গৃহপরিচারিকাদের কেন নির্যাতন করা হয়?

আলতামাস পাশা লেখাটি পড়েছেন 76 জন পাঠক।
 গৃহপরিচারিকাদের কেন নির্যাতন করা হয়?

আমাদের সুশীল সামজের প্রতিনিধিত্বকারী  বিত্তাবান ও মধ্যবিত্তের আজকাল কাজের লোক ছাড়া একটুও চলে  না। করোনার সময় গৃহপরিচারিকাদের কাজে রাখাটা ঝুঁকির বলে অনেকেই তখন গণহারে তাদের কাজ থেকে বাদ দিয়ে ছিলেন কোনো আর্থিক সংস্থানের ব্যবস্থা না করেই। বর্তমানে বাসা বাড়িতে গৃহপরিচারিকাদেও আনাগোনা  স্বাভাবিক হয়ে এলেও অস্থায়ী বা স্থায়ী গৃহপরিচারিকাদের উপর অত্যাচার, নির্যাতন, অসাম্য ব্যবহার থেমে নেই।

আশপাশের বাসায় ও আত্নীয়-স্বজন এবং পরিচিতদের বাসায় কাজের লোকদেও নির্যাতিত এ অবস্থা আমাদের খুবই মর্মাহত করে। আমি তো সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, আমি আর কোনো দিন কাজের লোক বা গৃহপরিচারিকা রাখবোই না।  একজন মানুষের মানবাধিকার খর্ব করার কোন অধিকার আমার নেই। আর যদিবা রাখতেই হয় তবে সে পাবে আমারই মতো সব অধিকার। রাষ্ট্রে পক্ষ থেকে গৃহপরিচারিকাদেও জন্য যথাযথ আইন প্রণয়ন করা উচিত। যেখানে বেতন কাঠামোসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা, বাৎসরিক ছুটি ইত্যাদি বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ করা হবে।

বাস্তবে আমরা দেখি যে গৃহপরিচারিকাদেও স্বাধীনতা বলতে কিছু নেই। তাদের ভালোলাগা-মন্দলাগা, পছন্দ-অপছন্দ থাকতে নেই। তাদের খাবারের ব্যাপাওে পছন্দ-অপছন্দ থাকতে নেই। আমি একজনের ব্যাপাওে জানি , সে কেন আলু ভর্তা দিয়ে ভাত খেতে পছন্দ কওে, তাই তার উপর চলে নির্যাতন।টিভি দেখতে গিয়ে নির্যাতিত হয়ে হয় প্রায় সব গৃহপরিচারিকাকে। এরা ঘরে বন্দি থাকে, তাই স্বাভাবিক ভাবেই টেলিভিশনের প্রতি আগ্রহ বেশি থাকে। তাছাড়া গ্রামের একটি সহজ-সরল ছেলে বা মেয়ে যে কিনা মুক্ত জায়গায় এ বাড়ি ও বাড়ি ঘুরে বেড়ায় তাকে শুধুমাত্র দারিদ্র্যের কারণে শহরে আসতে হয় এবং শহরে এসে সে বন্দি হয় শুধু কয়েকদিনের জন্যই নয়। তাকে বন্দি থাকতে হয় মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। শুধু কি বন্দি জীবন তার উপর প্রতিনিয়ত চলে অকথ্য নির্যাতন। গৃহকর্তা বা গৃহকর্তীর কথা মত পছন্দসই কাজ করতে না পারলেই চলে শারীরিক নির্যাতন। এযেন মধ্যযুগীয় দাস প্রথার নতুনভাবে ফিরে আসা।

ইদানিং নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে গৃহপরিচারিকাকে তালা বন্ধ করে অফিসে যাওয়া চালু হয়েছে। একজনের বাসায় সেদিন দেখলাম মাত্র আট বছরের একটি শিশুকে গ্রাম থেকে বাসায় এনেছে কাজ করাবার জন্য। এদের কী বিবেক বিবেচনা বলতে কিছু নেই? আর যখন ওরা বাইরে যায় তখন এই বাচ্চা মেয়ে শিশুটিকে দরজায় তালা দিয়ে জানালা-টিভি সব বন্ধ করে চলে যায়।

দৈনিক পত্রিকার পাতায় যখন কাজের শিশু নির্যাতনের খবর ছাপা হয় তখন সুশীল সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বিভিন্ন সভা, সেমিনার আর টিভির টক শো’তে শিশু শ্রম, শিশু অধিকার নিয়ে নানান জ্ঞানগর্ভ কথার ফুলঝুড়ি ঝরান। তারপর পকেটে সম্মানীর টাকা নিয়ে গাড়িতে করে বাসায় ফিরে আসেন- তারা কি নিজ বাড়ির কাজের মেয়েটির সঙ্গে ভালো আচরণ করেন? আমার প্রশ্ন একটু আগেই মানবাধিকারের কথা বলে যে হাততালি পেলেন তার কথা কি তাদের মনে থাকে? যখন তিনিও কাজের মেয়েটি বা  ছেলেটির দিকে গরম পানি ছুড়ে মারেন?

আর যেসব দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থা এই দেশে শিশু অধিকারের নামে কাজ করতে বিদেশ থেকে কোটি কোটি টাকা পাচ্ছে, আসলে তারা কোন কাজটি করছে কিছু লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা ছাড়া? আমাদের সমাজের এই দ্বৈত চেহারা পাল্টাবে কবে? কবেই বা আমাদের বিবেক জাগ্রত হবে। তারা কেন ভেবে দেখে না যে এমন অবস্থা তো তাদেরও হতে পারতো অথবা ভাগ্য বিপর্যয়ে তাদের আদরের শিশুটিরও একদিন এমন অবস্থা কি হতে পারে না।

পরিশেষে বাংলা রচনার মতো উপদেশই হয়তোবা দেওয়া যাবে শুধু আর তা হলো ছোট শিশুদের বাসার কাজে নেওয়া যাবে না এবং যারা প্রাপ্ত বয়স্ক গৃহপরিচারিকা তাদের জন্য সরকারি চাকরির মতোই নিয়মকানুন তৈরি করতে হবে। আর তা বাস্তবায়নে এগিয়ে আসতে হবে সরকার ও সুশীল সমাজকেই।	

পাঠকের মন্তব্য


একই ধরনের লেখা, আপনার পছন্দ হতে পারে

bdjogajog