ঢাকা মহানগরীতে রাস্তার কুকুরের সংখ্যা দিন দিন উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শহরে বর্তমানে ২ থেকে ৩ লাখ রাস্তার কুকুর রয়েছে। এসব কুকুর কামড়ানো, রোগ ছড়ানো এবং পরিবেশ দূষণের কারণে নাগরিক জীবনে মারাত্মক সমস্যা তৈরি করছে। যত্রতত্র খাবার দিয়ে কুকুরের বংশবৃদ্ধি করা হলেও ভ্যাকসিন বা স্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা না থাকায় সমস্যা আরও গভীর হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতির চিত্র
ঢাকায় রাস্তার কুকুরের প্রাথমিক তথ্য
বিষয় তথ্য
রাস্তার কুকুরের আনুমানিক সংখ্যা- ২-৩ লাখ (শুধুমাত্র ঢাকায়)
প্রতি বছর কুকুর কামড়ানোর ঘটনা- ২০,০০০ এর উপরে (সরকারি হিসাব)
কুকুর কামড়ানো থেকে মৃত্যুর হার- ১৪-১৬% (post-exposure চিকিৎসা না পেলে)
ভ্যাকসিনপ্রাপ্ত কুকুরের শতকরা হার- ২০% এর কম (অত্যন্ত নগণ্য)
আইন প্রযোজ্যতা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন -২০১৬ বাঁধা সৃষ্টি করছে
কুকুরের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণসমূহ:
• নিয়ন্ত্রণহীনভাবে খাবার সরবরাহ: এনজিও ও ব্যক্তিবিশেষ কুকুরদের প্রতিদিন খাবার দিতে থাকেন, যা জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে। এছাড়া শহরের হোটেল রেস্টোরার ফেলে দেওয়া বাসি পঁচা খাবার কুকুরদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকার অর্ন্তভুক্ত।
• ভ্যাকসিন বা বন্ধ্যাকরণের অভাব: বন্ধ্যাকরণ কার্যক্রম (ফ্যাভিক্যান) বাস্তবায়ন বর্তমানে সীমিত।
• দুর্বল নগর পরিকল্পনা: বাজার, আবাসিক এলাকা ও খোলা জায়গার খাদ্য বর্জ্য সহজলভ্যতা।
• আইনগত জটিলতা: বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের অধীনে কুকুর নিয়ন্ত্রণ করা জটিল, কারণ কুকুর এই আইনের আওতায় আসতে পারে না । কুকুর বন্যপ্রাণী বা বিরল প্রজাতির প্রাণী নয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রাস্তায় কুকুর ঘোরা নিষেধ।
• সংস্থাগত সমন্বয়হীনতা: ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে কুকুর নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে।
স্বাস্থ্যগত এবং রোগজনীত ঝুঁকি:
কুকুর থেকে ছড়ানো প্রধান রোগসমূহ
রোগের নাম সংক্রমণের পথ মারাত্মকতা
রেবিজ (Rabies) কন্ঠনালী/ধারালো কামড় চিকিৎসা না হলে ১০০% মারাত্মক
ব্রুসেলোসিস (Brucellosis) সংক্রমিত কুকুরের সরাসরি স্পর্শ দীর্ঘমেয়াদী রোগভোগ
লেপ্টোস্পাইরোসিস (Leptospirosis) প্রস্রাবের মাধ্যমে যকৃৎ ও কিডনি বিকল
প্যারাসাইটিক সংক্রমণ সরাসরি সংস্পর্শ/খাদ্যদূষণ শিশুদের জন্য বিপজ্জনক
ক্যাপনোসাইটোসিস (Capnocytophaga) কামড়/আঁচড় রক্তনালিতে জীবাণু
পরিবেশগত হুমকি
• শুধু মানুষের নয়, গবাদিপশু ও শহরের অন্যান্য প্রাণীতে রেবিজ সংক্রমণ দ্রুত ছড়ায়
• রাস্তার কুকুরের মলমূত্র বাতাস, মাটি ও পানিদূষণে বড় ভূমিকা রাখে
• সরাসরি সড়ক দুর্ঘটনার কারণ: দ্রুতগতিতে চলন্ত গাড়ির সামনে এসে পড়া, বিশেষত রাতে
• শিশু, বয়োবৃদ্ধ ও যারা পথচারী তাদের জন্য রাস্তাঘাট বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে
ইসলামিক দৃষ্টিতে
ইসলাম ধর্মে কুকুরকে নাপাক (অপবিত্র) প্রাণী হিসেবে গণ্য করা হয়। ইসলামি শরিয়া অনুযায়ী:
• ঘরে কুকুর পোষা বা রাখা নিষিদ্ধ, তবে শিকার বা নিরাপত্তার জন্য পালন করা যায়।
• কুকুরের লালা লাগলে বারবার ধুয়ে পবিত্র হতে হয় -এটি প্রাত্যহিক বাস্তবতাতে কঠিন বিষয়।
• বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণের ধার্মিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নগর পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে তাই।
• কুকুরের প্রতি নির্দয়তা প্রদর্শন ইসলাম সমর্থন করে না; তাদের মানবিকভাবে সরিয়ে দেওয়াই প্রশাসনিক সমাধান।
সুতরাং, ধার্মিক দৃষ্টিকোণ থেকেও ঢাকা শহরে ‘রাস্তার কুকুর সমস্যার ’ মানবিক ও বিজ্ঞানসম্মত সমাধান আশু প্রয়োজন।
৫. আইনগত পরিস্থিতি ও জটিলতা
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন ২০১৬-এ কুকুরকে বন্যপ্রাণীর অন্তর্ভুক্ত করার ফলে সরাসরি হত্যা বা নির্যাতন নিষিদ্ধ। তথাপি আইনটি প্রয়োগে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে:
• আইনটি মূলত বন্যপ্রাণী রক্ষার জন্য প্রণীত, স্থানীয় সরকারের প্রাণসম্পদ বিভাগ পৃথক কার্যবিধি প্রণয়ন করতে পারে।
• রাস্তার কুকুর 'পোষাপ্রাণী' নয়, যা এই আইনের প্রয়োগ সীমিত করে।
• নগর কর্তৃপক্ষ প্রাণী কল্যাণ অর্ডিন্যান্স করতে পারে, যা রাস্তার কুকুর নিয়ন্ত্রণের শক্তিশালী ভিত্তি হতে পারে।
৬. ঢাকা শহরকে কুকুরমুক্ত করার সামগ্র্রিক পরিকল্পনা
৬.১ তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ (০-৬ মাস)
• তাৎক্ষণিক জরিপ বা সার্ভে: ওয়ার্ডভিত্তিক রাস্তার কুকুর গণনা করে ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে।
• আশ্রয় কেন্দ্র (শেল্টার) নির্মাণ: ঢাকার বাইরে সরকারি জমিতে সুব্যবস্থিত কুকুর আশ্রয় কেন্দ্র তৈরি করা যেতে পারে।
• বস্তি বাসিন্দা ও নিম্ন আয়ের মানুষদের মাধ্যমে কুকুর ধরার টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে (পুরস্কারসহ)
• রাস্তায় বেঁধে খাবার দেওয়া নিষিদ্ধ করে বিধিমালা জারি।
৬.২ মধ্যমমেয়াদী পদক্ষেপ (৬-২৪ মাস)
• ফ্যাভিক্যান (TNR) কার্যক্রম বাস্তবায়ন: ধর, নিরিময়, ভ্যাকসিন দিয়ে বন্ধ্যা করে ফেরত দাও: যাতে পোষাপ্রাণীর সং সংখ্যা বৃদ্ধি কমে আসে -তবে এটি সহায়ক পদক্ষেপ হতে পারে, মূল সমস্যার সমাধান নয়।
• রাস্তার খাদ্যবর্জ্য এর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা: কুকুরের খাদ্যের প্রধান উৎস বন্ধ না করলে কুকুরের সংখ্যা কমে না।
• ব্যাপক সচেতনতা অভিযান: সিটি কর্পোরেশন ও মাঠ পর্যায়ে জনগণনদের সাথে কাজ করতে হবে।
• শেল্টারে দত্তকগ্রহন (অ্যাডপশন) সুবিধা: ভেটেরিনারি সেবার শর্তে যারা ইচ্ছুক তাদের কাছে কুকুর দেওয়া।
৬.৩ দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ (২+ বছর)
• ঢাকা শহরের বাইরে রাষ্ট্রীয়ভাবে কুকুর আশ্রয়কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা: গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ বা মুন্সিগঞ্জে বড় আশ্রয় কেন্দ্র তৈরি।
• স্থানীয় প্রাণী সংরক্ষণ আইন সংশোধন: নগর কর্তৃপক্ষকে বহিরাগত কুকুরবিষয়ক আইনের আওতায় রাস্তার কুকুর নিয়ে বিধিমালা প্রণয়নের ক্ষমতা দেওয়া।
• প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রাণী নিয়ন্ত্রণ দল গঠন: ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি কর্পোরেশনের অধীনে বিশেষ কুকুর ক্যাচার স্কোয়াড প্রতিষ্ঠা করা।
• সরকারি-বেসরকারি যৌথ বাস্তবায়ন: যেসব এনজিও সত্যিকারভাবে প্রাণী কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড করছে, তাদের শেল্টার পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া। শুধুমাত্র কুকুর-বিড়ালের জন্য কাজ করছে দেখিয়ে অনেকেই বিদেশী অনুদান নিয়ে আসেন। তাদের একটি অংশ কখনোই চায় না রাস্তার কুকুরের একটা স্থায়ী সমাধান হোক। তাই তাদেরকেও এই কর্মকাণ্ডের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।
৭. আন্তর্জাতিক দৃষ্টান্ত
দেশ গৃহীত পদ্ধতি ফলাফল
মালয়েশিয়া সম্পূর্ণ কুকুরমুক্ত শহর নীতি কুকুর থেকে রেবিস শূন্য
তুরস্ক মিউনিসিপাল শেল্টার + TNR + বিধিমালা ১০ বছরে রাস্তার কুকুর ২০% হ্রাস
ঢাকা সিটি কর্পোরেশন (প্রতিবেদন ২০২২) TNR + ফ্যাভিক্যান পাইলট সীমিত সাফল্য; কার্যকর বাস্তবায়ন হয়নি
সিংগাপুর সত্যিকার কুকুরমুক্ত শহর + কঠোর আইন + পোষা প্রাণী নিবন্ধন ২০+ বছর রাস্তার কুকুরশূন্য
৮. এনজিও ও ব্যক্তিগত প্রথার বিষয়ে বিশ্লেষণ
কুকুরকে আশ্রয়ের ব্যবস্থা না করে, শুধু রাস্তায় খাদ্য সরবরাহ করলে সমস্যা বাড়ে, কমে না। কল্যাণমূলক পদক্ষেপ হলো:
• যারা খাবার দেন, তাদের ভ্যাকসিন ও নিবন্ধনের দায়িত্ব দিতে হবে।
• খাদ্য সরবরাহ করতে হলে নির্ধারিত স্থান (designated feeding zone) ব্যবহার করতে হবে।
• ফিডারদের তালিকাভুক্তি হবে ও তারা কুকুর আশ্রয়ের খরচ যোগদান দেবে।
• বিদেশি তহবিলপ্রাপ্ত এনজিওগুলোর কার্যক্রম সরকারিভাবে বা এনজিও ব্যুরো কর্তৃক মনিটরিং করতে হবে।
• শুধু খাওয়ানো রোগ নিয়ন্ত্রণের বিকল্প নয়; শেল্টার বা আশ্রয় স্থান নির্মাণেও বিনিয়োগ করতে হবে।
৯. সুপারিশমালা
সরকারের করণীয়
• রাস্তায় খাদ্য প্রদান সুরক্ষিত করে বিধিমালা প্রণয়ণ ।
• শহরের বাইরে সরকারি কুকুর আশ্রয় কেন্দ্র বানানো।
• ডিএসসিসি ও ডিএনসিসির মধ্যে সমন্বয়কারী কমিটি গঠন করা।
• জরিপ করে ডাটাবেজ তৈরি করা এবং ইউরোপীয় মডেল অনুসরণে পদক্ষেপ নেয়া।
নাগরিকদের জন্য করণীয়
• রাস্তায় খাবার দেওয়া থেকে বিরত থাকা।
• কুকুর কামড়ালে তাৎক্ষণিক সরকারি হাসপাতালে গিয়ে Post-Exposure Prophylaxis গ্রহণ করা।
• আশেপাশের রাস্তার কুকুরের খবর বা উপস্থিতি সিটি কর্পোরেশনের হেল্পলাইনে রিপোর্ট করা।
এনজিও ও প্রাণিপ্রেমিদের করণীয়
• রাস্তায় খাদ্য দেওয়ার বদলে শেল্টার নির্মাণে বিনিয়োগ করুন।
• ভ্যাকসিনেশন ও বন্ধ্যাকরণ কার্যক্রমে ডিএসসিসির সাথে যুক্ত হউন।
• বিদেশি তহবিলের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করুন; রাস্তার কুকুর বৃদ্ধি করা কোনো প্রাণিকল্যাণমূলক কাজ নয় সেটা অনুধাবন করা।
১০. উপসংহার
ঢাকা শহরকে রাস্তার কুকুরমুক্ত করতে হলে শুধু আবেগ বা ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি নয়, বরং বিজ্ঞানসম্মত, মানবিক ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ প্রয়োজন। আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ, বন্ধ্যাকরণ, রাস্তায় খাদ্যদানে বিধিনিষেধ, সরকারি-বেসরকারি যৌথ প্রয়াস এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই সমস্যার দীর্ঘমেয়াদী সমাধান সম্ভব।
মালয়েশিয়া বা সিংগাপুরের মতো দেশগুলো যেভাবে সফলভাবে রাস্তার কুকুর নিয়ন্ত্রণ করেছে, ঢাকাও সেই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে পারে, তার ইচ্ছাশক্তি, নীতিমালা ও পরিকল্পনা নেওয়ার মাধ্যমে।