বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিকল্প হতে পারে নবায়নযোগ্য জ্বালানী

আলতামাস পাশা লেখাটি পড়েছেন 178 জন পাঠক।
 ২০১১ সালের ১১ মার্চ মাসে ভূমিকম্প ও সুনামির সময় জাপানের ফুকুশিমা পারমাণবিক কেন্দ্রের একটি পাইপ ছিদ্র হয়ে প্রায় ১২ টন তেজস্ক্রিয়তা মিশ্রিত পানি র্নিগত হয়েছিল। যদিও ভূমিকম্পের সময় পারমাণবিক রিআ্যক্টরগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবার কথা। কিস্তু সুনামির কারণে জরুরি জেনারেটরসমূহ অকোজো হয়ে যাওয়ায় রিআ্যক্টর শীতলীকরণে ছেদ পড়ায় বিস্ফোরণ ঘটে। এ পানির একটি অংশ প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে প্রবাহিত হয়েছিল। পরিবেশ সচেতন মানুষ মাত্রই এ বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত। বর্তমানে বিশ্বের সর্বত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধের জন্য জোড়ালো দাবি উঠেছে। জার্মানীসহ বিশ্বের বহু দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে এসব কেন্দ্র বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বিকল্প জ্বালানি যেমন সৌরশক্তি, বায়ু শক্তি এবং জিও থার্মাল শক্তির ব্যবহার বাড়ছে। তবে আশ্চয্যের বিষয় বিশ্বের এরূপ অবস্থায় পরিবেশগত ঝুঁকিপূর্ণ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে  বাংলাদেশ সম্প্রতি রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি করেছে। রাশিয়ার পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরির প্রযুক্তি রয়েছে। তবে সে প্রযুক্তিগত জ্ঞান সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত নয়। কারণ তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়ায় ১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল চেরনোবিল পারমাণবিক কেন্দ্রের দুর্ঘটনার কথা এখনও আমাদের স্মৃতি থেকে মুছে যায় নি। আজও তার বিরূপ প্রভাব ৩৬ বছর পরেও উক্ত এলাকায় বিদ্যমান।

উল্লেখ্য যে, ২০১১ সালের ২ নভেম্বর বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সংক্রান্ত এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি অনুযায়ী এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি তৈরি করছে রাশিয়ার  রোসাটোম স্টেট অ্যাটমিক এনার্জি কর্পোরেশন। বাংলাদেশের পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে ১০০০ মেগাওয়াটের দুটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করবে। বলা হচ্ছে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকায় কোন ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভবনা নেই।  এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের দুটি স্বতন্ত্র ভিভিআর ইউনিটের মোট ক্ষমতা হবে ২,৫০০ এমডব্লিউ। প্রথম ইউনিটটি কার্যকারিতায় যাবে আনুমানিক ২০২৩ সালে এবং দ্বিতীয়টি ২০২৪ সালে। প্রতিটি ইউনিটের আয়ুষ্কাল হবে ৮০ থেকে ৯০ বছর। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কোন প্রক্রিয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোন তথ্য পাওয়া যায় না। শুধু বলা হচ্ছে এতে সর্বাধুুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। যতদূর তথ্য পাওয়া যায় তা থেকে বলা যায় যে,  রোসাটোম কর্তৃক ব্যবহারকৃত সর্বাধুনিক প্রযুক্তি হচ্ছে ভিভিইআর-১০০০ যা প্রকৃতপক্ষে pressurized water reactor (PWR) এর একটি আধুুনিক রূপ। আর  রোসাটোম এর পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে এই প্রযুক্তিতে কোন ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার কোন সম্ভবনা নেই। এটি ১০ মাত্রার ভূমিকম্প এবং ভারী যাত্রীবাহী বিমানের আঘাতও সহ্য করার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু পরিবেশবাদী সংগঠস গ্রীনপিসের তথ্য মতে ভিভিইআর-১০০০ সিরিজের নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট এর বেশ কিছু কারিগরি ক্রটি রয়েছে এবং এই ধরনের বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভারী যাত্রীবাহী বিমানের আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন করা হয়েছে।

জানা যায় যে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় আগামী দশকে আরো এধরনের পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এক্ষেত্রে পরিবেশগত বিষয়গুলো সরকার বিবেচনায় নিয়েছে কী না তা দেশের মানুষের কাছে এখনও স্পষ্ট নয়। পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার ও পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র সম্পর্কে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ তেমন অবগত নয়। তাই সরকারের উচিত যেকোন চুক্তির পূর্বে দেশের সাধারণ জনগণকে বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো। কিন্তু নানা কারণে মানুষ এ বিষয়ে খুব একটা অবগত নয়।

প্রথমত, আমাদের মনে রাখতে হবে যে, পারমাণবিক শক্তি অসংগতিপূর্ণ একটি শক্তির আধার। কারণ প্রতিটি নতুন জেনারেশন পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লা চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চেয়ে খরচ অনেক বেশি পড়ে। এমনকি দেখা গেছে যে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বর্তমানের গ্যাস চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চেয়েও অনেক বেশি ব্যয়বহুল। এক্ষেত্রে খরচের হার খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই বিলিয়ন ডলার থেকে ট্রিলিয়র ডলারে রূপ নিয়েছে। আমাদের দেশের মানুষের পক্ষে এ খরচের বোঝা বহন করা অসম্ভব হয়ে যাবে কারণ অনেক বেশি দামে তাদের এই বিদ্যুৎ কিনতে হবে।

দ্বিতীয় আশংকার কারণ হচ্ছে বিজ্ঞানীরা আজও জানেন না কীভাবে নিরাপদে পারমাণবিক বর্জ্য পরিবহণ, সুবিন্যাস্ত বা সংরক্ষণ করে রাখা সম্ভবপর হবে। বর্তমানে সারা বিশ্বব্যাপী ব্যবহার করা পারমাণবিক চুল্লির রড জমা করে রাখা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাভাদার উটাকা পর্বতের মাটির গভীরতম অংশে গর্ত করে বিশেষভাবে পারমাণবিক চুল্লির রড বা বর্জ্য পুঁতে রাখা হয়েছে। মাটিার নীচের এই গর্ত বা ভল্টে ১০,০০০ বছরেও কোন লিক বা ছিদ্র হবে বলে না বলে দাবি করা হলেও খোদ মার্কিন পরিবেশ সংরক্ষণ এজেন্সি বলেছে যে মাটির নীচের এই ভল্টে ছিদ্র বা লিক হবার আশংকা তীব্র হয়ে উঠছে। এছাড়া ২০০১ সালে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি এজেন্সির পরিচালিত গবেষণায় বলা হয়েছে যে ইউরেনিয়ামের উৎস কমে আসছে। সম্ভবত ২০২৬ সালের মধ্যে তা চাহিদাপূরণের ক্ষমতা হারাবে।

সবচেয়ে চিন্তার কারণ দুটি পারমাণবিক স্থাপনা থেকে যে বর্জ্য উৎপন্ন হবে তার স্থানান্তরণে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। যদিও বলা হচ্ছে বাংলাদেশের রূপপুরে যে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি স্থাপিত হবে তার বর্জ্য রাশিয়া নিয়ে যাবে। তবে সে দেশে বর্জ্য নিয়ে যাবার আগ পর্যন্ত তা কোথায় রাখা হবে সে সম্পর্কে আমরা সঠিক কোন তথ্য জানি না। রাশিয়া তা সমুদ্র পথে নিয়ে যাবার সময় বঙ্গোপসাগরেই যেকোন লিকেজ হবে না তার নিশ্চয়তা কে দেবে? ইত্যাদি প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়।

বর্তমান বিশ্বে পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্রগুলো সন্ত্রাসী আক্রমণের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় ২০০৫ সালে এ রকম একটি প্রচেষ্টা ব্যর্থ করা হয়েছিল। এছাড়া বলা হয়ে থাকে যে, পারমাণবিক বিদ্যুৎ শক্তি কেন্দ্রগুলো আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর শীতল লড়াইয়ের প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট। বর্তমান গনতান্ত্রিক বিশ্বে এর কোন প্রয়োজন নেই। আমাদের এখন খুঁজতে হবে আরো পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি। ভাবতে হবে পুনঃব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি নিয়ে। যেমন, সৌরশক্তি, বায়ু, জিওথার্মাল, পানি এবং জৈবপ্রযুক্তি। নবায়নযোগ্য শক্তি বা নবায়নযোগ্য জ্বালানি হলো এমন শক্তির উৎস যা স্বল্প সময়ের ব্যবধানে পুনরায় ব্যবহার করা যায় এবং এর ফলে শক্তির উৎসটি নিঃশেষ হয়ে যায় না। এটি পরিবেশ বান্ধব এবং কার্বন নিঃসরণ মুক্ত। জলবায়ু পরিবর্তন মেকাবিলা এবং একটি টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থায় পৌঁছানোর জন্য জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাপী পরিবেশবাদী আন্দোলনসমূহ নবায়নযোগ্য শক্তিব্যবহারে উৎসাহ অব্যাহত রেখেছে। 

বর্তমান বিশ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জার্মানি, রাশিয়া, ভারত বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে বেশি নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করছে।। আমাদের ভবিষ্যৎ জ্বালানি শক্তি আসবে সূর্য থেকে ইউরোনিয়াম থেকে নয়। বিশ্বের সব থেকে বড় জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে রয়েছে চীনে। ভারতে পৃথিবীর সব চেয়ে বড় সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট রয়েছে যা ৬৪৮ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন। জার্মানিতে সব চেয়ে বেশি সোলার প্যানেল বসানো হয়েছে। নর্ডিকদেশসমূহ নবায়নযোগ্য শক্তিবান্ধব আইন প্রণয়নের মাধ্যমে এর প্রসার ঘটাতে সাহায্য করছে। বর্তমান বিশ্বে ক্রমাগত গবেষণা এবং রাষ্ট্রীয় সহযোগিতার ফলে নবায়নযোগ্য সৌর বিদ্যুতের দাম কমে এসেছে এবং তা ইতোমধ্যেই কয়লা থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের সমান দামে বিক্রি হচ্ছে। নবায়নযোগ্য শক্তির পরিবর্তনশীলতার কারণে মানানসই ব্যাটারি  ব্যবস্তার  দ্রুত উন্নতি হচ্ছে এবং অনেক দেশই স্মার্ট -গ্রিড পদ্ধতি স্থাপন করছে।
বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারে অগ্রগতির ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান হতাশাজনক। এক্ষেত্রে দেশে বিপুল সম্ভাবনা থাকা পরেও তা ব্যবহার করা হচ্ছে না। সরকারি পর্যায়ে একদিকে জীবাশ্ম জ্বালানির দিকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে বেসরকারি উদ্যোগগুলোও যথাযথ দক্ষতা প্রমাণে ব্যর্থ হচ্ছে। 

তাই বাংলাদেশের আবহাওয়া ও বাণিজ্যিক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যতা রেখে প্রকল্প পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। ভারত, দুবাই, ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়াসহ মতো উন্নয়নের চিন্তা করতে হলে সৌর জ্বালানির ব্যবহারের উপর আমাদের গুরুত্ব দিতেই হবে। সরে আসতে হবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো ব্যয়বহুল প্রকল্প  থেকে। প্রয়োজন ও বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিতে হবে যুক্তির ভিত্তিতে। জেদ ও আবেগ দিয়ে নয়। যদিও চলমান পারমাণবিক প্রকল্পের কাজ আমাদের এগিয়ে নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই, তবে ভবিষ্যতের কথা ভেবে এধরণের প্রকল্প থেকে আমাদের সরে আসতে হবে।

আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশ ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় অবস্থিত। ইদানিং দেশে বিদেশে ভূ-বিজ্ঞানীরা আশংকা করছেন যে বাংলাদেশ ও তার  সন্নিহিত অঞ্চলে একটি বড় ধরনের বিধ্বসী ভূমিকম্প আসছে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া একটি বড় ধরনের বিধ্বসী ভূমিকম্পের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। যেকোনো সময় এ ভূমিকম্প হতে পারে। গবেষণা ও জরিপের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত ছাড়াও গত কিছুদিন ধরে এ অঞ্চলে ঘন ঘন সংঘটিত ছোটমাপের ভূমিকম্পগুলো তারই ইঙ্গিত বহন করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশী এবং বিদেশী বিশেষজ্ঞদেরও অভিমত এমনি ধরনের। ভূমিকম্পপ্রবণ একটি এলাকায় এরূপ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন অবশ্যই ঝুঁকিপূর্ণ। যতরকমের আধুনিক সতর্কতা মেনেই এই কেন্দ্র বানানো হোক না কেন সব জেনেশুনে কেন আমরা ঝুঁকির মুখে যাবো? বরং সৌর শক্তি ব্যবহার জনপ্রিয় করতে, সহজ করতে, সৌর প্যানেল বসানোর খরচ কমিয়ে আনতে কেন আমরা চেষ্টা করবো না? আজ তাই সময় এসেছে পারমাণবিক শক্তিকে না বলার আর বিকল্প জ্বালানি তথা নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে চিন্তাভাবনা করার।

পাঠকের মন্তব্য


একই ধরনের লেখা, আপনার পছন্দ হতে পারে

bdjogajog