দুই নগরের উপাখ্যান ( চতুর্থ পর্ব)

আলতামাস পাশা লেখাটি পড়েছেন 155 জন পাঠক।
 ‘A people that loves freedom will in the end be free’

চতুর্থ পর্ব

লিন্ড গ্রে পারভেজকে মোটামুটি রায়হানের ব্যাপারটি বুঝিয়ে বলেছে। বাংলাদেশ সম্পর্কে, এদেশের মানুষ সম্পর্কে অগাধ বিশ্বাস আর শ্রদ্ধাবোধ লিন্ডার। তার ক্যামেরায় বন্দি হয়ে আছে বহু ঘটনার ছবি। বহু ইতিহাসের ফটোজেনিক রূপ। লিন্ডার যতদূর জানা আছে তা’তে সে জানে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যেখানে মুক্তিযোদ্ধারা একে অন্যকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে স্বাধীনতার পরে শুধুমাত্র ক্ষমতা আর মতপার্থক্যের কারণে। কিস্তু বাংলাদেশ ’৭১ সালে সারা ইউরোপ- আমেরিকার লক্ষ লক্ষ মানুষের মন কেড়ে নিয়েছিল এক অজানা উন্মাদনায়। শুধু কি তাই! এশিয়া- আফ্রিকা সব জায়গাতে লিন্ডা গ্রে অতুলনীয় ভালোবাসা দেখেছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি এসব অঞ্চলের কোটি কোটি মুক্তি পাগল মানুষের মধে। এতো শ্রদ্ধা, এতো ভালোবাসা ভিয়েতনাম, বায়াফ্রা, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইরিত্রিয়ার মুক্তিযোদ্ধারাও পায়নি। আসলেই কি ছিল বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে? রায়হানের মধ্যে? বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা সেদিন দেশের প্রতি এমন ভালোবাসা আর মমতা দেখিয়েছিল যে বিদেশে মানুষ বাংলাদেশের কষ্টে কষ্ট পেয়েছে। কেঁদেছে। যে যেভাবে পেরেছে, যতটুকু সম্ভব বাংলাদেশকে সাহায্য করেছে। সেদিনগুলো যারা দেখেনি তার জানা না বাংলাদেশ কি আশ্চর্য এক ভালোবাসা থেকে সৃষ্টি। এই ভালোবাসায় শুধু বাঙালি মুক্তিযোদ্ধারই নয়, হাজার হাজার বিদেশীর আতœত্যাগ এবং রক্ত মিশে আছে। সারা দুনিয়ার সাধারণ মানুষের চোখের জলে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছে।

লিন্ডা গ্রে ভ্র কুঁচকে রায়হানের কথা ভাবছিল। এ ছোট্ট দেশটিতে রায়হান যদি বেঁচে থাকে তা’হলে কেন তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না! পারভেজ ছেলেটি খুব চটপটে। যেকোন বিষয়ে, যেকোন কাজে পারভেজের ক্লান্তির ছিঁটেফোটাও নেই। রায়হানের ব্যাপারটায় খুব ইন্টারেস্ট পারভেজের। লিন্ডাকে পারভেজ পরামর্শ দিয়েছে দৈনিক পত্রিকাগুলোতে বিজ্ঞাপন দিয়ে পারভেজের খবর নিতে। পরামর্শটি লিন্ডার পছন্দ হয়েছে। পারভেজকে সে এ বিষয়ে একটি খসড়া তৈরি করতেও বলেছে। তবে লিন্ডার মনের উৎকণ্ঠা কাটেনি। তার ভয় হচ্ছে রায়হানের সঙ্গে বুঝিবা আর দেখা হবে না। সিডি প্লেয়ারে বাজে ‘হোয়েন আই নিড ইউ আই জাস্ট ক্লোজ মাই আইস’। লিন্ডার মনে হয় একটিবারের জন্য হলেও রায়হানকে খুঁজে পেতেই হবে। 

 লিন্ডার ঘর এখন মুক্তিযুদ্ধের ওপর লেখা নানান বইয়ে ভরা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ- বিশাল এর পটভূমি। কিন্তু বারবার চেষ্টা  করা হচ্ছে এর ইতিহাসকে বিকৃত করার। চেষ্টা চলছে প্রকৃত ঘটনাকে আ্ড়াল করার, মুছে ফেলার। আর এসব যাঁরা করছেন তারা সবাই বাংলাদেশের এক শ্রেণীর উন্নতমানের বুদ্ধিজীবী।

বাংলাদেশে এসে লিন্ডা অবাক হয়ে শুনছে স্বাধীনতার ঘোষককে তাই নিয়ে নানান মুখরোচক গল্প। অথচ প্রকৃত সত্য কথা নতুন প্রজন্ম থেকে আড়াল করে রাখা হচ্ছে। কেন এমন জঘন্য কাজ করা হচ্ছে তা লিন্ডা ভেবে পায় না। লিন্ডার বাবা ‘৭১ সালের মার্চের ২৫ তারিখ পর্যন্ত ঢাকা থেকে এবং পরবর্তীতে কলকাতা ও দিল্লি থেকে যেসব সংবাদ পাঠান তাতে স্বাধীনতা ঘোষণার প্রকৃত তথ্য পাওয়া যায়।
-----------          ---------------         -------------         ---------------

২৫ শে, ১৯৭১ সাল, ঘড়ির কাটা ১২টা ছুঁয়েছে। পূর্ব বাংলার রাজধানী ঢাকা। বিশ্বাসঘাতক পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর আক্রমণ শুরু হয়ে গেছে ততক্ষণে। অন্যদিকে ইপিআর ওয়্যারলেসে তখন ভেসে আসছে শেখ মুজিবের শেষ কণ্ঠস্বর, 'This may be my last message. From today Bangladesh is Independent. I call upon the people of Bangladesh whatever you might be and with whatever you have, to resist the army of occupation to the last. Your fight must go on until the last solider of the Pakistan occupation army is expelled from the soil of Bangladesh and the final victory is achieved. Joy Bangla.’	
গ্রেফতার হবার আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব গোপন একটি বেতার ট্রান্সমিটারে আরও একটি বার্তা পাঠান যে বার্তাটি চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করা এবং বন্দর নিকটবর্তী জাহাজগুলোর ভিএইচএফ ট্রান্সমিটারে ধরা পরে- 
‘To the people of Bangladesh and also of the world. Pakistan armed forces suddenly attacked the EPR base at Peelkhana and police line at Rajarbagh of 00 hrs of 26. Killing lots of people. Still battle is going on with EPR and Police forces in the streets of Dacca. Our people fighting gallantly with the enemy forces for the cause of the freedom of Bangladesh, in every sector of Bangladesh.
May Allah bless you and help you in your strugle for freedom.
Joy Bangla.’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব  যখন ইপিআর সেনাদের সিগন্যালের মাধ্যমে আনুষ্ঠনিকভাবে এ স্বাধীনতার ঘোষণা দিচ্ছেন তখন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে চলছে বৈঠক। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সিগন্যালস বঙ্গবন্ধু  শেখ মুজিবের স্বকণ্ঠে দেয়া স্বাধীনতার এ বাণী ধারণ করে, যা পরবর্তীতে পাকিস্তান সামরিক জান্তা ব্যবহার করে বঙ্গবন্ধু  শেখমুজিবের বিপক্ষে তথাকথিত রাষ্ট্রদ্রোহীতার মামলা দায়ের করার সময়। সে সময় বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন লেঃ জেনারেল রাও ফরমান আলী, ব্রিগেডিয়ার গালিব সিদ্দিকী। তখনই বঙ্গবন্ধু  শেখ মুজিবের বাসায় কমান্ডো বাহিনী পাঠানো হল।

২৫ মার্চ রাত ৯টা। বঙ্গবন্ধু  শেখ  মুজিব শেষ পর্যন্ত ঢাকা ত্যাগে রাজি হলেন না। তিনি শেষ পর্যন্ত বুঝতে পেরেছিলেন পালিয়ে যদি তিনি ভারতে চলে যান তা’হলে পাকিস্তান সামরিক জান্তা জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টিতে সুযোগ পাবে এবং প্রচার করতে থাকবে যে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা আসলেই সত্যি ছিল। অন্যদিকে তিনি বন্দি থাকলে অথবা পাকিস্তাানীরা তাকে হত্যা করলে সে পটভূমিতে জাতীয় ঐক্য আরও শক্তিশালী হবে।

বঙ্গবন্ধু  শেখ  মুজিবছিলেন জাতীয়তাবাদী নেতা। বিপ্লবের ক্ষেত্র তিনি প্রস্তুত করলেন। বিপ্লবীদের যুদ্ধে পাঠালেন, কিন্তু নিজে থাকলেন না। নিজে মিশে যেতে চাইলেন জনমানুষের স্বপ্নের সঙ্গে, সংগ্রামের সঙ্গে, বিপ্লবীদের রক্তের সঙ্গে। তিনি একটি   জাতির জনক। তার চেয়েও যে বিষয়টি সত্য, তা হচ্ছে তিনি কোন ক্ষুদ্র বা সাধারণ রাজনৈতিক নেতা নন। বাংলাদেশের ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা অক্ষয় হয়ে আছে, থাকবে। তা মুছে ফেলার চেষ্টা আত্ম প্রতারণা ছাড়া অন্য কিছুই হতে পারে না। 

‘৭১ এর মার্চ মাসে ঢাকায় উপস্থিত দেশী- বিদেশী সাংবাদিকদের কাছে এটি স্পষ্ট হয়ে উঠে যে,তাৎক্ষণিক স্বাধীনতার ডাকে  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব অবিচল হলেও তিনি কোনো ঝুঁকি নিতে চান না্। এদিকে সারা দেশে প্রত্যাশা ছিল ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাধীনতার ঘোষণা দেবেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব জানতেন একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণার অর্থ দাঁড়াতো পাক সামরিক বাহিনীকে তার সব শক্তি নিয়ে সরাসরি ঝাঁপিয়ে পড়তে প্ররোচিত করা। ফলে পাঞ্জাবী সামরিক জান্তা যে কেবল শক্তি প্রয়োগের ছুঁতোই খুঁজে পেতো তাই নয়, বল প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের ইচ্ছা চরিতার্থ করতে তারা সকল সম্ভাব্য উপায়ে জনতার আকাঙ্খাকে তছনছ করতো। নিরস্ত্র বাঙালিরা তাৎক্ষণিক সে আঘাত সহৃ করতে পারতো কি?  তা’ছাড়া আন্তর্জাতিক সমর্থনের দিকটিও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব খুব গুরুত্ব সহকারে চিন্তা করেছিলেন। 

এদিকে পাকিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত যোসেফ ফারল্যান্ড বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সঙ্গে দেখা করে যেকোন হঠকারি সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সর্তক করলেন। ৬ মার্চ পূর্ব বাংলার গর্ভনরের পদে লেঃ জেনারেল টিক্কা খানকে নিযুক্ত করা হয়। ৭ মার্চ তিনি ঢাকা পৌঁছলেন। 

পাকিস্তানের সেনাবাহিনী তৈরি হয়ে আছে। ঢাকার স্পর্শকাতর এলাকায় পাক সেনারা ততক্ষণে অবস্থান নিয়েছে। রেসকোর্সের উপরে উড়ছে পর্যবেক্ষণ হেলিকপ্টার।
দুপুর ৩:৩০ মিনিটে আসলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব । তার ১৯ মিনিটের ভাষণে তিনি সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণার পরিবর্তে ৪টি দাবি উত্থাপন করলেন। বললেন- সামরিক আইন প্রত্যাহার করতে হবে, সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হবে, যেভাবে হত্যা করা হয়েছে তার তদন্ত করতে হবে এবং জনগণের প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। তারপরে বিবেচনা করে দেখবো পরিষদে বসবো কি বসবো না.......।

তিনি আরও বললেন, আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি রাস্তাঘাট যা যা আছে তোমরা বন্ধ করে দিবা। ..... প্রত্যেক ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোল। তোমরা যার যা আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকবা।......

এভাবেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তার ভাষণ শেষ করলেন। জনগণ কিছুটা হতাশ। তারা পূর্ণ স্বাধীনতা ঘোষণা চেয়েছিল। তা হয়নি। ভাষণ শেষ হবার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কিছুক্ষণ নীরবে রইলেন। চোখের সামনে ভেসে উঠলো ‘৬৯, ‘৭০ এর জনসভাগুলোর লক্ষ লক্ষ মানুষের উচ্ছাস এবং আবেগ আকুল মুখগুলো। রেসকোর্সের লাখ লাখ মানুষের নৈরাশ্য তাকে স্পর্শ করলো। এবার তিনি শেখ মুজিব থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’ হয়ে গেলেন। তিনি হঠাৎ উদাত্ত আহবান জানালেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’।

জনতা আবার প্রাণ ফিরে পেল। ‘ স্বাধীনতা’আর ‘মুক্তি’ শব্দ দুটি তাদের মুক্তিযুদ্ধের পথনির্দেশক হয়ে গেল।

২ মার্চ, ১৯৭১। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবন। তৎকালীন ডাকসুর সহ- সভাপতি আ.স.ম আব্দুর রব হাজার হাজার তরুণ- তরুণীর উপস্থিতিতে গাঢ় সবুজের মধ্যে উজ্জ্বল জ্বলনত সূর্যের প্রতীক লাল রঙের মধ্যে হলুদ রঙের বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা সেদিন প্রথম উড়িয়ে দেন। তারপর ছাত্রছাত্রীরা মিছিল করে এ পতাকা নিয়ে ধানমন্ডী ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাসায় যায় এবং সেখানে এ পতাকা উত্তোলন করা হয় যা ২৫ মার্চ মধ্য রাত্রি পর্যন্ত শোভা পায়।

সারা বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতার সংগ্রামে ৩রা মার্চই রাস্তায় নেমে এসেছিল। শহর- গ্রামে তখন একই কথা “ বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর”। ২৫শে মার্চ যখন বিশ্বাসঘাতক ইয়াহিয়া তার হিংস্র বাহিনীকে গণহত্যায় লেলিয়ে দিল, তখন আন্তর্জাতিক বিশ্বকে তা জানিয়ে দিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ইংরেজিতেই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সে ঘোষণাকে বারবার বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে এগিয়ে আসল বিপ্লবী স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। ২৫শে মার্চ দিবাগত রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যে,স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যান তা ইংরেজিতে ও বাংলায় অনুবাদ করে ২৬ শে মার্চ বিকেল থেকেই চট্টগ্রামের বিপ্লবী স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে বারংবার প্রচারিত হতে থাকে। 

২৬ মার্চ, ১৯৭১, সন্ধ্যা ৭:৪০ মিনিট প্রবীণ সাংবাদিক ও কবি আবদুস সালাম বিপ্লবী স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তার জ্বালাময়ী বক্তব্য রাখেন: ‘নাহমাদুহু ওয়া মুসাল্লিহি আলা রাসুলীহিল করিম।......  আসসালামু আলায়কুম। প্রিয় বাংলার বীর জননীর বিপ্লবী সন্তানেরা। স্বাধীনতাহীন জীবনকে ইসলাম ধিক্কার দিয়েছে। আমরা আজ শোষক প্রভুত্ব লোভীদের সঙ্গে সর্বাত্মক সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছি।  এই গৌরবোজ্জ্বল স্বাধীকার আদায়ের যুদ্ধে, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মুক্তিযুদ্ধে মরণকে বরণ করে যে জীবনকে কোরবানী দিচ্ছি পবিত্র কোরাণের ভাষায় তারা মৃত নহে, অমর। দেশবাসী ভাইবোনেরা আজ আমরা বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রাম করছি.....। নাসরুম মিনাল্লাহে ওয়া ফাতহুন করীব ( নিশ্চয়ই আল্লার সাহায্য ও বিজয় সম্মুখবর্তী) জয় বাংলা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যেন এক আকাশ ছোঁয়া মানুষ। তাই বুঝি ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যখন দিল্লীতে আসলেন, তখন মুখোমুখি হলেন এক অসাধারণ আবেগ ও ভালোবাসার। মঞ্চে এলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব । পাশে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মাই্ক্রফোনের সামনে এসে দাঁড়ালেন এবং বললেন,“ লেডিস এন্ড জেন্টেলমেন”- সঙ্গে সঙ্গে জনতার আবেগ ও উল্লিসিত চিৎকারে তাকে থেমে যেতে হল। জনতা তখন গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে,‘হাম লোগ বাংলা মে শুননা চাহ তে হে.... বাংলা মে বলিয়ে, বাংলা মে বলিয়ে।’ মুজিব ফিরলেন শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধির দিকে। তার মুখে স্মিত হাসি। এবার শেখ মুজিব ফিরলেন জনতার দিকে। তার সেই চিরাচরিত জলদ গম্ভীর কন্ঠস্বরে বললেন, “ভায়েরা আমার”। শীর্তাত দিল্লী যেন উষ্ণ হয়ে উঠলো। প্রচন্ড আবেগ উল্লাসে হাজার হাজার মানুষ ফেটে পড়লো। লিন্ডার জানা নেই আজ পর্যন্ত কেউ দিল্লীর কোন জনসভায় বাংলায় ভাষণ দিতে জনতা কর্তৃক আহবান পেয়েছেন কিনা? সম্ভবত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব প্রথম বাঙালি যিনি নানা ভাষা, বর্ণের ও জাতের মানব সভ্যতার ঐতিহ্য সমৃদ্ধ হাজার বছরের প্রাচীন দিল্লীতে এ তুলনা রহিত ইতিহাসের রচনা করলেন। এমন একজন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের পাশে স্বাধীনতার প্রায় ৫০ বছর পরেও কি আর কাউকে দাঁড় করানো যায়? অথবা ভবিষ্যতেও যাবে?

লিন্ডার ইতিহাস ভাবনায় ছেদ পড়ে, কলিং বেল বেজে উঠে। লিন্ডার বাবার পরিচিত সাংবাদিক বন্ধু আহমেদ হুমায়ুনকে দেখে লিন্ডা খুশি হয়। বহুদিন পরে বাবার এ বন্ধুটির সঙ্গে দেখা। বেশ ক’বার হুমায়ুন সাহেব জার্মানী গিয়েছেন। থেকেছেনও লিন্ডাদের বাসায়। হুমায়ুন সাহেব একজন নির্ভিক সাংবাদিক। তার সমসাময়িক অনেকেই নীতি- আদর্শকে বিকিয়ে দিলেও হুমায়ুন সাহেব তা হতে দেন নি। দিতে পারেন নি। 

.....বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বহু অজানা ঘটনার সঙ্গে হুমায়ুন সাহেব প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। রায়হানের সঙ্গে হুমায়ুন সাহেবের ঘনিষ্ট পরিচয় ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় বহুবার মুক্তাঞ্চলে খবর সংগ্রহে গিয়ে রায়হানের সঙ্গে দেখা হয়েছে। আশ্চর্য ব্যক্তিত্ব ছিল রায়হানের। প্রচন্ড ভালোবাসতো দেশকে। হুমায়ুন সাহেবকে রায়হান একবার বলেছিল, জানেন, সাংবাদিক সাহেব জাতিগত ঈর্ষা, ক্রোধ আর বৈষম্য একটি জাতিকে ধ্বংস করতে সব সময় সচেষ্ট থাকে। পাঞ্জাবীদের বেলাতেও তাই হয়েছে। বাঙালির নিজস্ব,স্বতন্ত্র ঐতিহ্য তাদের পক্ষে মেনে নেয়া সম্ভব হয় নি। বাঙালিকে কিভাবে নিজেদের দখলে রাখা যায় সে ষড়যন্ত্রেই পাকিস্তানীরা বেশি ব্যস্ত থেকেছে এবং তাদের এ কাজে ইন্ধন যুগিয়েছে নামীদামি কিছু বাঙালি ব্যক্তিত্ব। সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে এত বিপুল সংখ্যায় স্ববিরোধী ব্যক্তি বোধ হয় অন্য কোন জাতির মধ্যে দেখতে পাওয়া যাবে না। আমি কি ভুল বলেছি সাংবাদিক সাহেব? মৃদু হেসে রায়হান জিজ্ঞেস করে। 

হুমায়ুন সাহেবও মুচকি হাসেন। বলেন, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরাও কিন্তু তাই বলতো। অথচ কি জানেন, এসব স্ববিরোধীরা না থাকলে ব্রিটিশের পক্ষে এদেশে শাসন বজায় রাখা সম্ভবপর হত না। আর পাকিস্তানীরাও এদের কারণেই ২৫ বছর আমাদের শাসন করতে পারছে। কথা বলতে বলতেই অঝোর ধারায় বৃষ্টি এল। বৃষ্টিতে রায়হান আনমনা হয়। বাংলাদেশে বৃষ্টির আলাদা মাধুর্য্য রয়েছে। এ দেশের মানুষের প্রাণ শক্তিকে সঞ্জীবিত করে বৃষ্টি। বৃষ্টির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে রায়হান। বৃষ্টির মাঝে ছেলেবেলার হারানো সুুর যেন খুঁজে পায় সে। ছোট বোনটা এমন বৃষ্টির দিনে মা’র কাছে ইলিশ মাছ ভাজা ও খিঁচুড়ি খেতে চাইতো। রায়হানরা খুব গরীব ছিল। সব বৃষ্টির দিনে তাই আর ইলিশ ভাজা ও খিঁচুড়ি খাওয়া সম্ভব হত না। চেয়ারম্যান কেরামত মওলার বাসায় প্রায়দিনই ভাল ভাল রান্না হত। রায়হানের ছোট বোন টুম্পা মাঝে মধ্যে কেরামতের মেয়ে কুসুমীর কাছে গল্প করতে গেলে সেসব খাবার দেখতো আর বাসায় এসে দুঃখ করতো। রায়হানের বাবা গ্রামের প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষকতা করতেন। ছেলেমেয়ের সব চাহিদা তিনি কখনই পূরণ করতে পারতেন না। রায়হান যে বছর প্রাইমারী বৃত্তি পেল তখন টুম্পাকে সুন্দর এক কৌটো ভরা চকলেট কিনে দিয়েছিল। চকলেট হাতে পেয়ে টুম্পা যেভাবে আনন্দে - ভাললাগায় কেঁদে -হেসে তুলকালাম কান্ড বাঁধিয়ে ছিল সে ঘটনা এখনও রায়হানের স্মৃতিতে স্পষ্ট ভেসে উঠে। গ্রামের বাড়িতে টুম্পারা এখন কি করছে কে জানে! নিজের অজান্তেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে রায়হান।

রায়হানের অন্যমনস্কতা হুমায়ুন সাহেবকেও স্পর্শ করে। তিনি মৃদু কাসি দিয়ে তার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন। হঠাৎ হো হো করে হেসে উঠে রায়হান। 

-	দেখুন তো দেখি কান্ড! একেবারে ছেলেমানুষীতে পেয়ে বসেছিল আর কি! নস্টালজিয়া যাকে বলে।
-	আপনাকে যে খবর আনতে বলেছিলাম তার কত দূর করলেন সাংবাদিক সাহেব? সাঁওতাল নেতা সাগরাম মাঝির কোন খোঁজ পেলেন?
-	হ্যা্ পেয়েছি। ভারতের পাতিরাম, মধুপুর, শিলিগুড়ি, পশ্চিম দিনাজপুর, পানিঘাটা এলাকায় শরণার্থী শিবিরে আশ্রিত সাঁওতাল তরুণদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিয়েছে সে। খবর এসেছে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর, জয়পুরহাট, রংপুর এবং দিনাজপুরের আদিবাসী সাঁওতাল ছেলেরাও এসব কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ নিতে আসছে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে কিছুদিনের মধ্যেই যথেষ্ট সংখ্যক আধুনিক অস্ত্র সজ্জিত সাঁওতাল আদিবাসী তরুণ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেবে। 

-	গুড, ভেরি গুড, বলে রায়হান। চমৎকার ভারি চমৎকার একটি খবর দিলেন সাংবাদিক সাহেব। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এমন একটি জনযুদ্ধেরই স্বপ্ন দেখতেন। মধ্যবিত্তের নেতা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব নিজের অজান্তেই গোটা দেশকে প্রবলভাবে নাড়া দিয়ে গেলেন। এমনটি সত্যিই ভাবা যায় না। বাংলাদেশের বামপন্থীরা ২৫ বছর ধরে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের কথা বলে যা করতে পারে নি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ‘৭০ এর নির্বাচনে অংশ নিয়ে তাই করে ফেললেন। অবশ্য নকশালীরা এতে বড়ই বিচলিত তাই না? কোন পথে তারা যাবে এখনও ঠিক করে উঠতে পারছে না। পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট দলগুলোর অবস্থা হয়েছে দিকভ্রান্তের মত। কেউ হল চীনপন্থী। কেউবা মস্কোপন্থী। কিন্তু দেশের সাধারণ মানুষ কি এসব বোঝে? মানুষকে তৈরি না করে কোন ইজমই সফল করা যায় না। পূর্ব বাংলার কমিউনিষ্ট দলগুলো যেভাবে এগুচ্ছে তাতে দেশ যদি কোনদিন স্বাধীন হয় তবে ভয়াবহ অন্তুর্বিপ্লব শুরু হয়ে যাবে তাদের মধ্যে । বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সংগ্রামী মানুষের চোখের সামনে আশা আর সাহসের দীপ্ত শিখা হয়ে জ্বলছেন- যুদ্ধক্ষেত্রের বাংকারে, মুক্তি যোদ্ধাদের অন্ধকার গোপন আড্ডায়, বন্দীর কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে একটি নাম, একটি প্রতীক - বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব । 
(চলবে)

পাঠকের মন্তব্য


একই ধরনের লেখা, আপনার পছন্দ হতে পারে

bdjogajog