সাম্প্রতিক প্রকাশনা

বাংলাদেশে ভূমিকম্প: ঢাকা কি ঝুঁকিতে?

আলতামাস পাশা লেখাটি পড়েছেন 52 জন পাঠক।
 বাংলাদেশে ভূমিকম্প: ঢাকা কি ঝুঁকিতে? 


ভূমিকা

বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে পৃথিবীর তিনটি সক্রিয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত — ইন্ডিয়ান প্লেট, ইউরেশিয়ান প্লেট এবং বার্মা প্লেট। দাউকি ফল্ট, জামুনা ফল্ট এবং চট্টগ্রাম-মিয়ানমার ফল্ট এখনও সক্রিয় থাকায় বাংলাদেশ ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।  (Taylor & Francis Online) ২০২৫ সালের নভেম্বরে নরসিংদি-মাধবদি ভূমিকম্প এবং ২০২৬ সালের জুনে রুপগঞ্জ ভূমিকম্প এই উদ্বেগকে নতুনভাবে সামনে এনেছে।

এই প্রতিবেদনে পাঁচটি মূল বিষয়কে কেন্দ্র করে বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হয়েছে: (১) CDMP-এর Time-Predictable Fault Modelling; (২) ভুটান ভূমিকম্প ও Seismic Gap বিতর্ক; (৩) রুপগঞ্জ-নরসিংদি ভূমিকম্পের টেকটোনিক রহস্য; (৪) দীর্ঘমেয়াদী ভূকম্পন তথ্যের অপ্রতুলতা; এবং (৫) বিশেষজ্ঞ মতামতের তুলনামূলক পর্যালোচনা।

অধ্যায় ১: Time-Predictable Fault Modelling — CDMP-এর বিজ্ঞানভিত্তি

১.১ মডেলটি কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ADPC এবং OYO কর্তৃক ২০০৯ সালে প্রণীত "Time-Predictable Fault Modeling of Bangladesh" প্রতিবেদনটি CDMP II-এর অংশ হিসেবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় প্রকাশিত হয়।  (Springer) Time-Predictable মডেল মূলত Shimazaki ও Nakata (১৯৮০)-এর তত্ত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত। এই মডেলের মূলনীতি হলো: শেষ বড় ভূমিকম্পের পর থেকে একটি ফল্টে যতটুকু স্লিপ জমেছে, তার উপর ভিত্তি করে পরবর্তী বড় ভূমিকম্পের সময় ও মাত্রা অনুমান করা সম্ভব।
Time-Predictable এবং Slip-Predictable উভযয় মডেলই ভূমিকম্প ঝুঁকির দীর্ঘমেয়াদী মূল্যায়নে ব্যবহৃত হয়। ঐতিহাসিক রেকর্ড এবং ভূতাত্ত্বিক তথ্য ব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট ফল্টে জমা স্লিপের সমক্রম নির্মাণ করা হয়।  

১.২ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে CDMP মডেলের প্রাসঙ্গিকতা

CDMP প্রকল্পের আওতায় ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট সিটি কর্পোরেশন এলাকার জন্য Time-Predictable Fault Modeling, Seismic Hazard Assessment এবং Seismic Vulnerability Assessment পরিচালিত হয়েছে।  (Global quake model)
GEM ফাউন্ডেশন পরিচালিত একটি Probabilistic Seismic Hazard Analysis মডেল ১,০০,০০০ বছরব্যাপী ভূমিকম্প পূর্বাভাস তৈরি করে, যেখানে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করা হয়। এই প্রকল্পে বাংলাদেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট ভূমিকম্প ঝুঁকির মানচিত্র প্রস্তুত করা হয়।  (GEM Foundation)
১.৩ CDMP মডেলের সীমাবদ্ধতা

বাংলাদেশে এই মডেলের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো — ভূমিকম্পের মূল্যায়ন একটি জটিল চ্যালেঞ্জ, কারণ বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক গঠন অত্যন্ত জটিল।  
ঐতিহাসিক তথ্যের স্বল্পতা এই মডেলকে দুর্বল করে দেয়। পাঁচশো বা হাজার বছরের recurrence period সম্পন্ন ফল্টের জন্য মাত্র ৫০-১০০ বছরের যন্ত্রগত ডেটা যথেষ্ট নয়। বিশেষজ্ঞরা স্পষ্টভাবে বলছেন, বাংলাদেশের কাছে নিজস্ব পর্যাপ্ত ভূকম্পন তথ্য নেই — "সব ধার করা তথ্য।"

অধ্যায় ২: ভুটান ভূমিকম্প ও Seismic Gap — বাংলাদেশের জন্য কী বার্তা?
২.১ 
৭ জুন ২০২৬-এর ভূমিকম্প
৭ জুন ২০২৬ সালে ভুটানের পুনাখা থেকে প্রায় ১৯ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে, থিম্পুর কাছাকাছি দূরত্বে ৫.৬ মাত্রার ভূমিকম্প হয়, যার গভীরতা ছিল ১০ কিলোমিটার।  

এই ভূমিকম্পের focal mechanism বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে এটি Main Himalayan Thrust (MHT) সিস্টেমের, বিশেষত Main Central Thrust (MCT)-এর কাছাকাছি একটি splay-এর মাধ্যমে ঘটেছে। ভুটান যে অঞ্চলে অবস্থিত, সেখানে ভারত-ইউরেশীয় সংঘর্ষের ফলে MHT-এর লকড সেগমেন্টে প্রতি বছর প্রায় ১৫-২০ মিলিমিটার হারে শর্টেনিং চলছে।  ভুটান সিসমিকভাবে সক্রিয় হিমালয় বেল্টে অবস্থিত, যেখানে ইন্ডিয়ান এবং ইউরেশীয়ান টেকটোনিক প্লেটগুলো ক্রমাগত সংঘর্ষে রয়েছে। ইন্ডিয়ান প্লেট উত্তর দিকে সরে গিয়ে ইউরেশিয়ান প্লেটের নিচে ঢুকছে, যার ফলে ভূগর্ভে প্রচণ্ড ভূতাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি 

২.২ ভুটানের Seismic Gap — ঐতিহাসিক পটভূমি
সিকিম-ভুটান সিসমিক গ্যাপে ১৭১৪ সালের M৭.৫-৮.৫ মাত্রার ভূমিকম্পের পর থেকে বড় কোনো ভূকম্পন নেই। GPS পরিমাপে দেখা গেছে এই অঞ্চলে বার্ষিক ১৬.২ থেকে ১৮.৫ মিলিমিটার হারে শর্টেনিং চলছে।  

পূর্ববর্তী গবেষণায় প্রস্তাব করা হয়েছিল যে ১৮৯৭ সালের আসাম ভূমিকম্প (M৮.১) ভুটানের প্লেট সংঘর্ষ থেকে কিছু চাপ মুক্ত করেছিল, ফলে ভুটানে ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমেছিল। তবে নতুন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ভুটানের পুরো হিমালয় অংশ M৭.৫-এর বেশি ভূমিকম্প উৎপন্ন করতে সক্ষম।  

Main Frontal Thrust (MFT)-এর paleoseismic গবেষণায় দেখা গেছে, বড় ভূমিকম্পের recurrence period আনুমানিক ৫৫০ ± ২১০ বছর। Seismic gap-এর আপাত কারণ হলো strain partitioning — মোট ১৮ মিলিমিটার/বছর শর্টেনিং-এর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিলং মালভূমির basement-cored uplift-এর মাধ্যমে নিঃসৃত হচ্ছে।  (ResearchGate)
২.৩ ভুটান ভূমিকম্পের বাংলাদেশ-প্রাসঙ্গিকতা

বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ৭ জুনের M৫.৬ ভূমিকম্পটি Himalayan Thrust System-এর ঘটনা। দাউকি-ওল্ডহ্যাম ফল্ট ইন্ডিয়া-ইউরেশিয়া সংঘর্ষের শক্তি শিলং মালভূমিতে আটকে দেয়, ফলে উত্তর দিকে — ভুটান অঞ্চলে — শক্তি সরাসরি পৌঁছায় না। এই কারণেই ভুটান অঞ্চলকে "Seismic Gap" বলা হয়। গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ হলো: ভুটান অঞ্চলের বড় ভূমিকম্প বৃহত্তর সিলেট ও শিলং এলাকার বড় ভূমিকম্পের recurrence period বাড়িয়ে দিতে পারে। অর্থাৎ ভুটানে শক্তি মুক্ত হলে সিলেটের দাউকি ফল্টে অবিলম্বে বড় ঘটনার সম্ভাবনা কিছুটা কমে। তবে বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলীয় Bengal Megathrust-এর উপর এর প্রত্যক্ষ প্রভাব সীমিত।
 
অধ্যায় ৩: রুপগঞ্জ-নরসিংদি ভূমিকম্পের টেকটোনিক রহস্য।

৩.১ নভেম্বর ২০২৫-এর ঘটনা এবং তাৎক্ষণিক প্রভাব

২১ নভেম্বর ২০২৫, শুক্রবার সকালে নরসিংদির মাধবদিতে রিখটার স্কেলে ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়, যার কেন্দ্র ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার গভীরে। পরবর্তী ৩১ ঘণ্টায় চারটি ভূমিকম্প হয়। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের নভেম্বর পর্যন্ত BMD রেকর্ডকৃত ৩৯টি ভূমিকম্পের মধ্যে ১১টি — অর্থাৎ ২৮ শতাংশের বেশি — ঢাকার ৮৬ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে উৎপন্ন হয়েছে। )
সর্বশেষ ২০২৬ সালের জুনে নারায়ণগঞ্জের রুপগঞ্জে ৪.৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয় যার উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার পূর্বে।  

৩.২ রুপগঞ্জ ভূমিকম্প ও নরসিংদির সম্পর্ক: নতুন বিশ্লেষণ

অবার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকম্প গবেষক আকতারুল আহসান রুপগঞ্জ ভূমিকম্পের প্রাথমিক লোকেশন ও ১৬ কিলোমিটার গভীরতার ভিত্তিতে এটিকে ২০২৫ সালের নরসিংদি ভূমিকম্পের সাথে সম্পর্কিত করার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর বিশ্লেষণে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন বিষয় সামনে এসেছে:
প্রথমত, এই এলাকায় ভূগর্ভে anticline বা মাটির নিচের ভাঁজ পর্বত আছে, যেখানে গ্যাসফিল্ড বিদ্যমান। এই কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য ভূমিকম্পের উৎস ব্যাখ্যায় অতিরিক্ত জটিলতা যোগ করে — কারণ anticline নিজেই একটি চাপ-সঞ্চয়কারী কাঠামো।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে ১৬ কিলোমিটার বা তার বেশি গভীরতার কোনো seismic imaging নেই। ফলে সেখানে ঠিক কী ঘটছে — এটি Subducting Indian Plate-এর ভূমিকম্প কিনা — গভীরতার হিসাব correction না করা পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

তৃতীয়ত, তিনি স্পষ্ট করেছেন যে শুধু এই ভূমিকম্পের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে আরও ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়া যায় না।
এই বিশ্লেষণ আগের "puzzle"-কে আরও গভীর করে: আমরা জানি না ভূমিকম্পটি anticline-সম্পর্কিত intraplate ঘটনা, নাকি সাবডাক্টিং প্লেটের bending ঘটনা — কারণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো গভীর ইমেজিং ডেটা বাংলাদেশে নেই।

৩.৩ টেকটোনিক প্রেক্ষাপট: Megathrust ও Intraplate-এর পার্থক্য

সাম্প্রতিক M৫.৫ ভূমিকম্পটি (নরসিংদি) দুটি প্রধান ফল্ট জোনের কোনোটিতেই ঘটেনি। এটি ইন্ডিয়ান প্লেটের ভেতরে ঘটেছে যখন প্লেটটি subduction zone-এ প্রবেশের আগে বাঁকতে শুরু করে। এই ভূমিকম্প megathrust-এ জমে থাকা চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করেনি, এবং ভবিষ্যতে megathrust ভূমিকম্পের সম্ভাবনাও এতে বাড়েনি।  
ভূকম্পবিজ্ঞানীরা ২১ নভেম্বর ২০২৫-এর নরসিংদি মাধবদি ভূমিকম্পকে intraplate ঘটনা হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করেছেন- এটি প্লেট সীমানায় নয় বরং ইন্ডিয়ান প্লেটের অভ্যন্তরে ঘটা একটি rupture।  

৩.৪ Bengal Megathrust এবং ঢাকার অবস্থান

কেন্দ্রীয় বেঙ্গল অববাহিকা গঙ্গা নদী, Indo-Burman Megathrust-এর deformation front, Shillong Massif-এর thrust এবং uplift-সহ একাধিক ভূতাত্ত্বিক শক্তির দ্বারা পরিচালিত।  

Bengal Megathrust-এর deformation front ঢাকার পূর্বদিক থেকে শুরু হয়ে বার্মা পর্যন্ত বিস্তৃত। Basri et al. (২০২৫)-এর গবেষণায় দেখানো হয়েছে, বাংলাদেশের পশ্চিম-পূর্ব অংশে সাবডাক্টিং প্লেটের বিস্তার স্পষ্ট। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো - বড় ভূমিকম্প অবশ্যই ঢাকার কাছেই হবে এমন নয়; ঢাকার পূর্বে যেকোনো স্থানে Splay Fault-এর মাধ্যমে হতে পারে।

GNSS তথ্য থেকে দেখা গেছে Indo-Burma Megathrust লকড অবস্থায় রয়েছে এবং প্রতি বছর ১১.৬ ± ৫.৪ মিলিমিটার হারে শর্টেনিং হচ্ছে, যা M৮.২-এর বেশি মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টি করতে সক্ষম।  

৩.৫ ঐতিহাসিক সাদৃশ্য ও নতুন ভাবনা

১৯১৮ সালের শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্প (Mw ৭.১) এবং ১৭৬২ সালের আরাকান ভূমিকম্প সম্ভবত Bengal Megathrust-এর Splay Fault-এর ঘটনা ছিল। ২০১১ Tohoku (M৯.১) এবং ১৯৯৯ Chi-Chi (তাইওয়ান) ভূমিকম্পের পর ভূকম্পবিজ্ঞানীরা নতুন করে স্বীকার করছেন যে deformation front বা decollement tip-ও বড় rupture করতে পারে - যা আগে ধারণা ছিল না। এছাড় Dauki Fault System এবং Hinge Fault System — এই দুটো স্বতন্ত্র ভূমিকম্প উৎস হিসেবে বাংলাদেশের জন্য আলাদা হুমকি তৈরি করছে।

অধ্যায় ৪: তথ্য-সংকট এবং ভূমিকম্প বিজ্ঞানের মৌলিক সীমাবদ্ধতা

৪.১ ডেটার অপ্রতুলতা -সবচেয়ে বড় সমস্যা

বাংলাদেশে যন্ত্রগতভাবে ঘনত্বের সাথে রেকর্ডকৃত ভূমিকম্পের তথ্য কার্যত নভেম্বর ২০২৫ থেকে পাওয়া যাচ্ছে - যা এক বছরেরও কম। অথচ কিছু ফল্টের recurrence period হাজার বছরেরও বেশি হতে পারে। অবার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকম্প গবেষক আকতারুল আহসান এই প্রসঙ্গে সরাসরি বলেছেন: "আমাদের শত শত বছরের তথ্য দরকার। ১৬ কিলোমিটার নিচের কোনো ইমেজ আমাদের দেশে নেই।"
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে ১৯৮৫-২০১৭ সালের মধ্যে ব্যবহারযোগ্য ক্যাটালগ পাওয়া যায়, কিন্তু অনেক গবেষকের মতে গত শতকে এবং একবিংশ শতাব্দীতেও তথ্য সংগ্রহে ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে।  

৪.২ লকড ফল্ট ও শক্তি সঞ্চয়

যদি অতীতে বড় ভূমিকম্প হয়ে থাকে কিন্তু সাম্প্রতিক ইতিহাসে না দেখা যায় তবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হলো — ঐ ফল্ট শেষ ভূমিকম্পের পর থেকে লকড হয়ে গেছে এবং ভবিষ্যতের ভূমিকম্পের জন্য শক্তি সঞ্চয় করছে। পৃথিবীর বহু স্থানে এমন দেখা গেছে, যেখানে সক্রিয় ফল্ট ব্যাপকভাবে বিস্তৃত থাকলে চাপ পলিস্তরের (sedimentary layers) মধ্যে বিভাজিত হয়ে যায়।

৪.৩ বাংলাদেশে বড় ভূমিকম্পের উদাহরণ দিতে ক্যান্সার রোগীর উপমা উপস্থাপন করা যেতে পারে-

বিশেষজ্ঞরা একটি যথার্থ উপমা দিয়েছেন: "বাংলাদেশের ভিতরে যদি অতীতে বড় ভূমিকম্পের শিকার হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের একজন ক্যান্সার রোগীর মতো নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।" আর যদি কখনো বড় ভূমিকম্প না-ই হয়ে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে সত্যিকারের বড় ঘটনার সম্ভাবনা কম -কারণ ফল্ট ছাড়া ভূমিকম্প হয় না, আর ফল্ট তৈরি হতে হাজার থেকে কোটি বছর লাগে।
 
৪.৪ Megathrust-এর অনিশ্চয়তা

বেঙ্গল বেসিনে পর্যাপ্ত টেকটোনিক চাপ তৈরি হওয়া এবং তা থেকে M৮-৯ মাত্রার megathrust ভূমিকম্প ঘটার সম্ভাবনা নিয়ে এখনও বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তাই বাংলাদেশকে একটি বুদ্ধিদীপ্ত ও যৌক্তিক ভূমিকম্প-বোঝাপড়া এবং ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে।  

Megathrust কতটুকু "seismogenic" সেটা নিশ্চিত নয় -এটি creeping/slow slipping করছে কিনা তা-ও অস্পষ্ট। তবে সমস্ত প্রমাণ বলছে এটি দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় এবং বাংলাদেশের একটি বড় অংশে গুরুতর সম্ভাব্য ভূমিকম্প হুমকি তৈরি করছে।

অধ্যায় ৫: বিশেষজ্ঞ মতামতের তুলনামূলক পর্যালোচনা

৫.১ ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার — ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ড. আখতার বলেছেন, "ঢাকা ও আশপাশের অঞ্চল ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় অবস্থিত। সাম্প্রতিক ছোট ছোট ভূমিকম্পগুলো ভূ-অভ্যন্তরের টেকটোনিক চাপের স্বাভাবিক মুক্তির অংশ হতে পারে। এগুলোকে সরাসরি বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস বলা যাবে না, তবে সতর্কতা অব্যাহত রাখা জরুরি।" এই বক্তব্য বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক এবং সাধারণ মানুষের জন্য দায়িত্বশীল মন্তব্য আতঙ্ক না ছড়িয়ে সতর্কতার বার্তা দেওয়াই একজন বিশেষজ্ঞের কাজ।

৫.২ আকতারুল আহসান — অবার্ন বিশ্ববিদ্যালয় যুক্তরাষ্ট্র

আকতারুল আহসান আরও কয়েকটি নির্দিষ্ট কারিগরি বিষয় উত্থাপন করেছেন: রুপগঞ্জের ভূমিকম্পকে নরসিংদির ঘটনার সাথে সম্পর্কিত করা যায় কিনা তা যাচাই দরকার; গভীরতা correction ছাড়া এটি Subducting Indian Plate-এর ভূমিকম্প কিনা বলা যাবে না; এবং anticline ও গ্যাসফিল্ডের উপস্থিতি এলাকাটির ভূতাত্ত্বিক জটিলতা বাড়িয়েছে। তাঁর উপসংহার: "শান্ত থাকুন, খেয়াল রাখুন ভূমিকম্প হলে কি করতে হবে সেটা অনুশীলন করুন।"

৫.৩ দুই বিশেষজ্ঞের বক্তব্যে সামঞ্জস্য ও পার্থক্য

উভয় বিশেষজ্ঞই একমত যে, সাম্প্রতিক ছোট ভূমিকম্পকে সরাসরি আসন্ন বড় বিপর্যয়ের পূর্বাভাস বলা যাবে না, এবং জনগণকে আতঙ্কিত না হয়ে প্রস্তুত থাকতে হবে। 
পার্থক্য হলো গভীরতায়: আকতারুল আহসান ডেটার কারিগরি সীমাবদ্ধতা - বিশেষত গভীরতার correction ও imaging-এর অভাব -সরাসরি চিহ্নিত করেছেন, যা প্রতিবেদনের "তথ্য-সংকট" অধ্যায়কে আরও শক্তিশালী করে।
মূল বার্তা উভয়ের কাছ থেকে একটাই: ঝুঁকি বাস্তব, কিন্তু অজ্ঞতা-নির্ভর আতঙ্ক নয়- বিজ্ঞান-নির্ভর প্রস্তুতিই সঠিক পথ।

অধ্যায় ৬: ঢাকার বিশেষ ঝুঁকি

৬.১ ভৌগোলিক ও অবকাঠামোগত সংকট

RAJUK-এর Urban Resilience Project সমীক্ষায় (২০১৮-২০২২) দেখা গেছে, টাঙ্গাইলের মধুপুর ফল্টে ৬.৯ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকার প্রায় ৮,৬৫,০০০ ভবন ধসে পড়তে পারে। দিনের বেলা এ ঘটনা ঘটলে ২,১০,০০০ মানুষ মারা যেতে পারে এবং ২,২৯,০০০ আহত হতে পারে।  

পাঁচ বছরে ঢাকা, নরসিংদি, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, সিলেট, নেত্রকোণা, দিনাজপুর, হবিগঞ্জ, রংপুর, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, পাবনা, রাঙামাটি, চুয়াডাঙ্গা, শরিয়তপুর, যশোর ও কুড়িগ্রামসহ ১৮টি জেলায় ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছে।  ঢাকার আশেপাশে গত দুই দশকে প্রায় ৩০টি ড্রেজ-ফিল সাইট তৈরি হয়েছে যা মোট প্রায় ৪,০০০ হেক্টর (৪০ বর্গকিলোমিটার) জলাভূমি ভরাট করেছে।  এই নিচু ভূমি ভরাট করা এলাকাগুলো ভূমিকম্পের সময় liquefaction-এর মারাত্মক ঝুঁকিতে থাকবে।
অন্যদিকে অবার্ন বিশ্ববিদ্যালয় যুক্তরাষ্ট্র এর আকতারুল আহসান, বলেছেন, মধুপুর ফল্টের কোন অস্তিত্ব নাই। মধুপুর এলাকাটি পুরোটি সাতক্ষেরা

এবং নরসিংদীসহ REACTIVATED HINGE ZONE । ১৮৮৫ সালে ভূমিকম্পটি বগুড়াতে হয়েছিল, মধুপুরে নয়। এক্ষেত্রে অন্যান্য ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ এর মতভেদ দেখা দেয়।

১৮৮৫ সালের ভূমিকম্পটি সাধারণভাবে Bengal Earthquake নামে পরিচিত এবং এর উপকেন্দ্র উত্তর-মধ্য বাংলার দিকে ছিল বলে ধরা হয়। কিছু গবেষক মনে করেন এটি প্রস্তাবিত Madhupur Blind Fault-এর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে, কিন্তু এর সরাসরি প্রমাণ নেই। তাই "নিশ্চিতভাবে বগুড়াতেই হয়েছিল" বা "নিশ্চিতভাবে মধুপুর ফল্ট থেকেই হয়েছিল"-কোনোটিই প্রতিষ্ঠিত সত্য নয়। 

সুতরাং, জনাব আকতারুল আহসান যে মতামত দিয়েছেন মধুপুর ফল্ট সম্পর্কে, সেটি বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত তথ্য নয় নাও হতে পারে; বরং একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা বা মতামত। বর্তমানে বিদ্যমান সব গবেষণার ভিত্তিতে সবচেয়ে সতর্ক সিদ্ধান্ত হলো-Madhupur Fault-এর অস্তিত্ব ও ১৮৮৫ সালের ভূমিকম্পের সঙ্গে এর সম্পর্ক এখনও গবেষণাধীন এবং বিতর্কিত একটি বিষয়।

৬.২ পশ্চিম-মেগাস্ট্রাস্ট অঞ্চলের অতিরিক্ত ফল্ট

Bengal Megathrust-এর পশ্চিমে অবস্থিত বেশ কিছু ফল্ট সময়ে সময়ে ছোট থেকে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টি করতে সক্ষম। ঢাকার কাছে বেঙ্গল বেসিনের পূর্ব অংশে WNW-ESE দিক বরাবর দুটি কাঠামো চিহ্নিত করা হয়েছে — ধলেশ্বরী ফল্ট ও পদ্মা ফল্ট।  

উপসংহার ও সুপারিশ

বাংলাদেশের ভূমিকম্প পরিস্থিতি পাঁচটি স্তরে জটিল:
প্রথমত, CDMP-এর Time-Predictable Modelling একটি মূল্যবান বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টা, কিন্তু এর ভিত্তি দুর্বল -কারণ ডেটা অপর্যাপ্ত এবং ধার করা।

দ্বিতীয়ত, ভুটানের M৫.৬ ভূমিকম্প Himalayan Thrust System-সম্পর্কিত এবং এর প্রত্যক্ষ প্রভাব বাংলাদেশে আসার সম্ভাবনা কম। তবে Bhutan-Sikkim Seismic Gap দীর্ঘমেয়াদে M৮+ ঘটনার সম্ভাবনা বহন করছে।

তৃতীয়ত, রুপগঞ্জ-নরসিংদি ভূমিকম্পের "puzzle" আরও গভীর হয়েছে — anticline, গ্যাসফিল্ড এবং গভীরতার imaging-এর অভাব মিলিয়ে এটি সাবডাক্টিং প্লেটের ঘটনা কিনা  সেটি এখনও নিশ্চিত নয়। Megathrust-এর চাপ এতে মুক্ত হয়নি।

চতুর্থত, বাংলাদেশের Dauki Fault এবং Bengal Megathrust — উভয়ই স্বাধীন এবং বিশাল সম্ভাবনাময় ভূমিকম্প উৎস।

পঞ্চমত, ঢাকা শহরের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ভরাট নিচুভূমি এবং দুর্বল স্থাপনা এই ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

সুপারিশনসমূহ

১. দেশীয় সিসমিক নেটওয়ার্ক ও Deep Imaging: ধার করা তথ্যের উপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। বিশেষত ১৬ কিলোমিটারের নিচের seismic imaging ছাড়া রুপগঞ্জ-নরসিংদি অঞ্চলের সঠিক টেকটোনিক ব্যাখ্যা সম্ভব নয়।

২. Paleoseismic গবেষণা: দাউকি ফল্ট, হিঞ্জ ফল্ট ও বেঙ্গল মেগাস্ট্রাস্ট বরাবর ট্রেঞ্চ খনন করে অতীতের ভূমিকম্পের প্রমাণ সংগ্রহ করতে হবে।

৩. ভবন নিরীক্ষা জরুরি: RAJUK-চিহ্নিত ৩২১টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ভবন দ্রুত রেট্রোফিট অথবা ভেঙে ফেলতে হবে।

৪. Early Warning System: তুরস্কের এবং চীনের আদলে বাংলাদেশে রিয়েল-টাইম সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

৫. জনসচেতনতা কাজ ও অনুশীলন বাড়ানো: যেমন ‘শান্ত থাকা এবং ভূমিকম্পকালীন সঠিক আচরণ নিয়মিত অনুশীলন করা। প্রশ্ন "আগামীকাল হবে কি?" নয় প্রশ্ন হোক - "যখন হবে, তখন আমাদের ভবন ও মানুষ কতটুকু প্রস্তুত?"

তাই মূল কথা হওয়া উচিত, ‘বর্তমান ঐকমত্য হলো: "বড় ভূমিকম্প আসছে" বলা যাবে না, কিন্তু "বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনা নেই"—এ কথাও বলা যাবে না। প্রস্তুতিই সবচেয়ে যৌক্তিক অবস্থান।’

 

পাঠকের মন্তব্য


একই ধরনের লেখা, আপনার পছন্দ হতে পারে

bdjogajog