অনুমিত দুর্ভিক্ষ নিয়ে কেন আতংক ছড়ানো হচ্ছে?

আলতামাস পাশা লেখাটি পড়েছেন 126 জন পাঠক।
 কেন বিশ্বব্যাপী রব উঠেছে দুর্ভিক্ষের?খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহে লাইনে ব্যাপক বিশৃংখলার সৃষ্টি হয়েছে একথা সত্য।ইউরোপের রুটির বাস্কেট হিসেবে খ্যাত ইউক্রেন। রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের কারণে বিশ্বের সেরা গম উৎপাদনকারী দেশটি খাদ্য উৎপাদনে যেমন পিছিয়ে পড়েছে, তেমনি খাদ্য সরবরাহ লাইনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যদিও বিশ্বের  গম উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে ইউক্রেন উৎপাদন করে মাত্র ৩.১ মিলিয়ন গম আর চীন হচ্ছে বিশ্বের বৃহত্তম গম উৎপাদনকারী দেশ। বিশ্বে যদি ব্যাপক আকারে দুর্ভিক্ষের সূচনা হয় তখন চীন, ভারত, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র সম্মিলিতভাবে তা মোকাবিলা করবে কিনা তাতে সন্দেহ রয়েছে।ধান উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। ব্রাজিল ছাড়া বাদবাকী সব ধান উৎপাদনকারী দেশের অবস্থান এশিয়ায়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে দুর্ভিক্ষের সময় ধান উৎপাদনকারী দেশগুলো বাংলাদেশকে আদৌ ধান বিক্রি করবে কি? যদিও বাংলাদেশ উৎপাদন করে বিশ্বের মোট উৎপাদনের ৫৪.৬ মিলিয়ন টন। বিপর্যয়ের সময় বাংলাদেশের মোট ধান উৎপাদন যদি বাধাগ্রস্ত না হয়, প্রাকৃতিক বিপর্যয় যদি না আসে তা’হলে বাংলাদেশ হয়তো অন্যের সাহায্য ছাড়াই দুর্ভিক্ষের অবস্থা্ কাটিয়ে উঠবে।

তবে প্রশ্ন হলো বিভিন্ন সংস্থার যেসব আগাম দুযোর্গবার্তা তা কতখানি আমলে নেওয়া যাবে। আদৌ নেওয়াটা উচিত হবে কিনা? কমপিউটারে পরিসংখ্যানমূলক মডেলিং এর মাধ্যমে যেসব আগাম বার্তা দেওয়া হয় তা কোন সময়ই সঠিক হয় নি। এগুলো হচ্ছে বিভিন্ন সময়ের উপাত্তের ভিত্তিতে একটি প্রজেকসন বা অনুমান। এক্ষেত্রে সবসময়ই “যদি” শব্দটির প্রয়োগ বেশি দেখা যায়। আসল কথা হলো মানুষ বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে পারবে কিনা তা নিশ্চিতভাবে যেমন না বোধক নয়, তেমনি হ্যা বোধকও নয়। ইতিহাস থেকে দেখা যায় মানব সভ্যতা খারাপ অবস্থা কাটিয়ে উঠেছে, উঠবে। কিন্তু খাদ্য নিয়ে, জ্বালানি ‍নিয়ে যে বিশ্ব রাজনীতি তা আজ কোন পথে চলছে সেটাও বিবেচনায় নিতে হবে।

কেন দুর্ভিক্ষের কথা হচ্ছে?

বিশ্বজুড়ে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষ যখন দিশেহারা তখন আরো খারাপ খবরের আভাস মিলছে। ২০২৩ সালে সম্ভাব্য খাদ্য ঘাটতির আশংকায় এখনই নানা ধরনের সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতেও খাদ্য সংকট জোরালো হবার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

জাতিসঙ্ঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) এরই মধ্যে সতর্ক করে বলেছে যে ২০২৩ সালে বিশ্বের ৪৫টি দেশে তীব্র খাদ্য ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এবং ২০ কোটি মানুষের জন্য জরুরি সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে।

এফএও এবং ডব্লিউএফপির যৌথ রিপোর্টে বলা হয়েছে, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে দুর্ভিক্ষের আশংকা প্রবল। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ইথিওপিয়া, নাইজেরিয়া, সোমালিয়া ও সাউথ সুদান। এছাড়া ইয়েমেন ও আফগানিস্তানেরও একই দশা। এর পাশাপাশি এশিয়া ও আফ্রিকার আরো কিছু দেশ আছে যেখানে তীব্র খাদ্য ঘাটতি হতে পারে বলেও রিপোর্টে উঠে এসেছে।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির নির্বাহী পরিচালক ডেভিড বেসলে সম্প্রতি এক বক্তব্যে বিশ্বজুড়ে খাদ্য ঘাটতির আশংকা প্রকাশ করেছেন। এজন্য তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অস্থিরতা ও যুদ্ধ-বিগ্রহকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেছেন, পৃথিবীর ৪৫টি দেশ এখন ‘দুর্ভিক্ষের দরজায় কড়া’ নাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন রিলেশন্স কমিটির সামনে এক বক্তব্যে ডব্লিউএফপি নির্বাহী পরিচালক বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খাদ্য উৎপাদন কমে যাবে এবং এর একটি বড় কারণ হবে যুদ্ধ এবং সারের সংকট। ‘এটা এমন এক ধরনের সংকট হতে যাচ্ছে যা আমরা জীবদ্দশায় দেখিনি,’ বলেন বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির প্রধান।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক তাদের রিপোর্টে বলেছে, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে সারের ব্যাপক সংকট তৈরি হয়েছে। এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে আফ্রিকা মহাদেশে খাদ্য উৎপাদন ২০ শতাংশ কমে যাবে।

চলতি বছরের জুন মাসে জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, ২০২২ সালে কয়েকটি দুর্ভিক্ষ ঘোষণার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে এবং ২০২৩ সালে সেটি আরো খারাপ হতে পারে। বিশ্বজুড়ে খাদ্যমূল্য কিছুটা কমেছে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে সংকট শেষ হয়ে যাচ্ছে। যেসব কারণে খাদ্যদ্রব্যের ঊর্ধ্বগতি হয়েছে সেগুলো এখনো বিদ্যমান আছে।
 
কেন এই অবস্থা?

চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি এবং জাতিসঙ্ঘের খাদ্য ও কৃষি বিষয়ক সংস্থা যে যৌথ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সেখানে কয়েকটি কারণ তুলে ধরা হয়েছে।
প্রথমত, যুদ্ধ ও নানাবিধ সংঘাত খাদ্য ঘাটতির জন্য একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়াবে। পৃথিবীতে যত মানুষ খাদ্য সংকটে ভুগছে তার মধ্যে ৬০ শতাংশ বসবাস করে যুদ্ধ-বিগ্রহকবলিত এলাকায়। ইউক্রেন যুদ্ধ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে যুদ্ধের কারণে খাদ্য ঘাটতি কতটা খারাপ হতে পারে। এই যুদ্ধ চলতে থাকলে পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে।

দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, জলবায়ুজনিত। পৃথিবীর অনেক দেশ হয়তো বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে, নয়তো খরায় ভুগছে। এর ফলেও খাদ্য উৎপাদন ব্যহত হবার আশংকা রয়েছে।

তৃতীয়ত, করোনাভাইরাস মহামারী বিশ্ব অর্থনীতিতে যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে সেটি এখনো কাটিয়ে উঠা সম্ভব হয়নি। জীবনযাত্রার ব্যয় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টিও খাদ্য ঘাটতির কারণ হতে পারে।

খাদ্যদ্রব্যের দাম যে হারে বাড়ছে তাতে অনেকের জন্য খাদ্য কেনা কঠিন হয়ে যাবে। যেমন বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, ২০১৯ সালের তুলনায় এখন তাদের পরিচালনা ব্যয় যতটা বেড়েছে সেটি দিয়ে তারা প্রতিমাসে ৪০ লাখ মানুষকে খাওয়াতে পারতো। খাদ্য উৎপাদন কমে যাওয়ার যে আশংকা করা হচ্ছে, তার পেছনে আরেকটি কারণ হচ্ছে কৃষি উৎপাদনের জন্য সার ও ডিজেলের মতো উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়া।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির প্রধান অর্থনীতিবিদ আরিফ হুসেইন সম্প্রতি ফিনান্সিয়াল টাইমস পত্রিকাকে বলেন, ‘এখন সারের দাম বেশি এবং অনেকে কিনতে পারছেন না। এ বিষয়ে নজর দেয়া না হলে আগামী বছর সার পাওয়াই যাবে না’।

কৃষ্ণ সাগর দিয়ে ইউক্রেনের খাদ্যশস্য বিশ্ববাজারে রফতানির জন্য গত জুলাই মাসে জাতিসঙ্ঘ ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চুক্তি হয়েছিল। তবে রাশিয়া অভিযোগ করছে তারা তাদের শস্য ও সার বিশ্ববাজারে রফতানি করতে পারছে না। এটা অব্যাহত থাকলে এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে রাশিয়া।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেছে, খাদ্য ও সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ৪৮টি দেশকে অতিরিক্ত ৯ বিলিয়ন ডলার খরচ করতে হবে।

উল্লেখ্য যে, কৃষিজ উৎপাদ ইউরোপের অন্য দেশগুলোর মধ্যে ইউক্রেনের অবস্থান হচ্ছে সবার উপরে।দেশটির প্রধান ফসল হচ্ছে আলু।ইউরোপের অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি আলু উৎপন্ন হয় এখানে।সুগার বিট এবং সূর্যমুখী তেল উৎপাদনে গোটা বিশ্বে ইউ্ক্রেন প্রথম স্থানে। কৃষ্ণ সাগরে রয়েছে দেশটির প্রধান মৎস্যভাণ্ডার।ইউক্রেন জুড়ে গরু, ছাগল, ভেড়া, শূকর, হাঁস-মুরগি এবং অন্যান্য পশুপাখি লালন-পালন করে ডিম-দুধ- মাংসের চাহিদা মেটায় এই দেশটি।পুরো ইউরোপে দেশটির এসব খাদ্য সম্পদের একটি অংশ রফতানি হয়। তাই বিদ্যমান যুদ্ধাবস্থা ইউরোপের স্বাভাবিক খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা যেমন বিপর্যস্ত করছে, তেমনি আন্তর্জাতিক রফতানি বাণিজ্যও ব্যাহত হচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ খাদ্য রপ্তানি বন্ধ করেছে কিংবা রপ্তানি নিরুৎসাহিত করার জন্য শুল্ক আরোপ করেছে। বিশ্বজুড়ে খাদ্য সংকট দেখা দিলে বিভিন্ন দেশ রপ্তানির উপর নিষেধাজ্ঞা আরো জোরালো করতে পারে।

বাংলাদেশে কী  অবস্থা হবে?

এদিকে বাংলাদেশে এবার বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় আমন ধানের ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অন্যদিকে বিশ্ববাজারেও খাদ্যের সংকট আছে। এমন অবস্থায় বাংলাদেশ যদি উৎপাদন বাড়াতে পারে এবং দরিদ্র মানুষকে খাদ্য সহায়তা দিতে পারে তাহলে দেশটি পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে। এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের প্রধানমন্ত্রী আগে থেকেই উৎপাদন বাড়ানোর যে কথা বলছেন সেটাকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, খাদ্য সংকট দেখা দিলেই দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতি হবার জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়।
 
ইতোমধ্যে বাংলাদেশে লাগামছাড়া দ্রব্যমূল্য দরিদ্র মানুষের জন্য বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে। খাদ্যমূল্য যদি অনেক বেড়ে যায় তখন দরিদ্র মানুষ প্রয়োজনীয় খাবারটুকুও কিনে খেতে পারে না। এমন অবস্থা আরও প্রকট হলে দুর্ভিক্ষকে রোধ করা যাবে না। তখন অমর্ত্য সেনের দুর্ভিক্ষ তথ্যের ফরমূলা হয়তোবা প্রমাণ করে দেবে যে, ‘খাদ্য সংকটে নয়,মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কমে যাওয়াই দুর্ভিক্ষের কারণ’। এই জায়গাটি সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবার সচেতন থাকতে হবে। বাংলাদেশের বিপুল পরিমাণ নিম্ন মধ্যবিত্তের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলেই আলামত রোধ করা যাবে। কেবল আতংক ছড়িয়ে কোনো লাভ হবে না। লক্ষ্য রাখতে হবে খাদ্য মজুদকারীদের উপর। সামর্থবানরা যাতে খাদ্য কিনে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে সে বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি দিতে হবে। 

বাংলাদেশেও বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ বলছেন যে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ খাদ্য রফতানি বন্ধ করেছে কিংবা রফতানি নিরুৎসাহিত করার জন্য শুল্ক আরোপ করেছে। বিশ্বজুড়ে খাদ্য সংকট দেখা দিলে বিভিন্ন দেশ রফতানির উপর নিষেধাজ্ঞা আরো জোরালো করতে পারে। তবে আগামী বছরেও যদি প্রতিকূল আবহাওয়া থাকে এবং বিশ্ববাজারে সংকট অব্যাহত থাকে তাহলে বাংলাদেশের জন্য কঠিন সময়ে আসছে বলে অনেকে মনে করেন।

তবে দুর্ভিক্ষের বিষয়ে যে আতংক ছড়ানো হচ্ছে আসলে তার সবই বিশেষজ্ঞদের অনুমাণ, বিভিন্ন উপাত্ত ও তথ্যের বিশ্লেষণ প্রসুত মতামত। আসলেই কি হবে, কতখানি হবে তা কেউ জানে না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে বিভিন্ন মিডিয়ায় বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকটের খবর যেভাবে আসছে তা কী সাধারণ জনগণের মনে ভীতির সৃষ্টি করছে না? বিশেষত শিশুরা আজকাল ইন্টারনেটের কারণে আসন্ন দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতি সম্পর্কে কম বেশি জানতে পারছে, যা তাদের শিশু মনে অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দিচ্ছে। আমরা কেন আমাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে স্পর্শকাতর বিষয়ে আরো যত্নশীল থাকি না? অনুমাণ করা বিষয়বস্তু সম্পর্কে সংবাদ পরিবেশনায় আমাদের আরো পরিশীলিত এবং পরিমিত বোধের পরিচয় দেওয়া উচিত।

পাঠকের মন্তব্য


Arbab Akanda : Time oriented article

একই ধরনের লেখা, আপনার পছন্দ হতে পারে

bdjogajog