সাম্প্রতিক প্রকাশনা

সময় গেলে সাধন হবে না (ধারাবাহিক জীবন কাহিনী)

আলতামাস পাশা লেখাটি পড়েছেন 1222 জন পাঠক।
 সময়টা দুনিয়াব্যাপী  করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার কিছুটা আগের। মাসের হিসেবে জানুয়ারি মাসের শেষ, ২০১৯ সাল। অন্যসব দিনের মতো আজও ভোর ৬টায় শাওনের ঘুম ভাঙ্গে। দ্রুত তৈরি হয়ে নেয় সে। পনোরো-বিশ মিনিটের মধ্যেই ক্লিন শেভড শাওন রাস্তায় নামে। অফিসগামী মানুষগুলো এগিয়ে যায়  যার যার গন্তব্যেরপানে। শাওনের সেদিক থেকে অফিস যাবার বা ঠিক সময়ে পৌঁছনোর কেনো তাড়া নেই। সে হেঁটে চলে আপন মনে। তিনমাস পুরো হতে চললো জব ছাড়া। জব লেস মানুস সে এখন। এক ঘনিষ্ট বন্ধু তাকে বলে, ‘নিজেকে জব লেস বলবি না’, বরং বল ‘আই এম অ্যা জব সিকার’। একধরনের স্বাধীনতা, আবার সেই সাথে চরম অনিশ্চয়তা শাওনের মনে বিরূপ প্রভাব ফেলে।

ফাল্গুন মাস এখন। তবুও বাতাসে শীতের আবেশ লেগে আছে। গত কয়েকদিনের বৃষ্টি সে শীতের আবেশকে আরও তীব্র করেছে। একাকী পথ চলে শাওন। বৃষ্টি ভেজা সকালে হঠাৎ মনে হয় জীবন যেন গতিহীন। এই শহর, এই দেশ সব তার কাছে অজানা, অচেনা মনে হয়। বন্ধুহীন সময় পথ চলার জন্য বড্ডো কঠিন। যারা পাশে ছিল বন্ধু অথবা সহকর্মী আস্তে আস্তে সবাই পর্দার অন্তরালে চলে যায়। কথায় বলে ক্ষমতাহীনের বন্ধু, সহকর্মী ও অনুসারীর সংখ্যা ক্রমেই কমে আসে। কমে যায়। কবি যেমন বলেছেন, ‘একে একে নিভিছে ডেউটি’। 

আস্তে আস্তে কমে আসে ফেসবুকে সমস্যা সম্পর্কে একাত্ব ঘোষণায় লাইন দেওয়ার সংখ্যাও।  নানা ধরনের রিঅ্যাকশন দেওয়ার সংখ্যা্র কমে। বা্ইরের পৃথিবীকে পরিবর্তন ঘটে প্রকৃতিতে। অগ্রহায়ণের শেষে শীত আসি আসি করতে থাকে। 

একসময় শীতও এসে পড়ে। প্রকৃতিতে শীত তার অবস্থান জোড়ালো করে। শীতের কাঁপুনির মাঝে হারিয়ে যায় ভালোলাগার বোধগুলো।তাপমাত্রা দেশের উত্তরাংশসহ অনেক জায়গায় সর্বনিম্নে নেমে আসে। ক্রমে অস্থিরতা বাড়ে। নিজের কাজের প্রতি শাওনের আস্থাহীনতা জন্মায়।

আস্থাহীনতা একটি বিশাল ব্যাপার। জীবনের মধ্যবয়সে এসে আস্থাহীনতা মানুষকে দুর্বল করে, অসহায় করে, বন্ধুহীন করে। পথের মাঝখানে এসে হঠাৎ একাকীত্ব গ্রাস করে যেন কুমিরের মতো।

একটা মুহূর্তে মনে হয়, জীবনে প্রথমদিনগুলো যদি ফিরে পাওয়া যেত। ছন্দপতন যদি এমনভাবে না হতো? মানুষের জীবন না‘কি একটাই! একটি জীবনে কতকিছু করা যায় অথবা যায় না। যারা পৃথিবী বিখ্যাত কবি, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, রাজনীতিবিদ অথবা নোবেল লরিয়েট তারা কি সুখী? বা সুখী ছিলেন কখনও? প্রতিরাতে তারা কি প্রশান্তিতে ঘুমাতে পারেন?ঘুমের ওষুধ খেতে হয় না তাদের? বিনিদ্র রজনী যাপন করতে হয় নি আরো পাবার চিন্তায় অথবা খেতে পাবার যন্ত্রণায়?

আসলেই জীবনের অর্থ কি? কতগুলো সামাজিক, ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা? মৃত্যুর পরে ভালো বা মন্দ কাজের জন্য পুরস্কার বা শাস্তির অপেক্ষা করার নামই কি জীবন? 

এরপর ২০২০ সালের শুরু। 

চীনের উহানে কোভিড ১৯ ভাইরাস হানা দেয়। অজানা এক অজানা আতংক আর শংকা শাওনকে ঘোরের মধ্যে রাখে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে। প্রতিদিন নতুন শাড়ি পরে সংবাদ সম্মেলন করেন আ্ইইডিসিআর’র পরিচালক। আশার বাণী শোনান। 

তারপর একসময় সে কণ্ঠেই ঘোষিত হয় প্রথম কোরোনা আক্রান্তের কথা। এরপর থেকে শুধু শাওন নয়, ওর মতো শত, সহস্র মানুষের জীবনে নেমে আসে এক অনিশ্চয়তা। যা আজও কাটেনি।

সময়টা ২৪ জুন, ২০২০। মানুষ চলেছে অনিশ্চয়তার পথে। কাজ চলে গেছে অনেকের। বিগত মাসগুলোর বেতন পায়নি অনেকেই। ঢাকা শহরের হাজার হাজার মানুষ চলে গেছে গ্রামের পথে। যারা দীর্ঘ ত্রিশ বছর ধরে এই শহরকে জীবন-জীবিকার আশ্রয়স্থল ভেবেছে তারা তখন ফিরে চলেছে গ্রামের ঠিকানায় অনিশ্চিত ভবিষ্যৎকে চিন্তায় নিয়ে।(চলবে)


পাঠকের মন্তব্য


একই ধরনের লেখা, আপনার পছন্দ হতে পারে

bdjogajog