অর্হনার জন্য অপেক্ষা

আলতামাস পাশা লেখাটি পড়েছেন 110 জন পাঠক।
 ঢাকার ওয়ারির লাল মোহন সাহা স্ট্রিটের সামনে এসে থামে একটা সিএনজি। ভেতর থেকে নামে শাওন। পরনে সাদা অফ হোওয়াইট কোর্ট আর কালো পেন্ট। আজ ওর বিয়ে। বিয়ে হবে ১৮৭২  সালের বিশেষ বিয়ের আইন অনুসারে। অর্হনা বিয়ের সাজে সেজে একটু পরেই এখানে চলে আসবে তার ঘনিষ্ট বান্ধবীকে সাথে নিয়ে। সঙ্গে আসবে বিয়েতে স্বাক্ষী হবার জন্য আরো দু’জন উকিল এবং দু’জন কলিগ। এক অদ্ভুত অনুভূতি শাওনকে শিহরিত করে।  


অর্হনাকে প্রথম দেখে শাওন চাকরি সূত্রে। সে ঢাকা ভার্সিটি থেকে মাস্টারস্ শেষ করে সবেমাত্র একটা চাকরিতে ঢুকেছে। একদিন সকালে অফিসে গিয়ে শাওন দেখতে পায় চঞ্চল কাঠবিড়ালির মতো চঞ্চল একটি মেয়ে বিভিন্ন  কম্পিউটারে কাজ করে চলেছে। অর্হনার চাপাকলির মতো আঙুলগুলো কম্পিউটারের কী- বোর্ডে কাজ করে চলে, আর শাওন তা মুগ্ধ চোখে দেখে।  


সময় বয়ে চলে দ্রুত। শাওনের অফিসে অর্হনার চাকরির ছয় মাস তখন চলছে। ঠিক সে সময় অর্হনা আরো ভালো চাকরি পেয়ে অন্যত্র চলে গেল। এই ছয়মাসে সহকর্মী হিসেবে শাওন অর্হনার কাছাকাছি আসলেও ভালোলাগার কথা তাকে বলতে পারেনি। হঠাৎ অর্হনা অন্য অফিসে চলে যাওয়ায় শাওন কিছুটা হতবুদ্ধি হয়ে পড়লো। কী করবে কিছুই ভেবে পেল না। অনেক ভেবে শেষে নানাভাবে উল্টোপাল্টা বুঝিয়ে তার অফিসের এইচআর বিভাগ থেকে অর্হনার একটা ঠিকানা পেল। তারপর একটা চিঠি লিখল অর্হনাকে। চিঠিতে অর্হনাকে মোহাম্মদপুরের আরং-এর সামনে দেখা করতে অনুরোধ করে পরের শুক্রবার সকাল ১০/১১ টার মধ্যে সেখানে আসতে লিখলো।  


নির্দিষ্ট দিনে সকালে শাওনের ঘুম ভাঙলো অদ্ভুত এক ভালোলাগায়। অর্হনা নিশ্চয়ই আজ আসবে! হাজার হোক বন্ধুত্বপূর্ণ একটা সম্পর্ক রয়েছে না তাদের। আজ নিজের ভালোলাগার সব কথা সে অর্হনাকে বলবেই। নিজের সবচেয়ে ভালো সার্ট ও প্যান্ট পরে আরং-এর সামনে পৌঁছায় শাওন পৌনে দশটার মধ্যেই। এখন শুধুই অপেক্ষার পালা। পরপর দু’বার চিঠি দিয়েও অর্হনার দেখা পায় না শাওন। অপেক্ষায়, অপেক্ষায়  মনটা ভেঙ্গে যায়। তবু কাজের ফাঁকে অর্হনার কথা মনে হয়। এভাবেই দিন যায়, রাত আসে। একদিন রদ্র মেলায় টিএসসিতে দেখা হয়ে যায় অর্হনার সাথে। শুধু এইটুকুই। সামান্য শুভেচ্ছা বিনিময়। অর্হনার সঙ্গে তার বান্ধবীরা থাকায় বেশি কিছু আর বলা হয় না। এর মধ্যে একদিন শাওনও নতুন চাকরি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু অর্হনা থাকে তাঁর প্রাণের গভীরে। সময় পার হয়ে যায়। ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় অর্হনাকে খুঁজে ফিরে শাওন। কিন্তু অর্হনাকে পাওয়ার কোন পথ তার জান নেই। কী করবে ভেবে পায় না ! নিজ জীবনের প্রতি সব আকর্ষণ তার হারিয়ে যেতে থাকে। ছুটির দিনগুলোতে বিভিন্ন মার্কেটে ঘুরে ফিরে অর্হনাকে খোঁজে সে। যদি অর্হনা এসব মার্কেটের কোনটিতে আসে! এভাবেই তিনটি বছর পার হয়ে যায়। খেয়ে না খেয়ে শাওনের জীবন কোন মতে চলে। ক্লান্ত একাকী শাওন গভীর রাত পর্যন্ত কবিতা লিখে চলে তার প্রাণ প্রিয় অর্হনাকে নিয়ে।  


একদিন রিকশায় শাওন যাচ্ছিল শাহবাগের দিকে। সংসদ ভবনের কাছে সিগন্যালে রিকশা থামে। হঠাৎ বাঁদিকে চোখ যায় শাওনের। শেরেবাংলা নগরের রাস্তা দিয়ে আরেক রিকশায় অর্হনাও সিগন্যালে অপেক্ষায়। অর্হনা কোথায় যাচ্ছে? আপন মনে শাওন নিজেকে প্রশ্ন করে। সে কী অর্হনার রিকশাকে ফলো করবে? ভাবতে ভাবতেই সিগন্যাল ছেড়ে দেয়। অর্হনাকে নিয়ে রিকশাটা রাস্তা ক্রস করে লালমাটিয়ার দিকে চলে যায়। শাওনের রিকশা এগিয়ে চলে শাহবাগের দিকে। আবারও অর্হনাকে হারিয়ে ফেলে শাওন।  


হঠাৎ নতুন বুদ্ধি খেলে শাওনের মাথায়। ও ভাবে অর্হনা নিশ্চয়ই এখনও ফার্মগেট এলাকায় থাকে আর সেখান থেকেই অফিসে যায় লালমাটিয়ায়। শাওন ঠিক করে একদিন সকাল ন’টার আগেই লালমাটিয়া যাবার পথে অপেক্ষা করবে অর্হনার জন্য। যেই ভাবা সেই কাজ। তারপর এক রবিবারে অর্হনার জন্যে সকাল থেকে অপেক্ষা  করে শাওন। ন’টা বাজতে পাঁচ মিনিট আগে অর্হনার রিকশা আসতে দেখে শাওন। কাছাকাছি আসার পর শাওনকে দেখে অবাক হয় অর্হনা। বলে কী ব্যাপার? আপনি এখানে? শাওন বলে আপনি কোথায় যাচ্ছেন? অফিসে? প্লিজ, আমার কার্ডটা নিয়ে যান। ইচ্ছা হলে ফোন করবেন। কেমন?


সত্যি সত্যি একদিন অর্হনা ফোন করে শাওনকে। সেই থেকে সম্পর্ক নতুন মাত্রা পায়। কখনও কফি হাউস, কখনও সংসদ ভবন, কখনও টিএসসি। অর্হনাকে নিয়ে লেখা কবিতাগুলো থেকে শাওন ওকে কবিতা পড়ে শোনায়। অর্হনা অবাক হয়ে ভাবে একটা ছেলে এমনভাবে একটা মেয়েকে ভালোভাবে কীভাবে? 


কিন্তু শাওনের ভালোবাসা মেনে নিতে অর্হনার ধর্ম বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। খ্রীস্টান মেয়ে অর্হনা তার সামাজিক বাঁধা থেকে বের হয়ে আসতে পারে না। শাওনও চায় না অর্হনা তাঁর জন্য নিজ ধর্ম ত্যাগ করে। বরং ভালোবাসাকে সবকিছুর ওপরে নিয়ে শাওনই অর্হনার ধর্ম গ্রহণ করতে চায়। কিন্তু অর্হনার মা তাতেও রাজি হয় না। পুরো ব্যাপারটি অর্হনার পরিবারে জানাজানি হয়ে যায়। অর্হনার মামা-মাসিরা অর্হনাকে সতর্ক করেন, খবরদার এমন কাজ করতে যেও না। 


সমাজে তা’হলে মুখ দেখানো যাবে না। অর্হনা বেশি সমস্যায় পড়ে তার ছোটভাই উইলিয়ামসনকে নিয়ে। কিছুতেই সে এই বিয়ে মেনে নিতে পারে না। সে তার বোনকে স্পষ্ট বলে দেয় তুই যদি  শাওনকে বিয়ে করিস তাহলে আমি তোদের দুু’জনকেই খুন করব। প্রতিদিনই অর্হনার সাথে এই নিয়ে কথা কাটাকাটি হয় তার ভাইয়ের। অর্হনার ছোট মাসি একদিন অর্হনা আর শাওনকে বলে তোমরা হয়তোবা নিজেরা বিয়ে করতে পারো তবে আমাদের সমর্থন পাবে না। শেষ পর্যন্ত ওরা সিদ্ধান্ত নেয় ১৮৭২ সালের বিশেষ বিবাহ আইনে (Special Marriage Act-1872) দু’জনের নিজ ধর্ম রেখেই বিয়ে করার। অর্হনার অফিসের একজন এডভোকেটকে সাথে নিয়ে দু’জনে দেখা করে ম্যারেজ রেজিস্ট্রার এডভোকেট বিকাশ পালের সাথে। এডভোকেট বিকাশ ওদের অভয় দেন। তবে শাওনকে সতর্ক করে বলেন, দেখেন মেয়ে পক্ষ ইচ্ছা করলে কেস দিতে পারে। জেলেও যেতে হতে পারে। অবশ্য আমরা জামিন করাতে পারবো। তবু ভেবে দেখতে পারেন এমন রিস্ককে যাবেন কী না। শাওন হাসে, বলে কোন সমস্যা নেই সব সমস্যা মোকাবিলা করতে, সব কষ্ট সহ্য করতে আমি তৈরি হয়েই আছি। সুতরাং আপনি সব ব্যবস্থা করতে থাকুন। কিছু অ্যাডভান্স  করে ওরা চলে আসে।  

ঢাকার নিউমার্কেট। শাওন  আর অর্হনা এসেছে বিয়ের আংটি কিনতে। শাওনের বাবা-মা কেউ নেই। ভাই-বোন সবাই বড় বড়। শাওনের খোঁজখবর তারা খুব একটা নেয় না। শুধু মেজ ভাইয়ের সাথেই শাওনের যোগাযোগ আছে। বিয়েতে মেজো ভাই সামান্য কিছু টাকা দিয়েছে। নিজেদের খুব একটা সেভিংসও নেই শাওন-অর্হনার। ফলে হাজার দশেক টাকা নিয়েই ওদের বিয়ের আয়োজন চলে। ওরা নিজেরাই পছন্দ করে দুটো আংটি কিনেছে। আর কিনেছে বিয়ের শাড়ি। অর্হনাকে সোনার গহনা দিয়ে সাজানোর ক্ষমতা শাওনের নেই। অর্হনাও মুখ ফুটে কিছু চায়নি। শাওনের বুকের কোণায় একটা কষ্ট তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠে। অর্হনা খুব উৎসাহের সঙ্গে বিয়ের জন্য ইমিটেশন নেকলেস কিনেছে। ইমিটেশন হলেও খুব সুন্দর জিনিস, দেখতে অবিকল আসলের মতো।  


বিয়ের দিন নির্ধারিত হয় ৫ ফেব্রুয়ারি। বিয়ের আগের দিনও অর্হনার সঙ্গে শাওনের দেখা হয়। নতুন সংসার করতে যাচ্ছে অর্হনা। মনে অনেক ভয়, উৎকণ্ঠা। ভিন্ন ধর্মের, সামাজিক অবস্থানের ছেলেকে বিয়ে করতে যাচ্ছে সে। অজানা অনেক ভয়, দ্বিধা অর্হনাকে গ্রাস করে। রাতে অনেকক্ষণ  ঘুম আসে না তার, জেগে থাকে অর্হনা। ভোর রাতের দিকে ঘুমিয়ে পড়ে সে। 


শাওন একাকী তার সাবলেটের বিছানায় শুয়ে। ঘরের বাতি নেভানো। জানালা খোলা। দূর থেকে একটা বাংলা গানের সুর ভেসে আসছে। চারপাশ নিরব-নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। সারা বাড়ি, সারা এলাকা ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেছে। অনেক কথা শাওনের মনে ভিড় করে। মা’র কথা, বাবার কথা। কাল সে একাকী বিয়ে করতে যাচ্ছে। ওঁর ঘনিষ্ট বন্ধুরাই শুধু ব্যাপারটি জানে। আর কেউ না। অফিসের কলিগদেরও কিছু বলেনি সে ।  


দূর থেকে একটা সাদা গাড়ি এগিয়ে আসতে দেখে শাওন। একসময় গাড়িটা এসে থামে শাওনের সামনে। গাড়ির ভেতরে বিয়ের সাজে অর্হনা। কী যে সুন্দর লাগছে দেখতে। শাওন অভিভূত হয়ে যায়। আস্তে আস্তে গাড়ি থেকে নেমে আসে অর্হনা। ওর সাথে আসা বন্ধুরা কুশল বিনিময় করে শাওনের সাথে। সবাই মিলে একটা ছয়তলা বাড়ির তিনতলায় পৌঁছায় এডভোকেট বিকাশ পালের বাসা কাম চেম্বারে। 


বিয়ে পড়ানো শেষ হয় একসময়। সাক্ষীরা একে একে সই করে। সই করে শাওন আর অর্হনাও। দু’জনে মালা বদল করে। আজ থেকে ওরা একে অন্যের। সুখে-দুখে, হাসি-কান্নায় ওরা দু’জনে দু’জনার। অর্হনা যখন কৈশোরে তখন কী সে কখনও ভেবেছিল শাওন নামের এই ছেলেটার সাথে সে সারা জীবন বাঁধা পড়বে? অথবা শাওনও কী কখনও ভেবেছিল সে যেমনটা চায় তেমনটা অর্হনা নামের এই মেয়েটির মধ্যে সে খুঁজে পাবে? নাহ ওরা কখনই তা ভাবেনি। আসলে সত্যিকার ভালবাসায় সৃষ্টিকর্তার আর্শীবাদ থাকে। সেই আর্শীবাদই আজ অর্হনা আর শাওনকে এক নতুন জীবন দিয়েছে। আজও ওরা এই ঢাকা শহরে বসবাস করছে। চরম সুখী ওরা।

পাঠকের মন্তব্য


একই ধরনের লেখা, আপনার পছন্দ হতে পারে

bdjogajog