বাতওয়ালের ক্ষুধা (ধারাবাহিক সায়েন্স ফিকসন বা বিজ্ঞান কল্প কাহিনী)

আলতামাস পাশা লেখাটি পড়েছেন 148 জন পাঠক।
 নবম পরিচ্ছেদ

এখন শীতকাল। নভেম্বর শেষ হয়ে ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ চলছে। সকাল বেলায় এদিকে বেশ কুয়াশা পড়ে। প্রফেসর রব্বানী ধূমায়িত চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বন বিভাগের বাংলোর বারান্দায় দাঁড়িয়ে। ঘন কুয়াসায় চারপাশে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। রশিদ গাইনের আজ আশার কথা ছিল হিরণ পয়েন্ট থেকে। সেখানে বিনা অনুমতিতে কারা যেন হরিণ শিকার করেছে। বিস্তারিত অনুসন্ধানে রশিদকে দু’জন ফরেস্ট নিরাপত্তা গার্ডসহ পাঠনো হয়েছে।  খবরটা শুনে প্রফেসর রব্বানীও ভাবছিলেন স্পট অনুসন্ধানে যাবেন কি’না। কারণ হিরণ পয়েন্টে নদীর চওে কুমির আর হাঙ্গও আজকাল বেশ স্বচ্ছন্দে বিচরণ করে বেড়ায়। বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী বিস্তীর্ণ ভূ-খন্ড জুড়ে বিস্তৃত ভূ-খন্ড জুড়ে বিস্তৃত দুর্গম অরণ্য সুন্দরবন তার মতো ঘর ছাড়া মানুষের জন্য চির রহস্যময় জায়গা। সারা বনাঞ্চল জুড়ে মাইলের পর মাইল বৃক্ষরাজির দেয়াল আর অথৈ পানির নিত্য জোয়ারভাটা খেলা চলে এখানে। চা পান করতে করতে প্রফেসর রব্বানীর মনে হয় হিরণ পয়েন্টের আরেক নাম ছিল, ‘নীলকমল’। নীলকমল নামটা শুনলেই রূপকথার কম্পিউটার সিডির ঠাকুরমার ঝুলির কথা মনে হয়। বাংলাদেশের মায়েরা ১৮ শতাব্দীতে তাদের বাচ্চাদের ঠাকুরমার ঝুলির নানা গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়াতেন। আর আজ বাচ্চারা সিডিতে বা স্মার্ট ফোনে ঘুমের গল্প গল্প দেখতে দেখতে ঘুমায়। সভ্যতার অগ্রগতি কি এভাবেই ঘটে? প্রফেসর রব্বানীর খুব ইচ্ছে হিরণ পয়েন্টে গিয়ে দেখে আসা কারা সংরক্ষিত বনে বাঘ শিকারে সাহস পাচ্ছে। ঠিক করলেন রশিদ গাইন ফিরে আসলেই তিনি রওয়ানা দিবেন তার সাথে। সেই কবে বহুদিন আগে তিনি গিয়েছিলেন সুন্দরবনে। তারপর আর খবর রাখতে পারেন নি এই এলাকার।

আজ বহুদিন পরে প্রফেসর রব্বানী আবার চলেছেন সুন্দর বনে। সঙ্গে রয়েছে রশিদ গাইন। একজন দক্ষ গাইড সে। লেসার ট্রেসার দিয়ে হরিণ শিকারী  দলের সন্ধান চালানো হবে।  জানা গেছে এ দলটি খুব শক্তিশালী লেসার গানে সজ্জিত। তাছাড়া এরা একটি আন্তঃমহাদেশীয় সন্ত্রাসী দলের সঙ্গেও যুক্ত। সংরক্ষিত বন রক্ষীরা জানিয়েছে যে, সুন্দরবন এলাকার নিকটবর্তী লোকালয় আর বনাঞ্চল বেশ অনেকদিন থেকেই সন্ত্রাসী তৎপরতায় জিম্মি হয়ে রয়েছে। দুর্ধর্ষ এ সন্ত্রাসরা নাকি সুন্দরবন সংলগ্ন বেশ ক’টি জনবসতি থেকেই গৃহপালিত বিভিন্ন প্রজাতির পশু-পাখি নিয়ে যায় আর বড় বড় দুর্লভ প্রজাতির গাছ কেটি নদীপথে পাচার করে দেয়। 

প্রফেসর রব্বানীরা বন বিভাগের অফিসে উঠেছেন। চারপাশটা গাছগাছালিতে ভরা। শান্ত, সিগ্ধ পরিবেশে হরিণ চরে বেড়াচ্ছে। গাছের ডালে ডালে বানরদেও দৃষ্টিকাড়া ছেলেমানুষী খেলা। অথচ মানুষগুলো আজও পশুর চেয়েও হিংস্র এবং বর্বর। প্রফেসর সাহেব তার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় দেখেছেন বনের খুব হিংস্র  প্রাণীটিও ভয়ংকর বিপদে না পড়লে বা ক্ষুধার্ত না হলে কখনও মানুষ বা অন্য কোন প্রাণীকে হত্যা করে না।

একটু আগে রশিদ গাইন জানিয়ে গেল যে সংন্ত্রাসী দলটিকে সর্বশেষ দেখা গেছে দুবলার চরে। চর সংলগ্ন বনেই চিত্রা হরিণের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র। আরো বনরক্ষী চেয়ে খুলনা জেলা প্রশাসনের কাছে জরুরি বার্তা গেছে।  বন বিভাগের বারান্দায় বসে আছেন প্রফেসর রব্বানী। তার মনে পড়লো ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত দুবলার চরে জেলেরা তিন মাস ধরে মাছ ধরে, প্রায় ২০/  হাজার একত্রে বসবাস করে। সারাদিন ধরে সাগরের বুকে মাছ ধরে তারা জেলে পল্লীতে ফিরে আসে। রাস পূর্ণিমায়  এখনও সাগর স্মানে হাজার হাজার পুণ্যার্থীর সমাগম ঘটে। কলেজে পড়ার সময় এখানে মেলা দেখতে এসেছিলেন প্রফেসর রব্বানী। একটু বুঝিবা অবাক লাগে তার কাছে! আজ ক’দিন থেকেই পুরাতন স্মুতিগুলো এতো বেশি মনে আসছে  কেন? কোথায় কি হচ্ছে ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না তিনি। আসলে কোন কাজেই তার মন বসছে না। কেন জানি অস্থিও লাগছে সারাক্ষণ। দুপুরের মধ্যেই অস্থিরতার কারণ খুঁজে পেলেন প্রফেসর রব্বানী।

কটকা আর টাইগার পয়েন্টে যে তটরেখা ও সমুদ্রস্ফীতি পর্যবেক্ষণকারী কেন্দ্রটি আছে তার সম্প্রসারিত কাজ হচ্ছে ওজান স্তর ও অতিবেগুনি রশ্নির বিকিরণ মনিটরিং করা। সেন্টারটি ২০০০ সাল থেকেই ‘ন্যাশনাল ওশেনিক এন্ড অ্যাটমোসফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা নোয়া’র সরাসরি নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে। পৃথিবীর কক্ষপথে ঘূর্ণায়মান উপগ্রহ ক্রিমবাস-৭ টোটাল ওজোন ম্যাপিং স্পেকট্রোমিটার পদ্ধতিতে গৃহীত নানা পরিমাপে ওজোন স্তর ক্ষয়ের মনিটরিং করা হয়ে থাকে। অদ্ভূত ব্যাপার হচ্ছে এই এলাকাতেই না‘কি মানুষখেকো বাঘের সন্ধান মিলেছে। তবে বাঘটি না‘কি এখন পর্যন্ত কেউ-ই দেখতে পায়নি। অবশ্য পর্যবেক্ষণ কেন্ত্রেও কাছাকাছি অবস্থানকারী স্থানীয় পাঁচজন বাওয়ালি প্রাণ হারিয়েছে।  তাদের দেহাবশেষ পাওয়া গেছে আধ খাওয়া অবস্থায়। অতত্রব রশিদ গাইনের ডাক পড়েছে আবারো। শখের শিকারি প্রফেসর রব্বানীও রয়েছেন তার সঙ্গে। ঠিক হয়েছে আগামীকালই তারা খুব ভোওে কটকা রওয়ানা হবেন।

পাঠকের মন্তব্য


একই ধরনের লেখা, আপনার পছন্দ হতে পারে

bdjogajog