অপেক্ষার প্রহর

আলতামাস পাশা লেখাটি পড়েছেন 97 জন পাঠক।
 সিদ্দিক  একাই থাকেন। তার স্ত্রী লাবনী মারা গেছেন প্রয় পাঁচ বছর হয়েছে। সিদ্দিক সাহেবের দু’ই ছেলে এক মেয়ে । বড় ছেলে শাবন ব্যাংকে কাজ করে। ওয়াশিংটনে থাকে। আর এক ছেলে শান কানাডার মন্ট্রিয়েলে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে। সবার ছোট মেয়ে লাবনী থাকে স্বামীর সঙ্গে জার্মানিতে।  


সিদ্দিক সাহেবের বয়স সত্তর হতে বছর তিনেক বাকি। তেমন কোন অসুখ তার নেই। কিন্তু মনের মধ্যে এক অসীম শূন্যতা তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। সরকারি চাকুরি করতেন সিদ্দিক সাহেব। পেনশনের টাকা, ফিক্সড ডিপোজিট আর সঞ্চয়পত্রের টাকায় একা মানুষের ভালোই চলে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মাঝে মধ্যে ডোনেশনও দিয়ে থাকেন তিনি। বিভিন্ন বৃদ্ধনিবাসে সময় কাটান সিদ্দিক সাহেব। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন মানুষগুলোর কষ্ট বোঝা চেষ্টা করেন। এভাবে তার পরিচয় হয় ভিন্নধর্মী একটি বৃদ্ধনিবাসের পরিচালক ডা: শামিমের সঙ্গে। ’নয়নতারা’ বৃদ্ধনিবাসে আসা বৃদ্ধ মানুষগুলোকে অন্যান্য সেবার পাশাপাশি  সাইকোলজিক্যাল চিকিৎসা দেওয়া হয়। তারপর তার ফেলে আসা জীবনের কোন মধুর স্মৃতি বা কোন প্রিয় মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্কের পেক্ষাপটে তাকে নিয়ে যাবার চেষ্টা করা হয়। যেসব হারানো স্মৃতির দিনগুলোতে। তার প্রিয় কিছু মানুষকে পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধনিবাসের পরিবেশে কিছু দিনের জন্য তার সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য নিয়ে আসা হয়।  


একটু অন্যরকম মনে হওয়ায় সিদ্দিক সাহেব ’নয়নতারা’ বৃদ্ধনিবাসে আস্তানা গেড়েছেন আজ প্রায় একমাস হতে চললো। এখানে খাওয়া-দাওয়া ভাল। সিদ্দিক সাহেব খুব ভোরে উঠেন। নামাজ পড়েন। তারপর বেশ খানিকটা হেঁটে আসেন। তারপর নাস্তা সেরে কিছুক্ষণ বারান্দায় বেতের চেয়ারটায় বসে পুরানো রিডার্স ডাইজেস্ট পড়েন। পুরানো ডাইজেস্টগুলো তিনি তার বাসায় থেকে নিয়ে এসেছিলেন। এগুলো পড়তে তার খুব ভাললাগে। পুরানো সময়কার অনেক খবর জানা যায়। নতুন কিছু তার জানতে ইচ্ছা হয় না। সোজা কথায় বললে ইচ্ছা হয় না জানতে। 


’নয়নতারা’ বৃদ্ধনিবাসে ভালোই দিন কেটে যাচ্ছিল সিদ্দিক সাহেবের কিন্তু হঠাৎ বাদ সাধলো তার স্বাস্থ্য। কিছুদিন থেকেই কাশি আর জ্বর। তার মনটা অস্থিরতায় ছেয়ে গেছে। একমাত্র মেয়ে লাবনীকে খুব দেখতে ইচ্ছা হচ্ছে তার। মেয়েকে দেখতে চাওয়ার এই আকুলতাও তাকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দিয়েছে। রাতে তার ভাল ঘুম হয় না কয়েকদিন ধরেই।  


খবর চলে যায় ওয়াশিংটন, মন্ট্রিয়েল আর জার্মানীতে। সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই এসে পরে ছেলে-মেয়েরা। ’নয়নতারা’ বৃদ্ধনিবাসের পরিচালককে সিদ্দিক সাহেবের মেয়ে লাবনী ধন্যবাদ জানায় তাদের বাবার অসুস্থ্যতার খবর তাড়াতারি জানানোর জন্য। বৃদ্ধ নিবাসের ডাক্তার ওবায়দুর লাবণী, শাবন আর শানকে বার বার সাবধান করে দিয়ে বলে দিলেন, মানসিকভাবে ভালো রাখলে তাদের বাবা আরও পাঁচ-দশ বছর ভালোভাবেই বেঁচে থাকবেন। তবে শক্ত কোন মানসিক আঘাত পেলে যেকোন সময় মারা যেতে পারেন। 
তার এখন খুব আনন্দদায়ক জীবন মানে Pleasant life  কাটানো দরকার । কিন্তু মানসিক ভাবে বাবাকে ভালো রাখা কী’ভাবে সম্ভব? লাবনী আর তার ভাইদের তো আবারও দিন পনের পরে যার যার গন্তব্যে ফিরে যেতে হবে। তখন কি হবে? বৃদ্ধ নিবাসের সবাই-ই তো বৃদ্ধ? আর এক বৃদ্ধ কি আরেক বৃদ্ধকে ভালো রাখতে পারে?  


‘নয়নতারা’ বৃদ্ধ নিবাসের পরিচালক সিদ্দিক সাহেবের ছেলেমেয়েদের পরামর্শ দিলেন, এমন কাউকে নিবাসে নিয়ে আসতে যে তাদের বাবাকে মানসিকভাবে ভালো রাখতে পারবে। লাবন্য আর তার দুই ভাই মহা ভাবনায় পড়ল। কোন সমাধান পেল না। এভাবেই কেটে গেল তাদের ছুটির দু’দিন দু’রাত। 


নিজের ল্যাপটপে কাজ করছিল লাবন্য । ফেস বুকিং করার সময় হঠাৎ খেয়াল করে সে তার বাবার একটা ফেসবুক একাউন্ট ছিল। লাবন্যই সেটি  ওপেন করে দিয়েছিল। বাবা যদি পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করে না থাকে তা’হলে বাবার পুরানো ডায়রিতে সে যে পাসওয়ার্ড লিখে দিয়েছিল তা যেকোন ভাবে হোক এখন যোগার করতে হবে। এমনো তো হতে পারে ফেসবুক একাউন্টে বাবার কোন পুরানো বন্ধুকে খুঁজে পাওয়া যাবে  যিনি লাবন্যদের সাহায্য আসতে পারবেন।  


লাবন্যও ভাগ্য ভালোই বলতে হবে । পুরোনো একটি নোটবুকে বাবার ফেসবুক একাউন্টের পাসওয়ার্ড পাওয়া গেল। অনেক খুঁজে প্রায় দু’শ ফেন্ড লিস্ট ঘেটে তানজিবা হক নামের এক মহিলাকে পাওয়া গেল। বাবার ভার্সিটি লাইফের বন্ধু ছিল। এখন দেখতে হবে ভদ্র মহিলা কোথায় থাকেন । কি করেন। লাবনীদের ভাগ্য ভালোই বলতে হবে ।  তানজিবা হককে খুঁজে পেতে বেশি সমস্যা হয় না । ভদ্রমহিলা চট্টগ্রামের এক স্থানীয় কলেজে শিক্ষকতা করেন। প্রস্তাবে প্রথমে রাজি না হলেও ঢাকায় ফিরে আসার পরে সম্মতি দিয়ে ফোন করলেন। তানজিবার নিজের কেউ এদেশে নেই। স্বামী মারা গেছেন বছর পাঁচেক হল। মেয়ে থাকে অষ্ট্রেলিয়ায়। সেখালে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে। মা’কে বহুবার নিজের কাছে নিয়ে যেতে চেয়েছে। কিন্তু তানজিবা রাজি হননি। তিনি  স্বাধীনচেতা মহিলা, স্বামী জীবিত থাকা কালেও স্বাধীনভাবে নিজের মতো করেই  থাকতে পছন্দ করতেন। লাবন্যদের প্রস্তাবে তাই রাজি হন’নি প্রথমে। 


সিদ্দিক সাহেবের প্রতি ভার্সিটি লাইফে থেকেই তানজিবার একটা সফট কর্ণার ছিল।  আজ চল্লিশ বছরের বেশি সময় পরে সেই সফট কর্ণার অটুট রয়েছে দেখে তানজিবা নিজেই অবাক হয়ে যান। শেষ পর্যন্ত কলেজ থেকে ছয় মাসের ছুটি নিয়ে নেন তানজিবা। 
মজার ব্যাপার হল তানজিবাকে দীর্ঘ চল্লিশ বছর পরে দেখে সিদ্দিক সাহেব মনে হয় চিনতে পারলেন না। যা হোক, তানজিবা সিদ্দিক সাহেবের পছন্দ -অপছন্দ জানতো বলে খুব দ্রুতই তাদের মধ্যে সখ্যতা গড়ে উঠলো। একটি আনন্দময় জীবন কাটাতে শুরু করলেন এই বৃদ্ধ নিবাসে সিদ্দিক সাহেব। তিনি তখন নতুন জীবন ফিরে পেলেন যেন তারই সম-বয়সী বৃদ্ধা তানজিবার মোহময়ী স্নেহ-ভালোবাসায়। বৃদ্ধের মনে কোন হাহাকার থাকলো না। তানজিবাকে পেয়ে সিদ্দিকসাহেবের ছেলে-মেয়েরাও মহাখুশি। নিশ্চিন্ত মনে তারা যার যার গন্তবে ফিরে গেল। 


দেখতে দেখতে চার মাস কেটে গেল। তানজিবা সিদ্দিক সাহেবকে নিয়ে মাঝে মাঝে বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতেও যেত। বৃদ্ধনিবাসের ডাক্তার এবং কর্তৃপক্ষও বিষয়টিতে ইতিবাচক সমর্থন দিয়ে যাচ্ছিলেন। একদিন বিকেলে হঠাৎ হালকা জ্বর আসলো সিদ্দিক সাহেবের। ডিনার করিয়ে ওষুধ খাইয়ে সিদ্দিক সাহেবকে তানজিবা বিছানায় শুইয়ে ১০টায় আবার আসবেন বলে বিদায় নিলেন। এদিকে কিছুক্ষণ পরেই জ্বর সেরে গেলো সিদ্দিক সাহেবের। ঘুমও আসছিলো, কিন্তু তানজিবা আসবেন ভেবে ঘুমালেন না। বসে রইলেন বিছানায়। ওদিকে তানজিবা ভাবলো, সিদ্দিক সাহেব নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে পড়েছেন। তাই সেও আর তাকে দেখতে গেলেন না। রাত ১০টা পেরিয়ে ১১টা---- ১২টা----১টা বাজলো। তারপর আস্তে আস্তে ভোর হয়ে আসে। 


পরদিন সকালে হইচই শুনে তানজিবার ঘুম ভাওলো। জানলেন সিদ্দিক সাহেব মারা গেছেন।  বিশ্বাস হলো না তানজিবার হঠাৎ এভাবে মারা যাবে কেনো? তড়িঘড়ি করে সে সিদ্দিক সাহেবের ঘরে ছুটে গেলেন। সেখানে গিয়ে অবাক হয়ে তানজিবা দেখলো, বিছানার ওপর বালিশে হেলান দিয়ে নিথর হয়ে আছেন সিদ্দিক সাহেব। চোখে তার অবারিত হাহাকার। দু’চোখের দৃষ্টি নিবন্ধ --- খোলা দরজার দিকে। চোখ দু’টো যেন কারও জন্যে অপেক্ষা করছে। বৃদ্ধনিবাসের কেউ কিছু বোঝেনি। সবাই বলছিলো বয়স হয়েছে তো! তাই মারা গেছেন। আহারে! ছেলেমেয়েগুলো বিদেশে বাবাকে শেষ দেখাও দেখতে পায় কি’না। কিন্ত একমাত্র বোধহয় তানজিবাই জানে কেনো মারা গেলেন সিদ্দিক সাহেব.. ওই চোখ দুটি অপেক্ষা করছে কার জন্যে.. কিসের জন্যে.. অপেক্ষার কীরকম কষ্ট নিয়ে মারা গেলেন তিনি!

পাঠকের মন্তব্য


একই ধরনের লেখা, আপনার পছন্দ হতে পারে

bdjogajog