পাড়াগাঁ থেকে আগামীর স্বপ্ন এবং নতুন সমাজ গড়ার আলোক শিখার প্রজ্বলন হোক

আলতামাস পাশা লেখাটি পড়েছেন 92 জন পাঠক।
 আমাদের গ্রামের মেয়েরাই পারবে। গ্রামের মেয়েরাই পেরেছে। আমরা শহরে বসে, বিদেশে অবস্থান করে যখন কপালে টিপ পড়া নিয়ে, পহেলা বৈশাখে লাল পাঞ্জাবী পরা নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত, তখন পাড়াগাঁয়ের মানুষের রক্ত চক্ষু উপেক্ষা, সমালোচনা, নিন্দার থোরাই কেয়ার করে নিজেদের স্বপ্নপূরণ তথা দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে চলেছে  দিনমুজুর আর কৃষকের কন্যা শিখা, স্বপ্না আর তানিসা।

ময়মনসিংহের নান্দাইলের মেয়ে এরা। বর্তমানে ক্রিস্টিয়ানা রোনালডোর দেশ পর্তুগালে যাচ্ছে ফুটবলে উচ্চতর প্রশিক্ষণে। সম্প্রতি যুব ও ক্রীড়া  মন্ত্রণালয়ের  অধীনে জাতীয় ক্রীড়া অধিদপ্তর বঙ্গমাতা নারী ফুটবলের সেরা ৪০ জন খেলোয়ারকে নিয়ে বিকেএসপিতে দু‘মাসের ক্যাম্প করে। সেই খেলোয়ারদের মধ্যে থেকেই গড়া একটি দলে স্থান পেয়েছে এই ৩টি মেয়ে।

পাসপোর্ট ভিসার আনুষ্ঠানিকতা শেষ। আগামী জুলাই মাসে যাবে এরা রোনালডোর দেশ পর্তুগালে। নান্দাইলের তিন গ্রামে এখন মাতামাতি। তবে আজ এদের এই স্থানে আসার পথটি মধুর ছিল না অবশ্যই। সামাজিক, ধর্মীয়, আর্থিক অনেক প্রতিকূলতা তাদের অতিক্রম করতে হয়েছে।

রাজবারিয়া গ্রামের মেয়ে শিখার মা নেই। বাবাও আবার বিয়ে করে ভিন্ন সংসার পেতেছেন। তবে মেয়ের সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে। কন্যার খেলার বাসনাকে তিনি বাধা দেননি বরং যৎসামান্য সাহায্য সহযোগিতাও করছেন। বিরল উদাহরণ তাই নয় কি? যে বাল্যবিবাহের পরিসংখ্যান দিতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন এনজিও এবং বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রতিদিন মিডিয়াতে বয়ান দেন, সেই দেশেই কিনা শিখা,  স্বপ্না এবং তানিসারা সমাজকে নিজেদের ক্ষুদ্র শক্তি দিয়ে রুখে দাঁড়ায়। শিখার গরিব নানী নাতনী বিয়ের কথা না ভেবে, তার ফুটবল খেলার অদম্য ইচ্ছা সফল করতে আপ্রাণ চেষ্টা করেন। সমাজের ভ্রুকুটি তাদের দামাতে পারেনি। হাঁসমুরগি লালনপালন করে নাতনীর ফুটবল শেখার খরচ যুগিয়েছেন তিনি। ডিম বিক্রির টাকায় প্রতিদিন জেলা সদরে পাঠিয়েছেন প্রশিক্ষণে। একজন স্ট্রাইকার হিসেবে শিখা আমাদের এই ভঙ্গুর সমাজকে নাড়িয়ে দিতে পারবে কি?

ইলাশপুর গ্রামের মেয়ে স্বপ্নার বাবা কৃষি কাজ করেন। প্রতিদিন ৬০ টাকা খরচ করে মেয়েকে পাঠিয়েছেন সদরে ফুটবল খেলতে। স্বপ্নার মায়ের আরও ৬টি সন্তান থাকলেও মেয়েকে খেলা থেকে তিনি বিরত রাখেননি। গোল কিপার স্বপ্না আমাদের ঝুঁকিপূর্ণ নারীদের গোলপোস্ট শেষ পর্যন্ত রক্ষা করতে পারবে তো?

কুতুবপুর গ্রামের দিনমজুরের মেয়ে তানিসা খেলেন রক্ষণভাগে। নারী ফুটবলে দলকে আগলে রাখার দৃঢ়তায় এই বহুধা বিভক্ত সমাজকে সে আগলে রাখতে পারবে কি?

এখানে অবাক করা বিষয় হচ্ছে সমাজের প্রান্তিক এই মা-বাবা-নানীরা কখনও তাদের মেয়ে বা নাতনীর আশা আকাঙ্খাকে, ইচ্ছা বা শখকে বাধা দেন নি। মেয়েকে কখনও বলেননি যে সে আর খেলতে পারবে না। মেয়েদের খেলতে হয় না। এটা পাপ কাজ। অথ্যাৎ মন-মানসিকতায় তারা তথাকথিত শহুরে শিক্ষিতদের থেকে কতখানি মুক্ত চিন্তার অধিকারী। অযথা তারা বিতর্কে যান নি। নিজেকের চিন্তা চেতনায় স্বচ্ছ থেকেছেন। সমাজের বাধা আসবেই। সে বাঁধা রুখে দেবার মানসিক শক্তিও থাকতে হবে। বাল্যবিবাহের এই দেশে যেখানে এতদিনে শিখা, স্বপ্না অথবা তানিসার বিয়ে হয়ে যাবার কথা, সেখানে তারা ফুটবল খেলার প্রশিক্ষণে পর্তুগাল যাচ্ছে।

ঢাকা শহরে বসে আমরা প্রগতিশীলমনারা, রাজনৈতিকভাবে সচেতনরা যখন অসাম্প্রদায়িক দেশ, ধর্মান্ধতা ইত্যাদি বিষয়ে বড় বড় বুলি আওড়াচ্ছি বিভিন্ন টকশো আর সেমিনারে এবং ওয়েবিনারে, বিতর্কের ঝড় বইয়ে দিচ্ছি, তখন নিভৃত প্রত্যন্ত গ্রামের কৃষক. দিনমজুর, গৃহবধূঁরা তাদের প্রগতিশীলতার নজির রেখে চলেছেন। অথচ তারা এসব গাল ভরা কথা- প্রগতিশীলতা, অসাম্প্রদায়িকতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, নারীবাদ, নারী স্বাধীনতার বস্তা পচা কথার ধার ধারেন না, এসব তাত্ত্বিক রাজনৈতিক কুটিলতা সমৃদ্ধ কথা বোঝেনও না ভালো মতো। এর পিছনের অন্তর্নিহিত কারণ কী থাকতে পারে? এ ধরনের প্রশ্নের অবতারণা আজ নিতান্তই অবান্তর মনে হয়।

আসলে আমরা আজও ভুলে যাই যে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল গণমানুষের যুদ্ধ। গ্রামের গরিব কৃষক, দিনমজুর এরাই করেছিল মুক্তিযুক্ত। এরা না থাকলে গ্রামে গ্রামে মুক্তিযোদ্ধারা অবাধে গেরিলা যুদ্ধ করতে পারতো না। যা হোক, সে আবার অন্য আলোচনা অন্যদিন সময় পেলে করবো।

বাংলাদেশের গ্রামের মানুষ সত্যিকার অর্থে অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল, বাস্তবাদী ও পরিশ্রমী। গ্রামের এসব গরিব মানুষগুলো ধার্মিক, কিন্তু ধর্মান্ধ নয়। মহলবিশেষ নিজ স্বার্থে রাজনৈতিক ফাঁয়দা লুটতে তাদের ধর্মান্ধ বানাতে চায় বটে, তবে চরিত্রগত ভাবে তারা কখনই ধর্মান্ধ নয়। প্রচলিত ধ্যান-ধারনার বিরুদ্ধে দাঁড়াবার যে দৃঢ়তা আমাদের কৃষক-শ্রমিক দিনমজুরের রয়েছে তা ঢাকা শহরের প্রগতিশীল নারী-পুরুষ পরিচয়ধারী গবেষক, কলামিস্ট, সাংবাদিকদের নেই বললেই চলে।  ফেসবুকে দেখা যায়, বিভিন্ন বিষয়ে মতামত ও ধ্যান-ধারনা দিয়ে মানুষকে প্রতিনিয়ত বিভ্রান্ত করছে এসব প্রগতি এবং নারীবাদের ধ্বজাধারী মানুষরা। দাতা সংস্থার অনুদানে চলা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিনিয়ত বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত দিয়ে প্রকৃত চিত্রকে আড়াল করে দিতে চায়। কিন্তু আজ বাংলাদেশের প্রকৃত চিত্র খুঁজতে হলে প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে যেতে হবে। সেখানকার কিশোরকিশোরী, তরুণ-তরুণী আর তাদের দরিদ্র মা বাবার অগ্রসরমান চিন্তাচেতনাকে বুঝতে হবে এবং যথাযথ সম্মান ও মূল্যায়ন করতে হবে।

মনে রাখতে হবে শহুরে সুবিধাভোগী তরুণ-তরুণীর চেয়ে পাড়াগাঁয়ের তরুণ-তরুণীরা অনেক বেশি দেশপ্রেমিক, দৃঢ়চেতা এবং সর্বোপরী আশাবাদী। স্বপ্নরা আমাদের আগামী বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখাক। শিখারা আশার আলো জাগিয়ে রাখুক। তানিসারা আমাদের আগামী দিনগুলোকে আগলে রাখুন পরম মমতায় আর সব মুর্খতা, হতাশা এবং ধর্মান্ধতা থেকে।

পাঠকের মন্তব্য


একই ধরনের লেখা, আপনার পছন্দ হতে পারে

bdjogajog