সাম্প্রতিক প্রকাশনা

দুই নগরের উপাখ্যান ( সপ্তম পর্ব)

আলতামাস পাশা লেখাটি পড়েছেন 26 জন পাঠক।
 সপ্তম পরিচ্ছেদ

‘হে মানবমন্ডলী, আগত এবং অনাগতকালে যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা তোমাদের প্রভুর সঙ্গে মিলিত হচ্ছ, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের ধনসম্পদ, এ দিন এবং এ মাসের মতই পবিত্র’।
---------------------------------
বাংলাদেশের মানুষের মৃত্যু সম্পর্কে অভিজ্ঞতা নতুন কিছু নয়। তারা মরে ও বাঁচে নানাভাবে না খেতে পেয়ে মরে। অসুখে বিনাচিকিৎসায় মরে। বন্যায় মরে। সামুদ্রিক ঝড়ে মরে। ’৭১ সালে যুদ্ধে মারা যাবার ঘটনা তো নতুন কিছু নয়। ’৭০ এর ঘৃর্ণি ঝড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা গিয়েছিল। সে সময় বাংলাদেশের উপকূল ভাগে পশু আর মানুষের লাশ এখানে-সেখানে বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে  ছিল বহুদিন। তখনকার পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার বাঙালির মন ও মুখের ভাষা কখনও বুঝতে সক্ষম হয়নি। হেলিকপ্টারে করে পশু ও মানুষের লাশ দেখে জেনারেল ইয়াহিয়া রাওয়ালপিন্ডি ফিরে গেছেন। মজার ব্যাপার হলো পাকিস্তাানের পশ্চিম অংশে খাদ্যশস্যের অফুরন্ত ভান্ডার থাকলেও পূর্ববাংলায় উপকূল এলাকায় খাদ্যবাহী প্রথম জাহাজ এসে পৌঁছায় বিদেশ থেকে।’৭১ এ বাঙালি হত্যা করতে পাকিস্তানী সৈন্য পাওয়া গেলেও ’৭০ সালে পটুয়াখালীতে মৃতদেহ কবরস্থ করার দায়িত্ব পালন করে ব্রিটিশ সৈন্যরা। বিপুল সংখ্যক হেলিকপ্টার পশ্চিম পাকিস্তানে পরে থাকলো আর পূর্ব বাংলায় সাহায্য দিতে হেলিকপ্টার এলো যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং ফ্রান্স থেকে। 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবই পশ্চিম পাকিস্তানে এক ইউনিট ভেঙ্গে ভূস্বামী ও সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার অবসান দাবি করেছেন সবার আগে। অথচ ’৭০ এর সামুদ্রিক ঝড়ের পর পশ্চিম পাকিস্তানের সব বিশিষ্ট নেতা- মওলানা মওদুদী, কাইয়ুম খান, দৌলতানা, নসরুল্লাহ খান একটিবারও পূর্ব বাংলায় উপকূল এলাকায় যাননি। পশ্চিম পাকিস্তানের ভিন্ন ভাষাভাষি সাধারণ মানুষগুলোর সঙ্গে পূর্ব বাংলার মানুষের একটা আত্মার সম্পর্ক হয়তোবা ছিল। জোয়ারের রুটি খাওয়া বেলুচদের সঙ্গে বাংলার গরিব জনতার অদৃশ্য রাঁখি বন্ধন হতে পারতো। কিš ‘পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা বাংলার মানুষ থেকে অনেক -অ--েন-ক দূরে ছিলেন। বাংলার গ্রামে, উপকূলের জেলেদের মাঝে তারা কোনদিন এসে থাকেননি। 

ইসলামী সংহতি ও ভ্রাতৃত্ব ছিল পূর্ব বাংলায় মানুষকে শোষণের হাতিয়ার। পাকিস্তান রাষ্ট্রের সমস্যা ছিল পাঞ্জাবী আধিপত্য নিয়ে। পাঞ্জাব শুধু পূর্ববাংলাকেই নয় পশ্চিম পাকিস্তানের বেলচু,পাঠান, সিন্ধু,উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের মানুষকেও শোষণ করেছে। তাদের আত্ম নিয়ন্ত্রণ অধিকারকে বন্দুকের নল দিয়ে মোকাবেলা করেছে। পাঞ্জাবী আগ্রাসনে পশ্চিম পাকিস্তানের শোষিত মানুষরা রক্তাক্ত হয়েছে বহুবার।

জেনারেল টিক্কা খান। মাত্র কিছু দিন আগে মারা গেলেন। ১৯৬৪ সালে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে প্রথম গণহত্যা চালিয়েছিলেন তিনি। কারণ বালুচরা জোয়ারের রুটি এবং দেশী বন্দুক হাতে আয়ুবশাহীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। বালুচদের গ্রামগুলোতে যাতে আর্মি ঢুকতে পারে সেজন্যে ‘সারভনদ রোড’ তৈরিতে আয়ুব ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন।

১৯৬৩ সালের নভেম্বর মাস। যেসব সরকারি ইঞ্জিনিয়ার ‘সারভনদ রোড’ তৈরি করতে এসেছিল তাদের আক্রমণ করলো বিক্ষুব্ধ বালুচরা। এরপর শুরু হল পাকিস্তানি পুলিশের হিংস্র আক্রমণ। নিরীহ, গরিব গ্রামবাসীদের তারা ধরে নিয়ে গেল। মেয়েদের চুলের ঝুঁটি ধরে মাটিতে আছড়ে ফেললো। ঘরদোর ভেঙ্গে তছনছ করলো। গ্রামে গ্রামে এবার যুদ্ধ শুরু হলো। পাঠান নেতা আয়ুব এবার সৈন্য পাঠালেন বালুচদের ঠান্ডা করতে।

১৯৬৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। ঈদের দিন। ‘কানরানট’ উপত্যকায় ঈদের জামাত হচ্ছে। আকাশে পাকিস্তান ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ফাইটার বোমার। ধর্মপ্রাণ পাকিস্তান সরকার নিজের ধর্মপ্রাণ বিদ্রোহী বালুচ মুসলমানদের ওপর বোমা নিক্ষেপ করতে থাকলো। বোমা ফাটার বুম বুম আওয়াজ, আর্ত চিৎকার আর মৃত দেহে সেই ঈদের জামারাত ভরে গেল।

আবার বোমা হামলা ২৩ ফেব্রুয়ারী ‘সারনায়’। এবার একটা কাফেলার ওপর। ২৬ ফেব্রুয়ারী একইভাবে বোমা ফেলা হল দারামুলাতে। পাহাড়ের আড়ালে আড়ালে বেলুচ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ ঘাঁটি তৈরি হলো।

হালজিতে বোমা ফেলতে এসেছিল দুটো স্যাবার জেট। ‘সানঝের খেল’ পাহাড়ের আড়াল থেকে বেলুচ মুক্তিযোদ্ধারা গুলি করলো সেই বিমান লক্ষ্য করে, আগুন ধরে গেল বিমানে। মাটিতে প্রচন্ড বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ধ্বংস হলো বিমানটি। বেলুচ নেতা গ্রাম্য যুবক ‘সানঝের খেল’ হলো কিংবদন্তী নেতা।

 এবার ১৫ লক্ষ বেলুচকে শায়েস্তা করতে আয়ুর পাঠালেন অষ্টম ডিভিশনের মেজর জেনারেল টিক্কা খানকে। আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত টিক্কা খানের বাহিনী। মার্কিন স্টেনগান, রাইফেল, এম.এন গান এবং লাইট মেশিনগানের গুলিতে অগণিত বেলুচ নারী- পুরুষ শহীদ হল। রক্তে ভিজে লাল হল বেলুচিস্তানের মাটি।

বৃদ্ধ বেলুচ সানাউল্লাহ খান পাকিস্তানী অষ্টম ডিভিশনের সৈন্যদের বাঁধা দিতে গিয়েছিলেন এ অপরাধে তার চোখের সামনেই তার ১৫ বছরের মেয়ে গুলনারের ওপর ৫ জন সৈন্য একের পর এক গণধর্ষণ চালায়। একজন দাঁত দিয়ে কেটে নিয়েছে গুলনারের গালের মাংস, নখের আচঁড়ে ক্ষত-বিক্ষত করেছে কচি স্তন। আর বুকে বেয়নেট ধরে সানাউল্লাহ খান মোঙ্গলকে সে ধর্ষণের দৃশ্য দেখতে বাধ্য করেছে।  বাবা হয়ে মেয়ের ওপর সেই পাশবিক অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে মূর্ছিত হয়েছে সানাউল্লাহ। জ্ঞান হয়ে দেখেছে তাঁরই পাশে পড়ে আছে তাঁর প্রাণের পুতুল গুলনারের রক্তাক্ত নি®প্রাণ দেহ।

গুলনাররা কি বেলুচ, না’কি বাঙালি? গুলনাররা কি ভিয়েৎনামের মেয়ে না’কি কম্বোডিয়ার? সে প্রশ্ন কি খুবই জরুরি? বসনিয়ায় ’৯০ এর দশকে যে বসনীয় মুসলিম মেয়েটি সার্ব এবং ক্রোয়াটদের হাতে ধর্ষিতা হয়েছে সেও তো এই গুলনারই। সারা পৃথিবী জুড়েই গুলনাররা ধর্ষিতা হয়। এটা কি ইতিহাসের নিয়ম? না’কি বিজয়ী বাহিনীর নিয়ম? এই নিয়মের শেষ কবে হবে? কোনদিন হবে কি? 

হাজার হাজার বেলুচ যুবককে নেয়া হলো আর্মি কনসেনট্রশন ক্যাম্পে। তারপর তাদের ওপর চলতে থাকলো নিমর্ম অমানুষিক অত্যাচার। এই অত্যাচারে মারা যায় যুবনেতা ‘সানঝের খেল’ । রোজ রোজ যে নির্যাতনের কত নৃশংস উপায় পাক সেনারা বের করতো ভাবলেও গা শিউরে উঠে! বেয়নেট দিয়ে উপড়ে নিয়েছে কারও চোখ, খুবলে নিয়েছে কারও শরীরের মাংস। দিনের পর দিন সেই সব হতভাগ্যদের আর্ত চিৎকারে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পটা থর থর করে যেন কাঁপত। পারভেজের এসব ঘটনা আর শুনতে ভালোলাগে না। 

বৃদ্ধ আমানুল্লাহ’র ঘর থেকে সে বাইরে এসে দাঁড়ায়। মেঘমুক্ত আকাশে অগণিত তারা দেখা যায়।  পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের এক নিভৃত গ্রামে পারভেজ এসেছে দিন’ দুয়েক হলো। কেন এসেছে সে? পারভেজ এসেছে সেই দেশের মানুয়গুলোকে দেখতে যাঁরা তার দেশে একদিন আধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র হাতে যা ইচ্ছে তাই করেছে। কিন্তু বৃদ্ধ আমানুল্লাহ, বৃদ্ধ বেলুচ সানাউল্লাহ যে ইতিহাস তাকে বলেছে তার সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আর পাক বাহিনীর অত্যাচারের পাথর্ক্য কোথায়? পাথর্ক্য হয়তো এখানেই যে বাঙালি মুক্তিযুদ্ধে জয়ী হয়েছে আর বেলুচদের মনের আগুন শুধু জ্বলছে ধিকিধিকি! জ্বলবে হয়তোবা আরও অনেক কালব্যাপী! 

একটা ব্যাপার সত্যি বড় অদ্ভূত। অত্যাচারীর অত্যাচার ও নির্যাতনের ধরণ ও মাত্রা যুগে যুগে প্রায় একই রকম থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের নাৎসী বাহিনী গ্যাস চেম্বারে পুড়িয়ে মেরেছে ইহুদীদের। ভিয়েৎনাম যুদ্ধে মার্কিন বাহিনী ভিয়েৎনামী কমিউনিস্টদের ইলেক্ট্রিক চেয়ারে বসিয়ে হত্যা করেছে। ভিয়েৎনামের হাজার হাজার মেয়ে ধর্ষিতা হয়েছে মার্কিন সৈন্যদের হাতে। ইতিহাসের ধারা সর্বত্র একই। শুধু দেশ, সময়, মানুষের গায়ের রং আর চেহারা হয়তোবা ভিন্ন থাকে। পারভেজ ভাবে সে হয়তোবা নাৎসী অধ্যুষিত ইউরোপে ছিল। চীনে ছিল। ভিয়েৎনামে ছিল। শুধু নাম আর চেহারায় ছিল তফাৎ। 

বৃদ্ধ আমানুল্লহ এক সময় পারভেজকে ঘরে ডেকে নেয়। হাতে বানানো জোয়ারের রুটি আর মগ ভরা চা এগিয়ে দেয়। ঘরে মেহমান এসেছে বলে টিনের পাত্রে গোস্ত দেয়া হয়। পাকিস্তানের গরিব জনগণ কত অল্পে তৃপ্ত। এদেশে এখনও সামন্ততন্ত্র ও ভূস্বামীদের প্রভাব তীব্র। তাই স্বাভাবিক ভাবেই শোষণ ও ধর্মান্ধতাও প্রবল। পারভেজ ভাবে বাঙালিরা হয়তবা পাকিস্তানী শাসকদের হাতে থেকে মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু  বাঙালি শোষকদের হাত থেকে কে তাদের মুক্তি দেবে? (চলবে)

[ধারাবাহিক উপন্যাস ‘দুই নগরের উপাখ্যান ’ রচিত হয়েছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে। উপন্যাসের চরিত্রসমূহ কাল্পনিক।  কোন জীবিত বা মৃত মানুষের জীবনের সাথে এর কোন সাদৃস্য পাওয়া যাবে না। পটভূমি ঐতিহাসিক হওয়াতে ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনা এখানে স্থান পেয়েছে। এক্ষেত্রেও ক্ষেত্র বিশেষে ইতিহাসের সঙ্গে হুবহু মিল নাও পাওয়া যেতে পারে।]

পাঠকের মন্তব্য


একই ধরনের লেখা, আপনার পছন্দ হতে পারে

bdjogajog