রাস্তার কুকুর এবং মানুষের সহাবস্থান ঢাকা শহরের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাকে হুমকির মুখে ফেলছে

আলতামাস পাশা লেখাটি পড়েছেন 253 জন পাঠক।
 কুকুর গৃহপালিত প্রাণী। প্রভুভক্ত প্রাণী হিসেবে তার খ্যাতি আছে। পৃথিবীর সবদেশেই এদের দেখতে পাওয়া যায়। তবে জাত, রং ইত্যাদি ক্ষেত্রে পার্থক্য দৃশ্যনীয়। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরে প্রচুর কুকুর দেখতে পাওয়া যায়। ঢাকাকে এখন বলা চলে শারমেয় শহর। সঠিক পরিখ্যান না থাকলেও সংখ্যা উভয় সিটি কোর্পোরেশন মিলিয়ে প্রায় দেড় লাখ। যদিও এই সংখ্যার সাথে দ্বিমত প্রকাশ করেছে প্রাণী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো। তাদের হিসাবে ঢাকার দুই সিটিতে মোট ৩৭ হাজার কুকুর রয়েছে। যদিও এ পরিসংখ্যানের কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।। প্রকৃত সংখ্যা আমাদের ধারণার বাইরে। কুকুর বন্ধাকরণের প্রক্রিয় যথাযথভাবে সম্পন্ন করা গেলে কুকুরের সংখ্যা হ্রাস করা গেলেও কুকুরের পরিবেশ দূষণ কার্যাবলী যথা যত্রতত্র মল-মূত্র ত্যাগের বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। রাস্তার কুকুরের প্রতি মানবিক আচরণের আন্দোলনে যারা এবং যেসব সংস্থা সচ্চার তাদের উচিত এবিষয়ে নগরবাসীর সামনে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরা।

কুকুর এবং মানুষের সখ্যতা বহুদিনের হলেও আধুনিক নগর সভ্যতায় শহরগুলোতে মানুষের সংখ্যা বারার সাথে কুকুরের সহাবস্থান ভীষণভাবে সমস্যার সৃষ্টি করছে।
কুকুর কার্নিভোরা (Carnivora) অর্থাৎ শ্বাপদ বর্গ ভুক্ত এক প্রকারের মাংসাশী স্তন্যপায়ী প্রাণী। প্রায় ১৫ হাজার বছর আগে একপ্রকার নেকড়ে মানুষের শিকারের সঙ্গী হওয়ার মাধ্যমে গৃহপালিত পশুতে পরিণত হয়। তবে কারও কারও মতে কুকুর মানুষের বশে আসে ১০০,০০০ বছর আগে।  অবশ্য অন্যান্য বিভিন্ন তথ্যসূত্র অনুযায়ী কুকুরের গৃহ পালিতকরণের সময় আরও সাম্প্রতিক বলে ধারণা প্রকাশ করে থাকে।. নেকড়ে ও শিয়াল কুকুরের খুবই ঘনিষ্ঠ প্রজাতি (নেকড়ে আসলে একই প্রজাতি)। তবে গৃহপালিত হওয়ার পরে কুকুরের বহু বৈচিত্র্যময় জাত (breed) তৈরি হয়েছে, যার মধ্যে মাত্র কয়েক ইঞ্চি উচ্চতার কুকুর (যেমন চিহুয়াহুয়া) থেকে শুরু করে তিন ফুট উঁচু (যেমন আইরিশ উলফহাউন্ড) রয়েছে। 

তবে ঢাকায় রাজপথে যত্রতত্র ঘুরে ফেরা কুকুরগুলো মূলত দেশীয় প্রজাতির। শুধু ঢাকা শহরেই নয় প্রতিটি জেলা শহরেই এর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে। দেশের প্রাণী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো এবং কতিপয় সুশীল সমাজ ব্যক্তিত্ব কুকুরের প্রতি যতই উচ্চকিত হন না কেন জনস্বাস্থ্যকে আমাদের সবার উপরে স্থান দিতে হবে। 

পশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন পিপল ফর এনিমেল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের মতামত হচ্ছে, ‘কুকুর অপসারণ করে ঢাকা শহরে কুকুর কমানো সম্ভব নয়। এর পরিবর্তে কুকুর বন্ধ্যাত্বকরণ কর্মসূচী চালু করতে হবে যাতে বংশবৃদ্ধি বন্ধ হয়। কুকুরকে বন্ধ্যাত্বকরণ টিকা দিলে কুকুরগুলো আর বেশি লাফালাফি বা চঞ্চল হয়ে ওঠে না। এটা কুকুরের স্বভাব। ফলে বিশৃঙ্খলাও হয় না।’ প্রশ্ন এখানেই। এ বক্তব্যের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি থাকলেও ‘কুকুরের গলায়’ ঘন্টা পড়াবে কে? অতীতেও এই বন্ধ্যাত্বকরণ কর্মসূচী সফল হয়নি। খেসারত দিতে হয়েছে পথচারী ঢাকাবাসীকে। 

কুকুর প্রতিপালনে, সিটি কর্পোরেশন দু‘টির কোন সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেই। প্রতিটি উন্নত শহরে কুকুরসহ পোষা প্রাণী প্রতিপালনে নির্দিষ্ট নীতিমালা আছে। এধরেণের নীতিমালা মানুষ, পরিবেশ, প্রতিবেশ ও প্রাাণীর জীবনধারণে আবশ্যিক একটি বিষয়। এ ধরনের নীতিমালার অভাবে মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য যেমন হুমকির মুখে, তেমনি হুমকির মুখে রয়েছে এসব প্রাণীকূল। ঢাকার অলিগলি সর্বত্র এখন কুকুর ঘুরে বেড়ায় এসব কুকুর র‌্যাবিশসহ নানা অসুখের জন্য দায়ী। অসুস্থ কুকুরের লালা, মলমূত্রের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ছড়াতে পারে রিংওয়ার্ম। প্রতিদিন ঢাকা শহরে বহু লোক কুকুর দ্বারা আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নেন। অনেককে  এন্টি র‌্যাবিশ ইনজেকশনও নিতে হয়। এই ইনজেকমন নেওয়াটা খুবই কষ্টকর ব্যাপার। বিশেষত ছোট শিশুকে যখন তা দিতে হয় তখন তা ভীষণ হৃদয় বিদারক হয়ে দাঁড়ায়।

এখানেই এ বিষয়ের শেষ নয়। ঢাকা শহরে সন্ধ্যা নামলে বহু এলাকায় কুকুররা দল বেধে পথচারীদের ধাওয়া করে। ভুক্তভুগি ছাড়া এ করুণ অবস্থা তথাকথিত কুকুর প্রেমিকরা বুঝবেন না। এরা নিজেরা দামি গাড়িতে পথ চলেন বলে রাস্তার কুকুরের প্রতি তাদের দরদের সীমা পরিসীমা নেই। বিদেশী বিভিন্ন দাতার সংস্থার নজর কারার আশায় আজ অনেকেই পশু প্রেমিক বনে গেছেন, অখচ নিজের বাসায় পোষেন বিদেশী কুকুর। এদের পক্ষে সাধারণ পথচারীর দুঃখ-কষ্ট বোঝা সম্ভব কি? সারা দিন কাজ করার পর রাতের বেলা কুকুরের একটানা চিৎকার ঝগড়ায় পূর্ব রাজা বাজারে অনেকেই ঘুমাতে পারেন না। ফজরের নামাজে যাওয়া মুসল্লিরাও কুকুরের ধাওয়া থেকে রক্ষা পান না। তাই জন গুরুত্বপূর্ণ এসব বিষয় এড়িয়ে গিয়ে রাস্তার কুকুর রক্ষার দাবী সম্পূর্ণভাবেই যুক্তিহীন। বেওয়ারিশ কুকুর হত্যা অথবা বন্ধ্যাকরণ করলেই এ সমস্যার সমাধান হবে না। বরং প্রয়োজনে কুকুরকে ঢাকা শহর থেকে অন্যত্র নিয়ে গিয়ে তাদের যত্ন আত্রি করে কুকুরের খামার করা যেতে পারে। এসব খামার থেকে সুস্থ্ স্বাস্থ্যবান কুকুর ছানা বিক্রির ব্যবস্থা করে বেকার যুবকদের জন্য আয়ের ব্যবস্থা সংস্থান করা যায় কিনা সেটাও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের ভেবে দেথা দরকার । মেকী আবেগ দিয়ে লাভ হবে না্। অসুস্থ কুকুরকে মেরে ফেলা ছাড়া অন্য কোন উপায় আছে কি?

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রমাণ করেছে, নিজ ঘরে, বিছানায় কুকুর রাখলে অ্যালার্জি, ভাইরাস সংক্রমণসহ বিভিন্ন বিপত্তি ঘটতে পারে। এ বিষয়ে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ড. ইউসুফ আল-কারাজাভি ‘আল-হালালু ওয়াল হারামু ফিল ইসলাম’ শীর্ষক বইয়ে কুকুর নিয়ে জার্মান ও লন্ডনের বিভিন্ন গবেষকের উদ্ধৃতি উল্লেখ করেছেন। তারা কুকুরের সঙ্গ মানুষের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর বলে অভিমত দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিচার করলে কুকুর পালা ও তার সঙ্গে হাস্যরসিকতায় যে বিপদ মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবনের ওপর ঘনীভূত হয়ে আসতে পারে, তাকে সামান্য ও নগণ্য মনে করা কিছুতেই উচিত নয়। অনেক লোক নিজের অজ্ঞতার কারণে ভারি মাসুল দিতে বাধ্য হয়। তার কারণ এই যে কুকুরের দেহে এমন এমন জীবাণু রয়েছে, যা এমন রোগ সৃষ্টি করতে পারে, যা স্থায়ী এবং যা চিকিৎসা করে সারানো যায় না। কত লোক যে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে জীবন দিতে বাধ্য হয় তা গুনে শেষ করা যায় না। এসব জীবাণু মানুষের লিভারে প্রবেশ করে। আর সেখানে নানাভাবে আত্মপ্রকাশ করে। তা অনেক সময় ফুসফুসে ও মস্তকের ভেতরে প্রবেশ করে। তখন এগুলোর আকৃতি অনেকটা পরিবর্তিত হয়ে যায়। এমন অবস্থা দেখা দেয় যে বিশেষজ্ঞরাও তা ধরতে ও চিনতে অক্ষম হয়ে পড়েন। 

যা-ই হোক, এ জীবাণুর দরুন যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়, তা দেহের যে অংশেই হোক না কেন, স্বাস্থ্যের পক্ষে খুবই ক্ষতিকর ও মারাত্মক। এসব জীবাণুর কোনো চিকিৎসা আজ পর্যন্ত জানা যায়নি। এ কারণে চিকিৎসা-অযোগ্য রোগের মোকাবিলা করার জন্য আমাদের পূর্ণশক্তিতে চেষ্টা করতে হবে। এ বিপদ থেকে মানুষকে বাঁচাতে হবে।।’

জার্মান চিকিৎসাবিদ নুললর বলেছেন, ‘কুকুরের জীবাণুর দরুন মানবদেহে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়, তার সংখ্যা শতকরা ১-এর কম নয় কিছুতেই। আর কোনো কোনো দেশে শতকরা ১২ পর্যন্ত এ রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। এ রোগ প্রতিরোধের সর্বোত্তম পন্থা হচ্ছে, এর জীবাণুগুলোকে কুকুরের দেহ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ করে রাখা, তাকে ছড়িয়ে পড়তে না দেওয়া। 

তাই অবশ্যই আমাদের রাস্তার কুকুর সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। প্রয়োজনে কুকুর নিধন বা অপসারণ বিদ্যমান আইনে বেআইনী হলে জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় সরকারের উচিত হবে এই আইন পরিবর্ধন ও সংশোধন করার। কোন অবস্থাতেই আমরা জনস্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ঠেলে দিতে পারি না। বিশ্বব্যাপী কোভিট ১৯ এর সংক্রমণ আমাদের জীবাণু সংক্রমণে প্রাণীর সংশ্লিষ্টার কথা আবারও মনে করিয়ে দেয়।

 ঢাকা শহরের বাসা বাড়িতেও কুকুর-বেড়াল লালনপালন করা হয়। এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট লাইসেন্স ফি নেওয়ার মাধ্যমে সরকার তথা সিটি কর্পোরেশনগুলো কর্পোরেশন এলাকায় নিবন্ধনযুক্ত কুকুর বেড়াল পালনে নাগরিকদের উৎসাহিত এবং সচেতন করতে পারে। এর মাধ্যমে কুকুরকে র‌্যাবিশ মুক্ত রাখতে এন্টি র‌্যাবিশ ইনজেনশন দেওয়া সহজ হবে।

মনে রাখতে হবে যে, পৃথিবীর কোন সভ্য দেশেই রাস্তা-ঘাটে যেখানে সেখানে কুকুর ঘুরে বেড়াতে দেখা যায় না। এটা শিশু, নারী, বয়স্ক এমনকি প্রাপ্ত বয়স্ক পুরষদের (সিনিওর সিটিজেনদের জন্য অসুবিধার কারন হতে পারে। তারা ভয় পেতে পারে। অবশ্যই কুকুরের বাঁচার অধিকার আছে তবে তা হতে হবে, স্বাস্থ্যসম্মত এবং প্রকৃতির নিয়মানুযায়ী। তাই বেওয়ারিশ কুকুর ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সিটি কর্পোরেশন, সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ, পশু সম্পদ বিভাগ ছাড়াও প্রাণী কল্যাণে কাজ করা সংগঠনগুলোর সাথে সমন্বয় করে অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে হবে। পুরো বিষয়টি সুষ্ঠু নগর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার জন্য আজ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।।

পাঠকের মন্তব্য


একই ধরনের লেখা, আপনার পছন্দ হতে পারে

bdjogajog