রাঙা আপা - কাজি আফসার উদ্দিন আহমদ

আলতামাস পাশা লেখাটি পড়েছেন 261 জন পাঠক।
 [কথাশিল্পী প্রয়াত কাজি আফসার উদ্দিন আহমদ এর ক্লাসিক সাহিত্য কর্মের বিভিন্ন লেখা এখন থেকে নিয়মিত প্রকাশিত হবে সাহিত্য আসর ডটকমে। লেখকের রচিত গল্প সমগ্র “নদী ধলেশ্বরী” থেকে একটি গল্প ‘রাঙা আপা’ প্রকাশিত হল।  অন্যান্য লেখার জন্য অপেক্ষায় থাকুন।- কর্তৃপক্ষ সাহিত্য আসর ডটকম।]

আল্লার আকাশ।

নীল নীল। সাদামেঘে- নীলাভ রূপরেখায় দেখতে হয়েছে  এমনি জাঁকালো। নীচে তরতর করে বয়ে চলেছে পানি- ধলেশ্বরীর পানি। নতুন পানি। বানেরে পানি। অথৈ অথৈ। অঢেল।
যাত্রীবাহী চার দাঁড়ের নৌকোতে চলেছি আবার গাঁয়ে। শ্রাবণের শেষাশেষি। আকাশ কখনো মেঘম্লান, কখনো রৌদ্র স্নিদ্ধ উজ্জ্বলৃ চকিত।
ছৈ –এর উপরে গিয়ে বসেছি।
নৌকো –পথে চলা, দেখেছি আমার স্বভাবে সয় না।
তবু যেতেই হয়।কারণ, যে জন্যে যাওয়া, যে রহস্য ভেদে তখন আমি জেদী, তার শেষ দেখতে হলে না গিয়েও যে উপায় ছিল না।
সত্যি সত্যি রাঙা আপা কে ছিলেন আমার?
কেউনা।
গাঁয়ের সকলের পরমাত্নীয়া তিনি।
আমি দেখেছি তাঁকে বয়েস যখন  আমার পাঁচ কি সাত।
গাঁয়ের মসজিদ দিয়েছিলেন   আমার নানা গাজী চাঁদ মিয়া সাহেব। সেই                                                                                                    চকমেলানো মসজিদের পিছনেই থাকতেন রাঙা আপা।
ছোট বয়েসের চোখেই দেখেছি তাঁকে। খুব কাছাকাছি থেকেই দেখেছি। বড়ো হয়ে দেখিনি কিন্তু  কোনদিন। নাঃ!  একবারও না।
আমার স্পষ্ট মনে পড়ে তাঁর হাস্যেজ্জ্বল উচ্ছলবরণি চোখমুখ। দীর্ঘাঙ্গী রাঙা আপার মতো চেহানা তখন আর আমি দেখিইনি আমাদের গাঁয়ে। নতুন ছিলেন তিনি। সজীব ছিলেন। আর ছিলেন সাহসিনী।
সাভারের মেয়ে রাঙা আপ।
এখানে- এ বাড়িতে স্বামীর  ভিটি আঁকড়ে ছিলেন তিনি একলা- একাকিনী।
কতো বয়স হবে তার তখন? চব্বিশ  কি পঁচিশ। নিঃসন্তান। স্বামী নিরুদ্দেশ। কোথায় গেছেন কেউ জানে না।
সে    এক বিচিত্র ইতিহাস।     

২.

কলকাতা ছেড়ে এসেছি ঢাকায়, রাজধানী ঢাকায়। 
পদোন্নতী হয়েছে।
একটা গোটা বিভাগেরই দণ্ডমুন্ডধর হয়েছি। কাজেকর্মে মশগুল। বাড়ীতে স্ত্রী-পুত্র-পরিজন নিয়েও নানাভাবে ব্যস্ত। সেদিন দুপুরের পরে মন ভারভার হয়ে উঠলো। ভাবলাম বাড়ী চলে যাই।
কিন্তু যাই যাই করেও যাওয়া হলো না। বসে বসেই কাটলো সময়। পিয়ন চাপরাশীরা আসছে- যাচ্ছে। ফাইল জমে গেছে মেলাই। আমার চোখ নেই সেদিকে। 
উদভ্রান্ত মন নিয়ে তখন আমি নিতান্তই কাবু হয়ে পড়েছি। এমন সময় আমার খাস পিয়ন একেবারে কাছকাছি এসে জিজ্ঞেস করলো, 
হুজুর এ চিঠিখানা কি আপনার?
না।
না দেখেই নিঃশব্দে জবাব দিয়েছিলাম। পিয়নটা সতর্ক বুদ্ধির। আমার বেমনাভাব সে আগেই আঁচ করতে পেরেছিলো তাই সরে না গিয়ে বললো আরো,
ঠিকানায় হুজুর, শুধু আপনার নামই লেখা আছে। মানিকগঞ্জ থেকেই এসেছে চিঠিখানা। 
‘দেখি’।
আমারিই চিঠি বটে।
কিন্তু তা বুঝতে সময় ক্ষণ কাটলো অনেক।
বাংলায় লেখা ঠিকানা। গোটা গোটা সুন্দর গড়নের অক্ষরগুলো। চেয়ে দেখতে ইচ্ছে হয়।
ঠিকানায় লেখা:
শ্রীমান কামাল উদ্দীন,
বড় সাহেবের বরাবর পৌঁছে
সরকারের কৃষি-দফতরখানা, ঢাকা।

সরকারের কৃষি-দফতরখানা, শব্দ কয়টার নীচে লালকালির দাগ। তার উপরেই ইংরেজিতে লেখা: ডিপার্টমেন্ট অব এগ্রিকালচার, ইডেন বিল্ডিংস। পোষ্ট অফিসেরই কেউ হয়তো লিখেছেন ডাক বিলির সুবিধের জন্যে। আমি তখনও খামখানা হাতে নিয়ে বসে। খুলিনি। আশ্চর্য, আমার ডিপার্টমেন্ট িএমন খণ্ডিত নামেই আমাকে বেছে বার করেছে তো ঠিক।
কোথায় ডঃ একেএম কামাল উদ্দীন আহমদ চৌধুরী- আর কোথায় শ্রীমান কামাল উদ্দীন!

৩.

চিঠিখানা খুলে ফেললাম।
শ্রীমান কামালকে লিখেছেন রাঙা আপা। 
”তথ্যতালাশ তোমার আমি করি সব সময়ই। তুমি কাজের মানুষ হয়েছ, তবু মনে বিশ্বাস রাখি, আমাদের একেবারে ভুলে যেতে পারো নি।
আমার সময় হয়ে এসেছে। অনেকদিন তো এসেছি, আর পারছি নে। এবার পাতাতারি গুটাতে হবে। আল্লার ইচ্ছার চেয়ে আর কিছু তো জীবনে বড়ো করে দেখিনি। যখন যা হয়েছে সেতো তাঁরই ইচ্ছায়- তবে আর দুঃখ কিসের? –তুমি বোধ হয় জানো, কখনো কোনো দুঃখই আমার মনে ছিল না।
কতোকাল প্রতীক্ষায় কাটলো। জীবনটাও শেষ হয়ে এলো এতোদিনে। মনে হচ্ছে আমার জীবনের হা-হুতাশেরই কথা বুঝি শেষ পর্যন্ত তোমাকে লিখতে বসেছি। তা কিন্তু সত্যি নয়।
ছোট ভাইটি আমার, গাঁয়ের স্কুলে যতোটুকু না পড়েছি, তোমার বই-পত্তর ঘেটেই তো আমার সবটুকু পুঁজি। তার জোরেই এতোকাল বাঁচলাম।
যা আমার হাতে, তার ওপর আর কারুর কর্তৃত্ব নেই। এ শিক্ষাও পেয়েছি বই পড়েই। কাজেই গাঁয়ের ঝগড়া ঝাটি বাদ-বিসস্বাদ, নিন্দা- গ্লানি কোন কিছু্ই আমার মধ্যে এতটুকু ব্যত্যয় ঘটাতে পারেনি।
তুমি জানো না,-
একটু দাঁড়াও কে যেন ডাকছে বাইরে..
…..  …….
আর লিখতে পারিনি।
ভেবেছি লিখে যাবো দিন কতক, তারপর একদিন সময় বুঝে ডাকে দেবো। তোমার হাতে পড়বে না’কি- পড়বে। আমার আল্লার কাছে আমার এটাই তো শেষ প্রার্থনা। তা-ও কি অপূর্ণ থেকে যাবে?
তোমার দুলাহ্ভাই সাহেব কোথায় আছেন জানিনে। আজো তাঁকে কেউ এনে দিতে পারলেন না। আমিও কারুকে ব্যস্ত করে তুলিনি তার কথা বলে। যাতে  কারুর সাথেও জড়িয়ে পড়তে না হয়, আবার সকলের পাঁচ রকম সুখ-সন্দেশে সহযোগীর  মতো হাত বাড়িয়ে শরীক হতে পারি, তাই করে কাটলো জীবন।
আমার খৈ, চিড়ে, মুড়ি-মুড়কির সুনাম সারা দাশরায়। খেটে খেটে সে সুনাম আমি ঠিকই রাখতে পেরেছি।
এখানে একটা স্কুলঘর তুলেছি আমরা। অনেকে অনেক কথা বলেছিলেন। গাঁয়ের মেয়েদের ধিংগী করে তুলতে চাই আমি এবং আমারই মতো জেদীও করতে চাচ্ছি-এমন কথা সকলে নন, কেউ কেউ বলেছিলেন। আর বলবো কি ভাই, সত্যি, সকলে না হোক, একটা মেয়ে, তুমি চিনবে না, আমাদের খইজুদ্দীন চাচার  মেয়ে পাঁচ-ছ বছর আগে- দশ- এগারো বছরের মেয়ে সোজা এসে বললো, ‘বু আমাকে পড়তে-লিখতে শেখাবে?’
-পড়তে লিখতে কে কাকে আমরা শিখাবো ভাই? পড়তে-লিখতে শিখতে হবে তোমাকেই। তাতে যদি রাজি থাকো, তাহলে লেগে যাও আজ থেকেই। আমি স্পষ্ট করে বলেই ফেলি, কিন্তু ব্যাপারটা কি আগে তাই বলো, খইজুদ্দীন চাচা না আবার লাইঠাল পাঠিয়ে আমার স্কুল- ঘর ভেঙে দেন।
-তা দেবেন না। মা বলেছেন, তিনি সামাল দেবেন আব্বাজানকে। আমাদের বাড়ী থেকে আনবো চারটে মেয়ে, আমারই বয়েসী তারা..
আমি কি বলবো? – আমি খুশিতে আত্নহারা।
কিন্তু ওর ধিংগীপনার প্রথম পরিচয় পেলাম আমরা যখন, সে আর আমাদের স্কুলের ছাত্রী নয়। তিন বছর আগের কথা। রাশেদার বিয়ের কথাবার্তা চলছিল। দামাদ পক্ষের একজন মুরুব্বি মানুষ হঠাৎ জিজ্ঞেস করে বসেন, বৌমা আমাদের কাছে কি কি চান, তাও তো জানা উচিত আগে।
কি চেয়েছিল মেয়েটা জানো, ভাই?
সে স্পষ্ট গলায় বলেছিলো গয়নাগাটি আমার চাইনে। আপনারা আমার মুরুব্বি আত্নীয় গুরুজন, আপনাদের কাছে কি আমার চাওয়ার শেষ আছে!
লোকটি সম্পর্কে ওর চাচা-শ্বশুর, পরহেজগার মানুষ। তিনি রাশেদার কথা শুনে চমকে উঠলেন, খুশীও হলেন বেজায়। স্পষ্ট কথায় অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানতে চাইলেন, ব্যাপারটা কি, মা, আমাকে বলো তোমার শ্বশুরটা আমারই ভাই, স্বভাবে একটু কিপটে; কিন্তু আমি মা তোমার প্রথম ইচ্ছে নিশ্চয়ই পূরণ করবো। এখন বলো-
রাশেদা বললো, গাঁয়ের মেয়েদের বেশ খানিকটা পড়ার মতো একটা স্কুল করে দিন আপনি। আর বই দিন পড়ার মতো। যতো দিতে পারেন- যতো দিতে পারেন–
জানো, কথা কয়টা বলতে বলতে ও না’কি কেঁদে ফেলছিলো। কারণ ওর ভয় ছিল, ওর আব্বা তার পড়াশুনোর জন্যে খুব বেশি খড়্গগথস্ত হয়ে উঠেছিলেন- তিনি না মজলিসের মধ্যেই তাকে নতুন করে আঘাত দিয়ে বসেন।
উপস্থিত সকল আত্নীয়-স্বজন প্রথমটায় নিশ্চয়ই স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল ওর কথা কয়টা শুনে। ওর চাচা শ্বশুর সাহেব ভেবেছিলেন পরে আমাদের বলেন, আমি ভেবেছিলাম মেয়েটা নিজের শর্তে কাবিননামা বা জমিজমাই কিছু নিজের নামে লিখিয়ে নিতে চাইবে। কিন্তু যা সে চাইলো, তাতে তো মনে হল , আজকালকার শিক্ষিত মেয়েদেরও তেমন কোনো আকাংখা নেই। গাঁয়ের মেয়ে রাশেদার ধিংগীপনার জয় হলো। ওর রগচটা আব্বার মতামত কেউ গ্রাহ্যের মধ্যেই আনলো না। শেষে দামাদ পক্ষেরই দাবি হলো, মেয়ের বাপের গাঁয়েই একটা স্কুলের মতো স্কুল চালু হবে আগে, তারপর আমাদের গাঁয়ে আমরা বৌ তুলে নিয়েই শুরু করে দেবো গড়ে তুলবো নতুন স্কুল-আমাদের গাঁয়ের মেয়েরা নিশ্চয়েই লেখা-পড়া করবে, সাধারণভাবে যতোখানি সম্ভব।
ধিংগী রাশেদার আব্বাকে রাজী হতেই হলো। রাশেদা কিন্তু নতুন স্কুল করতে রাজী হলো না। জোর পেয়ে দাবী জানালো, আমার গড়া ছোট স্কুলটাকেই যেন গড়ে তোলা হয় বড়ো করে, উপযুক্ত করে।
আমাকে ওরা বড্ড মানে।
মেয়েরা আমার নামে পাগল।
ওরা কতো জানতে চায়, আমার মধ্যে এই পড়াশুনোর- এমন স্বাবলম্বী হবার শক্তি কার সাহায্যে অটুট হয়ে রয়েছে।
একটা মানুষের বড়ো সম্পদ, বই। লেখা- পড়া থেকে পৃথিবীর সকল রহস্যের উদ্ঘাটন। বিশ্বের বিচিত্র জানা-অজানার সংবাদ সংগ্রহ। আমার দিন রাতের কাজকর্মের মধ্যেও পড়ার নেশা লক্ষ্য করেই তাই ওদের যা কিছু প্রশ্ন।
আমাদের স্কুলের নিজস্ব লাইব্রেরী তোমাকে বিস্মিত করবে। যদি  সত্যি কখনো এ গাঁয়ে তোমার পদার্পণ ঘটে, দেখতে পাবে আমরা আর দু-দশটা গাঁয়ের জন্যে উজ্জ্বল দিগন্তেরই সৃষ্টি করে রেখেছি। নিঃশব্দেসব করছি। কারণ আমার তাই ভালোলেগেছিলো। আর বোধহয় তেমন করে চালোনো যাবেনা। তবু মনে মনে ভেবে রেখেছি, যেমনটি চলছে চলুক তেমনি।
অনেক বিপদ-আপদের মধ্যে দিয়েও আমার জীবনটা তো শেষ হয়ে এলো। এবার কে এর দেখাশুনো করবে? আমার ভাগ্য যেন কোনো মেয়ের না হয়। তাই বলে কি গাঁয়ের এই ছোট স্কুলের কাজ টিমটিম করেই চলতে থাকবে? গাঁয়ের ছেলেদের টান বাইরের দিকে- শহরেই তারা চলে যাচ্ছে। এতো অল্পে কেউ সন্তুষ্ট নয়। সামান্য স্কুল ঘরটিকে কেন্দ্র করে এবার তোমার সাহায্য চাইবো ভেবে ভেবে এই চিঠি লিখতে শুরু করেছি।
…..
কারুকে বলিনি।
আমার মন বলছে, বুঝতে পারছি, আমি আরো বেশিদিন বেঁচে থাকবো তেমন রসদের অভাব ঘটেছে কোথাও। তাই, এই চিঠিখানা ডাকে পাঠিয়ে দিয়ে আমি নিশ্চিত মনে বিদায় নিতে চাই।
তোমার রাঙা আপার বিষয়-সম্পত্তি তেমন নাই। কিন্তু একরাশ নগদ টাকা আছে, ভাই। এবার তোমাকে সেই ভারই দেবো। গাঁয়ের স্কুলটার জন্যেই রইলো সব। সকলের অভাব-অনটনে সাহায্যে লাগবে, এই ভরসায় সবই রেখে যাচ্ছি তোমার নামে। তুমি লাগাবে কাজে। সকলের বিপদে আপদে সাহায্য করেছি, কারুকে ফিরিয়ে দিতে পারিনি। তবু আল্লাহ আমার হাত ভরিয়ে দিয়েছেন, হাতে ভরে রেখেছেন সবসময়। এসেছে তো সেই খৈ, চিড়ে, মুড়ি ভাজা থেকেই।
…..
আর পড়তে পারিনি।

হঠাৎ করে নিজেকে খুব বড় একটা ঘটনার সঙ্গে একেবারে অঙ্গাঙ্গী মনে হলো। রাঙা আপার শ্রেষ্ঠ শক্তি যে আর কেউ নয় , আমি তা আর কে বিশ্বাস করবে? কিন্তু ঠিক তাই কি? আমি আর এর মধ্যে কতোটুকু?
কবে কখন তাকে বলেছিলাম, মানুষ নিজে না নেমে এলে করুর শক্তি নেই তাকে নীচে নামিয়ে পাঁকে ডুবিয়ে শেষ করে। যে বাঁচতে চায়, বাঁচার পথ সে একদিন না একদিন পাবেই। যে নিজের মধ্যেই বলীয়ান, তাঁকে ডোবাবে কে, তার ওপর কর্তৃত্ব করবে এমন শক্তিমান পৃথিবীতে জন্মায়ই না।
আশ্চর্য, আমার প্রত্যেকটি কথা তেমন মনেপ্রাণে মেনে নিয়েছিলেন রাঙা আপা। শুধু মেনেই নেননি, সর্বসাফল্যে আজ কেমন পূর্ণ হয়ে উঠেছে।

৪. 
রাঙা আপা লিখেছেন: ওদের বলেছি তোমার কথা। বলেছি তোরা জানিস আমার কেউ নেই। কথাটা সত্যি হলেও একেবারে সত্যি নয় রে। আমার ছোট একটা ভাই আছে। ছোট ভাই হলে কি হবে. আমাদের সরকারের একটা বড়ো দফতরের সে-ই বড় সাহেব। আমার মধ্যে তোরা যা কিছু দেখছিস, তার সবটুকুই খেটেখুটে কাজেকর্মের ভেতর দিয়ে গড়ে উঠেছে। তোরা সংসারী হবি, নিজের নিজের সংসার জুড়েও যেন তোরা এমনি নতুন রোশনাইয়ের জৌলুশ জ্বালিয়ে তুলতে পারিস। এই প্রথম আজ তোরা জানলি, আমার গুরু আর কেউ নয়, সে হলো আমার ছোট ভাইটি, কামাল উদ্দীন- কামাল উদ্দীনিই সব। আমি চলে যাচ্ছি তোদের ফেলে, ভরসা এখন কামাল উদ্দীন। ওকে একটা চিঠি দিয়ে যাচ্ছি। সে এলেই আমাদের গাঁয়ের গর্ব স্কুলটি টিকে যাবে- ঠিকই টিকে যাবে।
…..
উনি তো লেখেননি আমাকে গাঁয়ে ফিরে যেতে। কিন্তু আমি এ চিঠি শেষও করতে পারলাম না। মনে হলো, জীবনে এ- আমরা কি করে চলেছি? আমাদের চোখের সম্মুখে দেশ কই, আপন গাঁ কই? যেখান থেকে এসেছি, তার এমন তীব্র তীক্ষ্র পিছুটান আমি আর কখনও অনুভব করিনি। আর কেউ এমন কিছু আকর্ষণের কথা বললে আমি বিশ্বাসও করতে পারতাম না। আজ  কিন্তু বিশ্বাস অবিশ্বাসের কথা আর উঠলো না।
আমি গাঁয়েই চলেছি। রাঙা-আপার কর্মক্ষেত্রটি দেখতে চলেছি।
চার দাঁড়ের নৌকো চলেছে। ছলাৎ ছলাৎ শব্দ উঠছে পানিতে।
ধলেশ্বরীর বুকে নৌকো চলেছে।
-নৌকো চলেছে দাশরার পথে।

পাঠকের মন্তব্য


একই ধরনের লেখা, আপনার পছন্দ হতে পারে

bdjogajog