বিদেশী সিরিয়ালগুলো আমাদের তরুণ সমাজকে কোথায় নিয়ে যাবে?

আলতামাস পাশা লেখাটি পড়েছেন 55 জন পাঠক।
 সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে তুর্কি ও ইরানের বাংলায় ডাবিংকৃত সিরিয়াল দেখানো হচ্ছে।এর মধ্যে কিছু সিরিয়াল বেশ জনপ্রিয়তাও পেয়েছে। এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, সুলতান সুলেমান, ফাতমাগুল, বাহার ফেরিয়া এবং অতি সাম্প্রতিক ‘আমাদের গল্প’। 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এসব সিরিয়াল আমাদের সংস্কৃতির সাথে যায় কি’না? এসব সিরিয়াল বাংলায় ডাবিং করার আগে বা পরে তা মনিটরিং এ সরকারি কোনো সেন্সর বোর্ড কাজ করে কিনা সেটাও বড় প্রশ্ন। জানা মতে এমন কোন ব্যবস্থাপনা সক্রিয় নেই। ফলে বিভিন্ন ফলে বিভিন্ন চ্যানেলে বাংলায় ডাবিংকৃত তুর্কি ও ইরানি সিরিয়াল এখন নিয়মিত প্রদর্শিত হচ্ছে। বিশেষত দীপ্ত টিভি, এশিয়ান টিভি, এসএ টিভি, নাগরিক, এসটিভি, মাছরাঙা ইত্যাদি টিভি চ্যানেল এসব সিরিয়াল প্রচার করছে বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও জীবনধারার কোনো তোয়ার্কা না করেই।

এসব সিরিয়ালে দেখানো হয় ঐতিহাসিক কাহিনীর বিকৃতি, বিবাহবর্হিভূত প্রেম, বহুবিবাহ, অহরহ বিবাহ বিচ্ছেদ, কথায় কথায় হঠকারী মারামারীর দৃশ্য, মদ সেবনসহ আরো অনেক অস্বাভাবিক জীবনযাত্রা যা আমাদের ঘরের শিশু কিশোররা দেখে অভ্যস্ত নয়।বিশ্বের ক্ল্যাসিক সিরিয়ালসমূহ বাংলায় ডাবিং করে না দেখিয়ে, তুর্কি বা ইরানের বাণিজ্যিক মুনাফা লাভের লক্ষ্যে তৈরিকৃত তথাকথিত জনপ্রিয় ও বিতর্কিত সিরিয়াল বাংলায় ডাবিং করে দেখানোর যৌক্তিকতা সংশ্লিষ্ট চ্যানেলের কর্তাব্যক্তিরা দিতে পারবেন কি? এ ব্যাপারে আমাদের সদা সমালোচনা ও বিতর্ক প্রিয় সুশীল সমাজের দায়িত্বশীল মনিষীদেরও খুব একটা কথা বলতে দেখা যায় না।

সুস্থ জীবনধারা সম্পন্ন বিনো্দন মানুষের অধিকার। স্বাধীন গণমাধ্যমের ধুয়া তুলে আমরা যা খুশি তাই চাপিয়ে দিতে পারি না। আমাদের নিজের সাহিত্য কম সমৃদ্ধশীল নয়। তাকে কেন সিরিয়ালে তুলে ধরতে এতো কৃপণতা।
সব চেয়ে চিন্তার বিষয় এক্ষেত্রে কোন দেখভাল করার কমিটি নেই। ফলে এমনসব সিরিয়ালে অনেক অংশ যে বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও জীবনধারার সঙ্গে খাপ খায় না তা দেখার অবকাশ নেই কর্তৃপক্ষের। ফলের সমাজে সামগ্রিক অর্থে এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে। ইউরোপীয় ভাবধারায় অভ্যস্ত তুর্কি সমাজের অস্থির ভাবধারা আমাদের সাংস্কৃতিক ও দৈনন্দিন জীবনাচারণকে অস্থির করে তুলছে এবং তুলবে।ঢাকা শহরের বাসিন্দার এখন তার্কিস বরফি খেতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। তার্কিস জীবনাচারণের উগ্র দিক তরুণ সমাজে নেতিবাচক ও দীর্ষস্থায়ী প্রভাব ফেলছে।
সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, বাংলাদেশে মানসিক রোগীর সংখ্যা প্রায় দু’কোটির মতো। একটা অস্থির সমাজের যখন অন্য একটি অস্থির সমাজের প্রভাব পড়ে  তখন তা আরো ক্ষতিকর হয়ে উঠে। এমন অবস্থা কোনো ভা্বেই আমাদের কাম্য হতে পারে না।

ক্ষণস্থায়ী জীবনে আমাদের বিনো্দনের প্রয়োজন অবশ্যই রয়েছে, তবে তা সুস্থ, স্বাভাবিক ও টেনশনমুক্ত হতে হবে। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের সিরিয়্যাল হিসেবে বিদেশী (বিশেষত তুর্কি) সিরিয়াল বাণিজ্যিকভাবে বা প্রতিযোগিতামূলকভাবে দেখাতেই হবে এমন প্রবণতা থেকে প্রাইফেট টিভি চ্যানেলদের সরে আসতে হবে। সংযত আচরণ করতে হবে। পারিবারিক সিরিয়ালসমূহ শিক্ষণীয় ও সুস্থ বিনোদনের ধারা যাতে বজার্ রেখে চলে সে অবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।সরকারি পর্যায়ে গত বছরে একটি মা্ত্র সিদ্ধান্ত এসেছে। এতে বলা হয়েছে দেশের কোনো টিভি চ্যানেল একসঙ্গে একাধিক বিদেশী সিরিয়াল সম্প্রচার করতে পারবে না।সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও কৃষ্টি  রক্ষায় এ সিদ্ধান্ত নিলেও এক্ষেত্রে আরো পদক্ষেপ গ্রহণ বিবেচনায় আনতে হবে। সরকারী পর্যায়ে এক্ষেত্রে সমাজের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কমিটি করা যেতে পারে। এই কমিটি এতদ সংক্রান্ত দিগ নিদের্শনা প্রদান করতে পারে। তরুণ সমাজকে সঠিক পথে পরিচালনা করতে একটি গণমুখী সম্প্রচার নীতিমালার আশু প্রয়োজন রয়েছে যাতে সোশ্যাল মিডিয়াও (ফেসবুক, ইউটিউব ইত্যাদিও অর্ন্তভুক্ত থাকবে।

এক সময় বিটিভিতে বেশ কিছু দর্শকপ্রিয় বিদেশী সিরিয়াল দেখানো হতো। ডালাস, ম্যাকগাইভার, ডাইন্যাস্টি, এক্স ফাইল, চার্লিস এঞ্জেলস, আলিফ লায়লা, ফলগাই, রুটস নামে একাধিক বিদেশী টিভি সিরিয়াল সে সময় দর্শকপ্রিয়তাও পায়। ইংরেজী ভাষায় হলেও এর দর্শক প্রিয়ট ছিল প্রচুর। টিভি সিরিয়ালের নির্মাণশৈলী বিশেষ করে পারিবারিক কাহিনীই দর্শক প্রিয়তার মূল কারণ। এমনও দেখা গেছে রাতে বিটিভিতে যখন সিরিয়াল চলত তখন শহরের রাস্তাঘাট অনেকটাই ফাঁকা হয়ে যেত। বিদেশী টিভি সিরিয়ালের প্রতি দর্শকের এই আগ্রহের প্রেক্ষিতেই মূলত বিটিভিতে তখনকার দিনে বাংলা ধারাবাহিক নাটক নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই তালিকায় আরও রয়েছেন বেগম মমতাজ হোসেন, মামুনুর রশীদ, ইমদাদুল হক মিলন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, মুস্তাফিজুর রহমানসহ অনেকে। বেগম মমতাজ হোসেনের ধারাবাহিক নাটক ‘সকাল সন্ধ্যা’ দর্শকদের মাঝে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। তবে বিটিভি যুগে ধারাবাহিকে গুরুত্ব বাড়িয়ে দেন হুমায়ূন আহমেদ। ‘এসব দিনরাত্রি’সহ তাঁর একাধিক টিভি সিরিয়াল আমাদের টিভি দর্শকের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলে। 

সময়ের সঙ্গে পাল্টেছে পরিবেশ পরিস্থিতি। কিন্ত স্যাটেলাইট এবং সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে এসেও আমরা ফেলে আসা সময়ের মননশীলতাকে ধারণ করতে পারিনি।আমাদের আজকের যে সঙ্কট তা’হলো  আর্ন্তজাতিকতা ও আপন সংস্কৃতির মধ্যকার বিরোধ । মনে হচ্ছে আমাদের পরিচয়হীন করে দেয়ার একটি ষড়যন্ত্র চলছে। মানসম্পন্ন সব অনুষ্ঠানই দর্শকপ্রিয়তা পায় এবং সঙ্গত কারণে সেই চ্যানেলের জনপ্রিয়তাও বেড়ে যায়। মানসম্পন্ন অনুষ্ঠান নির্মাণ হচ্ছে না বলেই এসব চ্যানেলে ভিনদেশী অনুষ্ঠান প্রিয় হয়ে যাচ্ছে। আর এভাবেই যদি চলতে থাকে তাহলে কিছুদিন পর আর কোন দেশী অনুষ্ঠানই খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমাদের তরুণ সমাজ ব্যাপকভাবে সোশ্যাল মিডিয়া কেন্দ্রিক হয়ে যাবে।তাদের ফেরানোর শেষ রাস্তাটাও প্রাইভেট টিভি চ্যানালগুলো বন্ধ করে দেবে তাদের কর্পোরেট স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে।

পাঠকের মন্তব্য


একই ধরনের লেখা, আপনার পছন্দ হতে পারে

bdjogajog