধারায় এসো আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসি আমরা আবার- গানের মূর্ছনা শোনা যায়- ‘এবার তোর মরা গাঙে বান এসেছে... ...

আস্তে আস্তে আমার ঘুম আর তন্দ্রা ভাবটা কেটে যায়। আমি চোখ মেলে তাকাই। মার্সিয়াস বলে, ‘ ওঠ বন্ধু এবার তোমাকে আসল কাজটি বুঝিয়ে দেই। ঢাকায় ফিরে গিয়ে তোমার কাজ হবে আমাদের দেওয়া একটি বিশেষ যন্ত্র থেকে  তোমাদের দেশের তরুণ-তরুণীর স্মার্ট মোবাইলে একটি বিশেষ ধরণের আপস লোড করা। এই আপসের মাধ্যমে তাদের ব্রেনে ঘুমের মধ্যে বিশেষ একটি বিশেষ স্বপ্ন দেখানো হবে যা তাদের জীবনধারাকে প্রভাবিত করে ইতিবাচক পরিবর্তন এনে দেবে। গড়ে উঠবে নীতিভিত্তিক ধ্যান-ধারণা। আর অন্নর্পুর্ণা যখন তোমাদের রাষ্ট্রীয় ও সমাজর আমূল পরিবর্তনে পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন শুরু করবে তখন এই লক্ষ- কোটি তরুণ-তরুণী যারা তোমার দেশের মূল চালিকা শক্তি হবে তারা অন্নর্পুর্ণার যোগ্য কর্মীবাহিনীতে পরিণত হবে। ট্যাবলেট সাইজের ছয়টি বিশেষ যন্ত্র মার্সিয়াসের হাতে দিয়ে গেল একজন। সে আমাকে যন্ত্রটি কীভাবে চালাতে হবে তা দেখিয়ে দিল। আমাদের আই ফোনের মতই উপরের বোতাম চাপ দিলে যন্ত্র চালু হয়ে যায়। পনেরো থেকে বিশ মাইলের মধ্যে যতো স্পার্ট মোবাইল চালু থাকবে যন্ত্রাটি তা অটো ডিটেকড করবে এবং আপসটি হাইড অবস্থায় ডাউনলোড হয়ে স্মার্টফোনে ইনস্টল হয়ে যাবে। ব্যবহারকারী ঘুমিয়ে পড়লে এবং মোবাইল ফোন অন বা অফ যে অবস্থায় থাকুক না কেন আপসটি একটি নির্দিষ্ট সময়ে চালু হয়ে যাবে। স্মার্ট ফোনটির মালিক তখন স্বপ্ন রাজ্যে চলে যাবে। তার ব্রেনের অবচেতন অংশে এই স্বপ্ন দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে যাবে।

সব দেখে-শুনে আমাকে স্বীকার করতেই হলো যে ভালকানরা এবার যুগান্তকারী প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে। আর অন্নপূর্ণা রয়েছে সেই প্রজেক্টের কেন্দ্রবিন্দুতে। মার্সিয়াসের পিঠে একটি চাপড় মেরে বললাম, এবার আমার ফেরার ব্যবস্থা কর।
 তোমার ফেরার ব্যবস্থা আগেই করে রেখেছি। কারণ তোমার মতো ইনটেলিজেন্ট ও লেস ইমোশনাল পৃথিবীর মানুষকে কোন বিশ্বাস নেই। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাদের বেসগুলো থেকে তোমাকে বিদায় করতে না পারলে আমরাও নিশ্চিন্ত হতে পারবো না।

মার্সিয়াসের কথায় এবার আমি ও অন্নপূর্ণা দুজনেই এবার হেসে উঠলাম।

পাঠকের মন্তব্য


একই ধরনের লেখা, আপনার পছন্দ হতে পারে

bdjogajog